অভাবে ঘটিবাটি বিক্রি

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:১০ এএম

কাবুলের চামান-ই-হুজুরি বাজারে বিক্রির জন্য চারটি কার্পেট নিয়ে এসেছেন শুকুরুল্লাহ। গোটা বাজার এলাকা ভরে গেছে ফ্রিজ, কুশন, ইলেকট্রিক পাখা, কোলবালিশ, কম্বল, অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র, পর্দা,  বিছানা, রান্নার সামগ্রীর মতো জিনিসে। এগুলো ছাড়াও আরও বহু উপকরণ বিক্রির জন্য নিয়ে আসছেন সাধারণ আফগানরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির এই ধুম এক দিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর খরা, যুদ্ধ ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে আফগানিস্তানের সমাজে তৈরি হয়েছে নীরব দারিদ্র্য।

তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসার পর আন্তর্জাতিক সব সহায়তা বন্ধ। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভ থেকে আফগান অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ অমানবিক পরিস্থিতির। সাধারণ আফগানদের কাছে অর্থ নেই। তাদেরই টাকা ব্যাংকে থাকলেও তা তোলা যাচ্ছে না। তালেবানরা সাধারণ আফগানদের সপ্তাহে একবার নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ উত্তোলনের সীমা দিয়েছে, আর এতে পরিস্থিতি আরও নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। সপ্তাহে ২০ হাজার আফগানির বেশি তোলা যাচ্ছে না ব্যাংক থেকে।

আজ চামান বাজারে যেসব পণ্য সম্ভার দেখা যাচ্ছে বিক্রির জন্য, তা গত বিশ বছর ধরে একটু একটু করে সঞ্চয় করেছিলেন আফগানরা। কিন্তু এখন এক মুঠো খাবারের জন্য এসব প্রয়োজনীয় পণ্য তাদের বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। আলজাজিরাকে শুকুরুল্লাহ বলেন, ‘আমরা এই কার্পেটগুলো ৪৮ হাজার আফগানিতে কিনেছিলাম। কিন্তু এখন সবগুলো বিক্রি করে ৫ হাজার আফগানিও পাচ্ছি না। আমাকে এসব বিক্রি করে অন্তত কিছু ময়দা কিনতে হবে।’ শুকুরুল্লাহর ঘরের বাসিন্দা সংখ্যা ৩৩। গত বছর থেকে তারা একটি মাত্র ঘরে থাকা শুরু করেছেন।

তালেবানরা ক্ষমতা দখলের আগে থেকেই আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল। করোনা মহামারী ও দীর্ঘ খরা পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকে নিদারুণ পর্যায়ে নিয়ে যায়। খরার কারণে কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হওয়ার অবস্থা দেশটির অধিকাংশ স্থানেই। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের প্রকাশিত এক রিপোর্টে সতর্ক করে বলা হয়, ২০২২ সালের মাঝামাঝি আফগানিস্তানের ৯৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। গত সোমবার জাতিসংঘ প্রধান আন্তোনিও গুতেরেস জানান, অবিলম্বে আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো দরকার। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে আফগানিস্তানের মোট জিডিপির মাত্র ১০ শতাংশ আসে অভ্যন্তরীণ পণ্য থেকে। বাকি ৯০ শতাংশের জন্য দেশটিকে বিদেশি সহায়তার ওপর ভরসা করতে হয়। এখন দেশটির নতুন সরকারের জন্য সাধারণ জনগণের ক্ষুধা নিবারণ করে দেশি অর্থনীতির বিকাশই বড় চ্যালেঞ্জ। তালেবানের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ এ ব্যাপারে জানান, তার সরকার আশা করছে চীন এবং রাশিয়া তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত চীন ও পাকিস্তান ছাড়া অন্য কোনো দেশ ত্রাণ ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেনি। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, চীনের একার পক্ষে আফগানিস্তানের মতো দেশকে রক্ষা করা সহজ হবে না।

আফগানিস্তানের অধিকাংশ শহরেই এখন বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করে খাবার কিনতে দেখা যাচ্ছে। সাবেক আফগান সৈনিক আবদুল্লাহর মাসিক উপার্জন ২০০ ডলারের মতো। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর তার চাকরি না থাকায় এখন তাকে দিনমজুরের কাজ করতে হচ্ছে। তার ভাষ্যমতে, ‘আমি আমার দেশের সেবা করেছি। কিন্তু এখন আমি শ্বাস পর্যন্ত নিতে পারি না। ধুলা আর কাদার মধ্যে আমাকে আট সন্তানের ক্ষুধা মেটানোর জন্য কাজ করে যেতে হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত