জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকোকে তার দুই শিশু সন্তানের সঙ্গে থাকার অনুমতি দিয়ে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রেখেছে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দুই শিশুর বাবা ইমরান শরীফের করা আবেদনে বৃহস্পতিবার কোনো আদেশ দেননি চেম্বার বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
নাকানো এরিকোর আইনজীবী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী ৯, ১১, ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে শিশুদের সঙ্গে গুলশানের বাসায় মা নাকানো এরিকোর থাকবেন, বাবা এই চার রাত সেখানে থাকতে পারবেন না।
আর ইমরান শরীফের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম বলেন, আজকে নো অর্ডার দিয়েছেন চেম্বার আদালত। এ অদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিল বিভাগে যেতে হলে ফের আবেদন করে যেতে হবে। আমার মতে যাওয়া উচিত না। এখন আমার মক্কেল অস্থির হয়ে আছেন। উনার কাছে গোপন কোনো তথ্য থাকতে পারে। বাচ্চাদের মা একবার যদি বাচ্চাদের নিয়ে জাপানি দূতাবাসে গিয়ে ওঠেন, তাহলে আমাদের কিছু করার থাকবে না।
চেম্বার আদালতের শুনানিতে এ আইনজীবী বলেন, বাচ্চাদের মতামত শুনেই কিন্তু গত ৩১ অগাস্ট আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। বাচ্চাদের মতামত হচ্ছে, তারা মা-বাবার সঙ্গে থাকবে, নইলে থাকবে না তারা। কিন্তু ৬ অগাস্ট মা হাইকোর্টের আদেশ পরিমার্জন (মোডিফিকেশন) চেয়ে আবেদন করেন যে মা একা বাচ্চাদের সঙ্গে থাকতে চান।
মা নাকানো এরিকোর আবেদনে একা থাকতে চাওয়ার বিষয়টি কোথায় আছে তা দেখতে চান বিচারক। আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ তখন নাকানো এরিকোর মোডিফিকেশন আবেদনটি পড়ে শোনান।
পরে তিনি বলেন, বাচ্চাদের কথা না শুনে শুধুমাত্র মায়ের কথা শুনে তাকে চারদিন শিশুদের সঙ্গে থাকতে দিয়ে দিল! বাচ্চাদের মায়ের সাথে একলা দিয়ে দিল। এ চারদিন বাবা থাকবেন না। অন্য সবসময় বাবা থাকবেন।
বিচারক তখন প্রতিপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য শুনতে চাইলে শিশির মনির হাইকোর্টের বুধবারের আদেশটি পড়ে শোনান।
তিনি বলেন, আদালত পরিমার্জনের আবেদন গ্রহণ করে যে আদেশটি দিয়েছেন সেখানে বাচ্চাদের সঙ্গে মায়ের থাকার বিষয়ে পুরো চার দিনের কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে, ৯, ১১, ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর শুধু রাতে মেয়েদের সঙ্গে থাকবেন মা। তখন বাবা থাকবেন না। বাবা ওই চার রাত বাদে বাকি সময় বাচ্চাদের সঙ্গে থাকতে পারবেন।
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এরপর বাবা ইমরান শরীফের আবেদনে ‘নো অর্ডার’ দেন।
নাকানো এরিকো একজন জাপানি নাগরিক, পেশায় চিকিৎসক। ইমরান শরীফ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক।
দুই শিশুর অভিভাবকত্ব চেয়ে মা নাকানো এরিকো রিট আবেদন করলে গত ১৮ আগস্ট এক আদেশে হাইকোর্ট দুই শিশুকে হাজির করতে বলে।
শিশুদের বাবা ইমরান শরীফ ও তার বোন আমিনা জেবিনকে (শিশুদের ফুপু) ওই নির্দেশ দেওয়া হয়। ইমরান শরীফ যাতে দুই মেয়েকে নিয়ে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য তাদের দেশত্যগে নিষেধাজ্ঞাও দেয় আদালত।
এর মধ্যে গত ২২ অগাস্ট দুই শিশুকে ইমরান শরীফের বারিধারার বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তারপর থেকে তারা মহানগর পুলিশের সাপোর্ট সেন্টারে ছিল। সেখান থেকেই গত ৩১ অগাস্ট দুই শিশুকে আদালতে নিয়ে যায় পুলিশ।
উন্নত পারিবারিক পরিবেশে শিশুদের রাখতে তাদের মা এরিকো ও বাবা ইমরানের আবেদনের পর সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ওইদিন আদেশ দেয় আদালত।
সে আদেশে ইমরান শরীফের ঠিক করা গুলশানের একটি ফ্ল্যটে দুই শিশুকে নিয়ে আপাতত ১৫ দিন একসঙ্গে থাকতে বলা হয়েছিল তাদের।
ঢাকা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালককে বলা হয়েছিল বিষয়টি দেখভাল করতে। আর ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) বলা হয়েছিল শিশু ও মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
কিন্তু সাত দিনের মাথায় গত সোমবার সে অদেশ পরিমার্জন (মোডিফিকেশন) চেয়ে আদালতে আবেদন করে নাকানো এরিকোর আইনজীবী।
বুধবার সে আবেদনের শুনানির পর হাইকোর্ট সন্তানদের সঙ্গে মা-বাবার থাকা এবং তাদের সময় কাটানোর বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে দেয়।
আদালতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ১১ জুলাই নাকানো এরিকো (৪৬) ও ইমরান শরীফ (৫৮) বিয়ে করেন। দুজনের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। দুজনের কেউই নিজ ধর্ম ত্যাগ করেননি।
এর মধ্যে দাম্পত্য কলহ-বিবাদের জেরে গত ১৮ জানুয়ারি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন এরিকো।
টোকিওতে এক যুগের দাম্পত্য জীবনে তারা তিন মেয়ের বাবা-মা হন। তাদের বয়স যথাক্রমে ১১, ১০ ও ৭ বছর। তিন মেয়ে টোকিওর একটি স্কুলে পড়ে।
গত ২১ জানুয়ারি ইমরান টোকিওর ওই স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তার এক মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছিলেন। তবে এরিকোর সম্মতি না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন নাকচ করে।
পরে স্কুলবাসে করে বাড়ি ফেরার পথে বাস স্টপেজ থেকে ইমরান বড় দুই মেয়েকে অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান বলে এরিকোর ভাষ্য।
২৫ জানুয়ারি ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছে সন্তানদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করলে এরিকো তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিকে গত ২৮ জানুয়ারি সন্তানদের জিম্মায় চেয়ে টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন এরিকো।
টোকিওর আদালত গত ৭, ১১ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি পারিবারিক সাক্ষাতের আদেশ দেয়। তবে ওই আদেশ না মেনে ইমরান শরীফ শুধু একবার মায়ের সঙ্গে বড় দুই মেয়ের সাক্ষাতের সুযোগ দেন বলে এরিকো হাইকোর্টে করা আবেদনে বলেছেন।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইমরান মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করার পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি দুই মেয়েকে নিয়ে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন তিনি।
এদিকে গত ৩১ মে টোকিওর পারিবারিক আদালত এরিকোর অনুকূলে বড় দুই মেয়ের জিম্মা হস্তান্তরের আদেশ দেয়।
বাংলাদেশের হাইকোর্টে করা রিট আবেদনে এরিকো বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এতদিন বাংলাদেশে আসতে পারেননি তিনি। গত ১৮ জুলাই শ্রীলঙ্কা হয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন।
এরিকো জানান, ইমরান মেয়েদের সঙ্গে দেখা করাতে গত ২৭ জুলাই তাকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। এতে তার মনে আশঙ্কা হয়, ইমরান মেয়েদের আর কখনও তার সঙ্গে ‘দেখা করতে দেবেন না’। এ কারনেই তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
