ইরাক ও আফগান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাসী টমাহক, হর্নেট, স্কাইবোল্টের মতো ক্ষেপণাস্ত্রের নাম কমবেশি জানে। কিন্তু হাইপারসনিক বিমানের জায়গায় এখন আলোচনায় এসেছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। তাও আবার পূর্ব এশিয়ার মতো অঞ্চলে হঠাৎ করেই হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে বলা চলে। কিছুদিন আগে চীন তাদের প্রথম হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার কথা প্রকাশ করে। শব্দের চেয়ে ছয় গুণ বেশি গতিসম্পন্ন ওই ক্ষেপণাস্ত্র তিন হাজার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া ওই ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণস্থলের দুই কিলোমিটার এলাকার মধ্যে থাকা যাবতীয় ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ পুড়ে যাবে এমনটাও বলা হচ্ছে।
চীনের অমন দাবির এক দিন পরেই যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে তাদের কাছেও আছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। আর সেই ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিসম্পন্ন। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছিল। একাধিকবার ব্যর্থ হওয়ার ইতিহাসও আছে দেশটির। সর্বশেষ বারাক ওবামার আমলে ওই ব্যর্থতা নিয়ে কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হয়েছিল প্রেসিডেন্টকে। এবার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে চীনের স্বীকারোক্তির পরেই যুক্তরাষ্ট্রেরও একই দাবিকে বাঁকা চোখে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কি তবে গোপনে অস্ত্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে!
যুক্তরাষ্ট্রের দাবির পর এবার উত্তর কোরিয়া বলছে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির ও নিখুঁত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে এবং এর সফল পরীক্ষাও করেছে। তাদের দাবি, শব্দের চেয়েও ২০ গুণ গতিসম্পন্ন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তর কোরিয়া যদি সত্যিই তাদের দাবি অনুসারে ক্ষেপণাস্ত্রের মালিক হয়ে থাকে, তাহলে পূর্ব এশিয়ার সামরিক সমীকরণ পাল্টে যাবে। সুইজারল্যান্ডের ওয়েবস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জাপানের মেইজি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিওনেল ফ্যাটন সিএনএনকে বলেন, ‘ঘটনা সত্যি হলে, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন হুমকি বা নিষ্ক্রিয় হওয়ার মুখে।’ আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা ড্রিউ থমসনের মতে, ‘হাইপারসনিক মিসাইল সহজেই এখনকার অত্যাধুনিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে। এখন সেটা নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেডের হলে কথাই নেই। তবে এ ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্রাগারে থাকা আর চাহিদা থাকা এক কথা নয়।’
পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা কেসিএনএ বলছে, উত্তর কোরিয়ার পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কৌশলগত অংশ হিসেবে যে কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন একটি। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, উত্তর কোরিয়া ‘কৌশলগত’ শব্দ দিয়ে ওই ক্ষেপণাস্ত্রের পারমাণবিক সক্ষমতা থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। উত্তর কোরিয়া ইতিমধ্যে ছয়টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। বলা হয়, দেশটির কাছে আরও পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেডগুলো লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানতে পারে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। অবশ্য সিউলের এহোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেইফ এরিক ইসিলির মতে, অন্য দেশের মতো উত্তর কোরিয়ার নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেডকে যে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে নিখুঁতই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। পিয়ংইয়ং যদি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেড দিয়ে সজ্জিত করতে পারে তাহলে এটা ভয়াবহ বিপজ্জনক অস্ত্রে পরিণত হবে। যেকোনো শহরকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য তেমন একটি ক্ষেপণাস্ত্রই যথেষ্ট, সেটা শহরের যেখানেই ফাটুক।
উত্তর কোরিয়া এমন একসময় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার কথা প্রকাশ করল যখন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসেছেন। ওই বৈঠকের সাইডলাইনের মূল আলাপই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অস্থিরতা।
