কোরআনের বর্ণনায় মানুষের চরিত্র

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১১:৫৪ পিএম

আহনাফ ইবনে কায়েস। আরব মরুর এক মুজাহিদ। শৌর্য আর সাহসে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। আরবি সাহিত্যের সমঝদার ব্যক্তি। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র চেহারা মোবারক দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি। কিন্তু পেয়েছেন বহু সাহাবির একান্ত সান্নিধ্য। একদিন তার সামনে এক ব্যক্তি কোরআনে কারিমের এই আয়াতটি পড়লেন, ‘আমি তোমাদের কাছে এমন একটি কিতাব নাজিল করেছি, যাতে তোমাদের কথা আছে; অথচ তোমরা চিন্তা-গবেষণা করো না।’ সুরা আম্বিয়া : ১০

আয়াতটি তাকে যেন নতুন দিগন্তের দিকে আহ্বান জানাল। তিনি বুঝতে চেষ্টা করলেন, ‘যাতে শুধু তোমাদের কথাই আছে’ এই কথার অর্থ কী? তিনি চিন্তা করছিলেন আর অভিভূত হচ্ছিলেন।

মনে হচ্ছিল, কেউ যেন নতুন কিছু শোনাল। তিনি কোরআনে কারিম নিয়ে বসে গেলেন, শুরু করলেন গভীর চিন্তাযোগে তেলাওয়াত। একে একে বিভিন্ন দল, গোত্র ও মানুষের বর্ণনা তিনি পেতে শুরু করলেন। যেমন : একদলের পরিচয় পেলেন, ‘এরা রাতের বেলায় খুব কম ঘুমায়, শেষ রাতে তারা আল্লাহর কাছে নিজের গোনাহ মাফের জন্য মাগফিরাত কামনা করে।’ সুরা যারিয়াত : ১৭-১৮

আবার একদলের পরিচয় পেলেন এভাবে, ‘তাদের পিঠ রাতের বেলায় বিছানা থেকে আলাদা থাকে, তারা নিজেদের প্রতিপালককে ডাকে ভয় ও প্রত্যাশা নিয়ে, তারা অকাতরে আমার দেওয়া রিজিক থেকে খরচ করে।’ সুরা আস সাজদা : ১৬

কিছু দূর এগিয়ে যেতেই আবার পরিচয় পেলেন আরেক দলের। যাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে, ‘রাতগুলো তারা নিজেদের মালিকের সেজদা ও দাঁড়িয়ে থাকার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেয়।’ সুরা আল ফুরকান : ৬৪

‘যারা ব্যয় করে সচ্ছল এবং অসচ্ছল অবস্থায়, যারা রাগ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল এবং কোমল, আল্লাহ তো কল্যাণকামীদের ভালোবাসেন।’ সুরা আলে ইমরান : ১৩৪

এরপর এলো আরেক দলের পরিচয়, ‘এরা (দুনিয়ার প্রয়োজনের সময়) অন্যদের নিজেদেরই ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়, যদিও তাদের নিজেদের রয়েছে প্রচুর অভাব ও ক্ষুধার তাড়না। যারা নিজেদের কার্পণ্য থেকে দূরে রাখতে পারে, তারা বড়ই সফলকাম।’ সুরা হাশর : ৯

অধ্যয়ন চলছে আর চিন্তার গভীরে ডুবে যাচ্ছেন আহনাফ। এবার পেলেন আরেক দলের পরিচয়, ‘যারা বড় গোনাহ ও অশ্লীল কাজ-কর্ম থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধাম্বিত হয়েও ক্ষমা করে। যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামাজ কায়েম করে; পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’ সুরা আশ শুরা : ৩৭-৩৮

হজরত আহনাফ ছিলেন একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ। নিজের সম্পর্কে তার ধারণা ছিল স্বচ্ছ। আর কোরআনে কারিমে পাওয়া মুমিনদের পরিচয়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে মেলাতে পারলেন না। বরং বলেই ফেললেন, হায় আল্লাহ! আমি তো এই কোরআনের কোথাও ‘আমাকে’ খুঁজে পেলাম না। আমার কথা কোথায়? আমার চরিত্র তো কোথাও নেই? অথচ এ কোরআনে তো তুমি সবার কথাই বলেছো।

থামলেন না তিনি। বরং এগিয়ে চললেন নতুন উদ্যমে। এবার পেলেন আরও অনেক মানুষের পরিচয়, যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, তখন তারা গর্ব ও অহংকার করে বলে, আমরা কী একটি পাগল ও কবির জন্য আমাদের মাবুদদের পরিত্যাগ করব?’ সুরা সাফফাত : ৩৫-৩৬

তিনি এগিয়ে চললেন, পেলেন আরেক দলের পরিচয়, ‘যখন তাদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন তাদের অন্তর অত্যন্ত নাখোশ হয়, অথচ যখন তাদের সামনে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের কথা বলা হয়, তখন অন্তর খুশিতে ভরে যায়।’ সুরা জুমার : ৪৫

আরেক দলের পরিচয়ও এলো তার সামনে, ‘তোমাদের কীসে জাহান্নামের এই আগুনে নিক্ষেপ করল? তারা বলবে, আমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করতাম না, আমরা গরিব-মিসকিনদের খাবার দিতাম না, কথা বানানো যাদের কাজ আমরা তাদের সঙ্গে মিশে সে কাজে লেগে যেতাম। আমরা শেষ বিচারের দিনটিকে অস্বীকার করতাম, এভাবে একদিন মৃত্যু আমাদের সামনে এসে গেল।’ সুরা মুদ্দাসসির : ৪২-৪৭

হজরত আহনাফ এভাবে কোরআনে কারিমে আঁকা এক একে অনেক দলের লোকদের চেহারার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু মিলল না। শেষের গ্রুপের সঙ্গেও মিলল না। শেষ গ্রুপের ব্যাপারে তো তিনি বলেই ফেললেন, আয় আল্লাহ! এ ধরনের লোকদের ওপর তো আমি খুবই অসন্তুষ্ট। আমি এদের ব্যাপারে তোমার আশ্রয় চাই। এ ধরনের লোকদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি যেমন : নিজের ইমানের ব্যাপারে আস্থাশীল ছিলেন, তেমনি গোনাহের ব্যাপারেও ছিলেন তিনি সমান সজাগ। কোরআনে কারিমের পাতায় তাই তিনি এমন একটি চেহারা খুঁজে ফিরছিলেন, যাকে তিনি একান্ত নিজের বলে মনে করতে পারেন। তিনি মহান আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার ব্যাপারেও ছিলেন গভীর বিশ্বাসী। তাই তিনি কোরআনের পাতায় খুঁজে ফিরছিলেন এমন এক চেহারার, যেখানে তিনি পাবেন ভালো-মন্দ মেশানো মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে আবার গবেষণায় লেগে গেলেন।

তিনি পেলেন এমন একদল মানুষের বর্ণনা, যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘হ্যাঁ! এমন ধরনের কিছু লোকও আছে, যারা নিজেদের গোনাহ স্বীকার করে। তারা ভালো-মন্দ মিশিয়ে কাজ-কর্ম করে, কিছু ভালো কিছু মন্দ। আশা করা যায়, মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেবেন। অবশ্যই আল্লাহতায়ালা বড়ই দয়ালু-ক্ষমাশীল।’ সুরা আত তাওবা : ১০২

হজরত আহনাফ ইবনে কায়েস এ আয়াতের সঙ্গে নিজের অবস্থাকে ভালোভাবে বুঝতে চাইলেন, মেলাতে চাইলেন তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে। যখন হুবহু মিল খুঁজে পেলেন, বললেন, হ্যাঁ! এতক্ষণ পর আমি আমাকে উদ্ধার করেছি। আমি আমার গোনাহের কথা অকপটে স্বীকার করি, আমি যা কিছু ভালো কাজ করি তাও আমি অস্বীকার করি না। এটা যে মহান আল্লাহর একান্ত মেহেরবানি তা-ও আমি জানি। আমি মহান আল্লাহর দয়া ও রহমত থেকে নিরাশ নই। কেননা এই কোরআনে কারিমেরই আরেক স্থানে বলা হচ্ছে, ‘আল্লাহর দয়া ও রহমত থেকে তারাই নিরাশ হয়, যারা গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট।’ সুরা আল হিজর : ৫৬

হজরত আহনাফ কোরআনে কারিমের মর্ম অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বোঝার পর নীরবে বলে উঠলেন, হে মালিক-তুমি মহান, তোমার কোরআন মহান, সত্যিই তোমার এই কোরআনে দুনিয়ার জ্ঞানী-গুণী, পাপী-তাপী, ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন সবার কথাই আছে। তোমার কোরআন সত্যিই অনুপম, সুন্দর।

পাক-ভারতীয় উপ মহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন শায়খ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) তার এক রচনায় হজরত আহনাফ ইবনে কায়েসের এ ঐতিহাসিক গল্পটি বর্ণনা করেছেন। আসুন, আমরাও প্রত্যেকে খুঁজে ফিরি কোরআনে কারিমে বর্ণিত দল-উপদলের সঙ্গে আমাদের চরিত্রের। বুঝে নিই আমাদের প্রত্যেকের স্ব-স্ব চরিত্র।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত