ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পূর্বপ্রস্তুতি

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০৪ এএম

২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর সময়েই বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বন্ধ হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় বছর পর আজ ৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো আবার খুলতে যাচ্ছে। প্রথমপর্যায়ে মাস্টার্স এবং অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা হলে থাকার সুযোগ পাবে। পরবর্তী ধাপে অন্য শিক্ষার্থীদেরও হলে ফেরানোর পরিকল্পনা আছে বলে জেনেছি। তবে হলে থাকার জন্য শিক্ষার্থীদের অন্তত এক ডোজ করোনার টিকা নেওয়া থাকতে হবে এবং শারীরিকভাবে সুস্থ হতে হবে।

দীর্ঘ সময় পর বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের ফেরা সুষ্ঠু, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। অধিকাংশ হলের ভৌত-অবকাঠামোর বিশেষ করে রিডিং রুম, ডাইনিং, রান্নাঘর, টয়লেট, সিঁড়ি ইত্যাদির ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। কিছু সংস্কারকাজ এখনো চলমান। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্যও বেশ কিছু কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি আবাসিক হলের প্রবেশমুখে হাত-ধোয়ার জন্য সাবান-পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাপমাত্রা পরিমাপের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। হলের বিভিন্ন দৃশ্যমান স্থানে করোনাভাইরাসজনিত সতর্কতামূলক নির্দেশনা টাঙানো হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সংস্কারকাজ এবং আবাসিক হলের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয় নিজে বিভিন্ন সময়ে সব হল পরিদর্শন করেছেন।

একসঙ্গে সব বর্ষের শিক্ষার্থীর জন্য না খুলে কমসংখ্যক শিক্ষার্থীকে আবাসিক হলে ওঠানোর পেছনে করোনা মহামারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক দূরত্ব মানা ও ভিড় এড়ানোর যুক্তি কাজ করেছে বলে ধারণা করি। কমন স্পেসে শিক্ষার্থীদের মাস্ক ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন না হলে হলের বাইরে না যাওয়ার মতো নির্দেশনাও থাকবে বলে জেনেছি। ক্যান্টিন, টিভি রুম, রিডিং রুম, লাইব্রেরিসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নেওয়ার জন্য নির্দেশক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান বাড়ানোর জন্যও কাজ হয়েছে বলে শুনেছি। সেখানে কভিড টেস্ট ও ভ্যাকসিন প্রদান করাসহ সাধারণ চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা আছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে আইসোলেশন ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনে এসব সুবিধাও নিতে পারবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে যে উদ্যোগটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে সেটি হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আবাসিক শিক্ষার্থীর একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস তৈরি করার উদ্যোগ। এই ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত বৈধ শিক্ষার্থীরাই শুধু আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পাবে। গণরুম বলেও কিছু আর থাকছে না। যে শিক্ষার্থীরা আগে গণরুমে থাকত তাদের হলের বিভিন্ন আবাসিক রুমে আবাসন দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে সব শিক্ষার্থী উপকৃত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সঙ্গে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে সিট পাওয়া ও থাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের নোংরা রাজনীতি ও র‌্যাগিং বন্ধ হবে সেটাই আমরা আশা করি।

করোনা মহামারীর কারণে মুখোমুখি (ফেইস-টু-ফেইস) ক্লাসের পরিবর্তে অনলাইনে অধিকাংশ বিভাগের অন্তত দুই সেমিস্টার ক্লাস শেষ হয়েছে। এসব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষাগুলোও অনলাইনে বা অফলাইনে হয়েছে; এখনো কিছু পরীক্ষা চলমান। শিখন-ঘাটতি পোষানোর জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি রিকভারি প্ল্যানও করেছে। এ পরিকল্পনায় শীত ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি বাতিল করাসহ সেমিস্টারের মেয়াদ কমানোর মতো নানা পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার অ্যাপ্রোচ হিসেবে ভবিষ্যতেও অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা চলমান রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গতানুগতিক শুধু ফেইস-টু-ফেইস লেখাপড়া থেকে বেরিয়ে ব্লেন্ডেড অ্যাপ্রোচের (ক্লাস এবং পরীক্ষার কিছু অংশ অনলাইনে এবং কিছু অংশ অফলাইনে) দিকেই এগোচ্ছে বলা যায়। যাতে ভবিষ্যতে আবার যদি কোনো দুর্যোগ আসে তখন আবার একই অসুবিধায় পড়তে না হয়। অনলাইন এবং অফলাইন দুটি কাঠামোই যেন সমান শক্তিশালী অবস্থায় থাকে। করোনা মহামারীর মধ্যেই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইনস্টিটিউশনাল ইমেইল আইডি পেয়েছে, জুম, গুগল মিট, গুগল ক্লাসরুম প্রভৃতি সফটওয়্যার ব্যবহার করে ক্লাস করা ও পরীক্ষা দেওয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। শিক্ষকরাও অনলাইন পাঠদান ও পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে অনেক পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। কভিড মহামারী না এলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনলাইন দক্ষতা এ পর্যায়ে আসতে আরও কত বছর লাগত তা বলা মুশকিল।

মুখোমুখি অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম আবার চালুর পদক্ষেপ হিসেবে সম্প্রতি ‘ক’ ও ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে অন্য বিভাগের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তাতে অন্য সময়ের মতো ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বিভিন্ন ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হওয়া থেকে খানিকটা মুক্তি পেয়েছে। সামনের দিনগুলোতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা বিকেন্দ্রীকরণের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে বলে আশা করা যায়।

মুখোমুখি কার্যক্রম আবার চালু করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রেও এসব পরিকল্পনা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আবাসিক হলে বহিরাগত বা অনাবাসিক কাউকে থাকতে না দেওয়া থেকে শুরু করে ফেইস-টু-ফেইস ক্লাস ও অনলাইন ক্লাস মিলিয়ে ব্লেন্ডেড অ্যাপ্রোচে লেখাপড়াসহ ক্লাসরুম ও আবাসিক হলের সার্বিক শৃঙ্খলা ধরে রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার মতো ছোট-বড় সবক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আন্তরিক সহযোগিতা না থাকলে কোনো পরিকল্পনাই কার্যকর হবে না।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় এবং ইনস্টিটিউট ও বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিগুলো খোলা হয়েছে। খোলার দিনই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়ম না মানার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ১ অক্টোবর অমর একুশে হলে তালা ভেঙে শিক্ষার্থীরা উঠে পড়েছে। দুটি ঘটনাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিয়ে ভাবাচ্ছে। তবে আশা করতে চাই এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব ভালো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে এতটুকুই চাওয়া!

লেখক : শিক্ষা-গবেষক ও শিক্ষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত