করোনার ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। প্রায় সব খাতের পাশাপাশি পোশাকশিল্পও পূর্ণোদ্যমে ফিরেছে উৎপাদন ও রপ্তানিতে। দেশে ফিরেছে প্রচুর ক্রেতা এবং বেড়েছে ক্রয়াদেশ। এত ক্রয়াদেশের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন অসংখ্য দক্ষ কর্মী, যা এখন পোশাকশিল্পের জন্য খুবই জরুরি। কিন্তু এরই মধ্যে পোশাকশিল্প মালিকদের আশঙ্কায় ফেলেছে দক্ষ শ্রমিক রপ্তানির বিষয়টি। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) রাষ্ট্রীয় জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি জর্ডানে দক্ষ নারী পোশাকশ্রমিক রপ্তানির যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে তা নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্টদের।
পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভিয়েতনামে করোনার প্রভাবে এখনো লকডাউন থাকায় বেশ ভালো পরিমাণের কার্যাদেশ আসছে দেশে। ক্রমবর্ধমান এ খাতে রপ্তানির আদেশ বাড়ায় স্থানীয়ভাবে সামনের কয়েক বছরের মধ্যে আরও দুই থেকে তিন লাখ দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। ক্রয়াদেশ গ্রহণ করে এমনিতেই শ্রমিক সংকটে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারখানাগুলোর। এমতাবস্থায় দক্ষ শ্রমিক রপ্তানি হলে রপ্তানিমুখী এ শিল্পে শ্রমিকের মারাত্মক সংকট তৈরি হবে।
পোশাকশিল্পের দেশীয় উদ্যোক্তারা বলছেনÑ জর্ডান, মরিশাসের মতো দেশগুলো পোশাকশিল্পে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। সেখানে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক গেলে দেশের পোশাক খাতে সংকট দেখা দেবে। জর্ডানে বাংলাদেশি শ্রমিক দিয়ে কাজ করে বাংলাদেশের অর্ডারগুলোই ওদিকে যাবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
বোয়েসেলের মাধ্যমে জর্ডানে নারী গার্মেন্টস অপারেটর নিয়োগের জন্য নির্বাচিত কর্মীদের বিনা খরচে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। নিয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষ নির্বাচিত কর্মীদের যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচ বহন করবে। নিয়োগ হবে সম্পূর্ণ বিনা খরচে। প্রার্থীর বয়স ১৮ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে হতে হবে।
বোয়েসেল এজন্য প্রতি শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে তিনটি স্থানে কর্মী বাছাই করবে। এগুলো হচ্ছে শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (এসএফএমএমটিটিসি), দারুসসালাম, মিরপুর-১; বাংলাদেশ-কোরিয়া টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (বিকেটিটিসি), দারুসসালাম, মিরপুর-১ এবং বাংলাদেশ-জার্মান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (বিজিটিটিসি), মিরপুর-২, ঢাকা।
জর্ডানে নারীশ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. বিল্লাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩৯টি গার্মেন্টস ৬ হাজার ২৫০ জন নারীশ্রমিকের চাহিদাপত্র দিয়েছে। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক বোয়েসেলের মাধ্যমে বিদেশে গিয়েছে এবং বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসছে।’
দক্ষ শ্রমিক রপ্তানিতে দেশের পোশাক খাত সমস্যায় পড়বে এমন আশঙ্কার ব্যাপারে বিল্লাল হোসেন বলেনÑ ‘সেখানে দক্ষ, আধা দক্ষ এবং নতুন শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে। সবাই দক্ষ নয়। আর যাদেরকে পাঠানো হচ্ছে তাদের সবাই টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (টিটিসি) থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। ৬৪টি টিটিসি সারা দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একাধিক কোর্স শুধুমাত্র টেইলারিং অ্যান্ড গার্মেন্টসের ওপর পরিচালিত হচ্ছে।’
চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা আছে কিনা জানতে চাইলে বোয়েসেলের এমডি বলেন, ‘প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব স্বয়ং এ বিষয়ে জানেন। আমরা যে কারখানাগুলোতে শ্রমিক পাঠাচ্ছি সেসব কারখানার ভালো করে খোঁজ-খবর করেই আমরা শ্রমিক রপ্তানি করছি।’
বোয়েসেলের দাবি নাকচ করে দিয়ে বিকেএমইএর সহ-সভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের প্রধান নির্বাহী ফজলে এহসান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শ্রমিক যারা একদম ফ্রেশার হয়ে আসে গার্মেন্টসে, তাদেরকে আমরা দক্ষ করে তৈরি করি। এদের পেছনে আমাদের বিনিয়োগ পরিমাপ করার মতো নয়। সেই নারীদের বোয়েসেল বিদেশে পাঠাচ্ছে, অথচ আমাদের এখন প্রচুর দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন।’
জর্ডানে শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে এহসান শামীম বলেন, ‘জর্ডান এমন একটি দেশ, যে দেশটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কোনো কনভেনশন স্বাক্ষর করেনি। এমন একটি দেশে চাকরির নিরাপত্তা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নেই। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ থেকে আমাদের নারীদের নির্যাতিত হয়ে আসার কথা আমরা জানি। এসবের কোনো সুরাহা না করে শ্রমিক রপ্তানি বন্ধ করা উচিত।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতে জর্ডান একটি অনিশ্চিত দেশ। যেখানে নারীরা কতটা নিরাপদে থাকবেন তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাছাড়া কারও কারখানার দক্ষ শ্রমিক ভাগিয়ে নেওয়াটাও অন্যায়। তাদের মতে, চলমান কারখানা থেকে শ্রমিক কৌশলে নিতে শুক্রবারকে টার্গেট করে শ্রমিক বাছাই করা হচ্ছে। সেদিন শ্রমিকের ছুটি থাকে আর এ সুযোগ নিচ্ছে বোয়েসেল। তাছাড়া বোয়েসেলের নিজস্ব কোনো ট্রেনিং সেন্টার না থাকার পরও নারীকর্মীদের অন্য দেশে পাঠানোকে অযৌক্তিক বলছেন গার্মেন্টস শিল্পের উদ্যোক্তারা।
শ্রমিক রপ্তানি নিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শ্রমিক বিদেশে আরও বেশি বেশি যাক তা আমরাও চাই। রেমিট্যান্স আসবে, দেশের অর্থনীতি আরও সুসংহত হবে। তবে আমরা চাই, যে শ্রমিকরা বিদেশে যাবে তাদের চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা যেন দেখভাল করা হয় নিয়মিত। আমাদের পোশাকশিল্প দিনে দিনে আরও বড় হচ্ছে। আরও শ্রমিক প্রয়োজন হবে।’
তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের বড় ধরনের কাজের অর্ডার আছে। সে তুলনায় শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে আমাদের শ্রমিক আমদানি করার অবস্থা। এ সময় শ্রমিক বাইরে রপ্তানি হলে পুরো পোশাক খাতের জন্য সুখকর পরিস্থিতি বয়ে আনবে না। সরকার অবশ্যই পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা ভেবে দেখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
বিজিএমইএ’র পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারটা যদি সরকারের কূটনৈতিক কোনো সিদ্ধান্ত হয় সেটা সরকারের নিজস্ব পলিসি। তবে আমাদের দেশেই এখন দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে। এই অভাব পূরণ না করে বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোকে আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয় না। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমার কারখানাতেই আমি দক্ষ শ্রমিকের অভাব অনুভব করি।’
জর্ডানের শ্রমিকদের অবস্থার ওপরে গেল বছরের ২৯ আগস্ট ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় জর্ডানের সাংবাদিক নূর ইব্রাহিম একটি রিপোর্ট লেখেন ‘যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক শ্রম এবং মজুরি চুরি’ শিরোনামে। সেই রিপোর্টে তুলে ধরা হয় জর্ডানে শ্রমিকদের দুঃখ-দূর্দশার গল্প। এত কিছুর পরও জর্ডানে নারীশ্রমিক পাঠানো হলে তা যেন ভালো ফ্যাক্টরিতে পাঠায়। খারাপ ফ্যাক্টরিতে নারীদের না পাঠানোর আহ্বান জানান শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার।
