ইলিশ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:২৮ এএম

প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় দেশের ৩৮টি জেলার নদ-নদীতে আগামী ২২ দিন ইলিশ শিকার বন্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেশের ৩৮টি জেলায় বিশেষ অভিযানে নেমেছে সরকার। গতকাল রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, মজুদ ও ক্রয়-বিক্রয়ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। গতকাল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। তবে নিষেধাজ্ঞার এই সময়কাল নিয়ে ভিন্ন মতের কথা জানিয়েছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা। 

মন্ত্রণালয়ের সভা সূত্রে জানা যায়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় মৎস্য দপ্তর, পুলিশ, র‌্যাব, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সমন্বিতভাবে এ অভিযান পরিচালনা করবে। পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেরা অবৈধ মৎস্য আহরণ করতে না পারেন, সে জন্য কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী ব্যবস্থা নেবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব রওনক মাহমুদের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শ্যামল চন্দ্র কর্মকার, মো. তৌফিকুল আরিফ ও এস এম ফেরদৌস আলম, যুগ্ম সচিব সুবোধ চন্দ্র ঢালী, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী শামস্ আফরোজ ও নৌ-পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি শফিকুল ইসলাম অংশগ্রহণ করেন।

সূত্র জানায়, নিষিদ্ধ সময়ে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ জেলে পরিবারের জন্য ১১ হাজার মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অভিযান বাস্তবায়নকালে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বাগেরহাট জেলার নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে ইলিশসহ সব রকমের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, জামালপুর, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা, কুষ্টিয়া ও নড়াইল জেলার নদ-নদীতে শুধু ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ থাকবে বলেও সভায় জানানো হয়।

সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব রওনক মাহমুদ বলেন, ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ইলিশ মাছকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। মৎস্যবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ইলিশের সর্বোচ্চ প্রজনন সময় বিবেচনা করে এ বছর ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।’

ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এর অধীন প্রণীত ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ রুলস, ১৯৮৫’ অনুযায়ী ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এই ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন অমান্যকারী কমপক্ষে ১ থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

নিষেধাজ্ঞার সময়কাল নিয়ে আপত্তি জেলে-ব্যবসায়ীদের : আমাদের পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ইলিশ শিকারের সরকারের নিষেধাজ্ঞাকালকে আত্মঘাতী বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীসহ জেলেরা। মৎস্য বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ জেলে-ব্যবসায়ীদের মতামতকে উপেক্ষা করে এ অবরোধ করা হয়েছে এমন দাবি তাদের।

জেলেসহ ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছর কমবেশি ডিম ছাড়লেও আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমায় উপকূলের নদীগুলোর মোহনায় ডিম ছাড়ে ইলিশ। এ সময়কে নির্ধারণ করে মা ইলিশের বাধাহীন প্রজননের জন্য ২০০৬ সাল থেকে ২২ দিন নদী-সাগরে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। কিন্তু চলতি বছর ইলিশের এ জীবনচক্রকে উপেক্ষা করে অমাবস্যার ৫দিন আগে থেকেই আরোপ করা হয়েছে অবরোধ। 

পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি ফজলু গাজী বলেন, ইলিশের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত সময়ের কুড়ি দিন আগে থেকেই ২২দিনের অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। এটি ইলিশসহ সব মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তিনি দাবি করেন, মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া অবিবেচনাপ্রসূত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের কারণে দিন দিন মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

মহিপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ রাজা বলেন, নিষিদ্ধ বেহুন্দি সদৃশ জাল দিয়ে ট্রলিং বোট সাগরে অবাধে মাছ শিকার করছে। আধা ইঞ্চি সাইজের মাছ এসব জালের শিকার হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বড় মাছটি রেখে হাজার হাজার টন মাছ মেরে সাগরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এটিকে বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকার যত উদ্যোগ গ্রহণ করুক কাজে আসবে না।        

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, জেলেদের জালে ধরা পড়া অধিকাংশ ইলিশ আকারে ছোট। বড় ইলিশের ২০ শতাংশের পেটে ডিম রয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে জেলে-ব্যবসায়ীসহ মাঠ পর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবরের পর থেকে আবরোধ আরোপের জন্য মতামত দিয়ে দিয়েছিলাম।

তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, বিষয়টি বিজ্ঞানভিত্তিক হওয়ায় মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতামত নিয়ে মন্ত্রণালয় উপযুক্ত সময় মনে করে এ সময়ে অবরোধ করেছে। কাজেই সুফল না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত