সদ্য শেষ হওয়া আগস্টে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই চিনির দাম বাড়িয়ে দেন আমদানিকারকরা। এক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে দর বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আদৌ বিশ্ববাজারে চিনির দাম বেড়েছে কিনা, বাড়লেও আমদানিকারকরা কী দামে চিনি আমদানি করেছেন সেসব তথ্য যাচাই করবে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন। এক্ষেত্রে কারসাজি করে চিনির দাম বাড়িয়ে থাকলে বিদ্যমান আইনে ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হবে বলে আমদানিকারকদের জানিয়েছে ট্যারিফ কমিশন।
গতকাল বুধবার ট্যারিফ কমিশনে চিনি আমদানিকারক পাঁচ প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম, দেশ বন্ধু, এস আলম, মেঘনা, সিটি গ্রুপের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিল ট্যারিফ কমিশন। বৈঠকে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির কাছে আগস্টে হঠাৎ করে চিনির দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া হয়। এ সময় প্রতিনিধিরা বিশ্ব বাজারে চিনির দাম বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা দেন। তবে দর বৃদ্ধির যৌক্তিক প্রমাণ হিসেবে আমদানিকারকদের কাছে চিনির আমদানি ব্যয়ের তথ্য চেয়েছে ট্যারিফ কমিশন। এসব তথ্য দিয়ে চিনির দর বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক, তা যাচাই-বাছাই করে দেখবে কমিশন।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (আইআইটি) অনু বিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, হঠাৎ দর বৃদ্ধির বিষয়ে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হবে আদৌ তারা বেশি দামে চিনি আমদানি করেছিল কিনা।
তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিষয়ে ২০১১ সালে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। নির্দেশনা অনুসারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াতে হলে পূর্বে অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু চিনির দর বৃদ্ধির ব্যাপারে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। এ বিষয়টিও তাদের অবগত করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারসাজি করে দাম বাড়ানো হলে ট্যারিফ কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন পাঠাবে। সে আলোকে মন্ত্রণালয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।
সাধারণত কোনো নিত্যপণ্যের দাম বাড়াতে হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হয়। যেমন ভোজ্যতেলের দর বৃদ্ধির আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। কিন্তু চিনি আমদানিকারকরা এই আইনের তোয়াক্কা করছেন না। এ প্রসঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশ বন্ধু গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো প্রকার মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। আগস্টে দেশের বাজারে হঠাৎ করেই চিনির দাম বেড়ে যায়। দু-তিন দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ১০ টাকা পর্যন্ত। এখনো বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে।
এর আগে ৭২ টাকা কেজিতে খোলা চিনি বিক্রি হলেও এখন খুচরা বাজারে ৭৮ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮২ টাকার মধ্যে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। ফলে দেশের বাজারেও সেই প্রভাব পড়েছে দ্রুতই। চিনির দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকার যদি দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, তাহলে কর ছাড় দিলে ভোক্তারা সুবিধা পেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের আইন রয়েছে। কিন্তু বাজার মনিটরিংয়ে তা বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। দেশে ভোক্তাদের অধিকার দেখার জন্য দুটি আইন থাকার পরও কেন পণ্যে ভেজাল বন্ধ হচ্ছে না এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, নিত্যপণ্যে দর নিয়ন্ত্রণে তদারকি জোরদার করার কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। দেখা যায়, কোনো নিত্যপণ্যের দর বাড়লে বলা হয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু পরে আর কিছুই হয় না। এজন্য পণ্যের দাম হঠাৎ যেন বাড়াতে না পারে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা হলো বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। ভোক্তাদের অধিকার দেখার জন্য রয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এবং নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩Ñ দুটি আইনের মাধ্যমে সরকার দেশে বাজার মনিটরিং করে থাকে।
