দুর্গাপূজার ঢাকান্ডকলকাতা ও সংস্কৃতির বিবর্তন

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২১, ১১:৪৩ পিএম

শরৎ ঋতুর বৈশিষ্ট্য চারপাশে শিউলি ফুলের গন্ধ, আকাশে তুলোর মতো ভেসে যাওয়া সাদা মেঘের আনাগোনা। সোনালি রোদের সহনীয় অনুভূতি, কাশবন জুড়ে কাশফুলের সমারোহ। আর বাঙালি হিন্দুর শারদীয় পুজোর আগমনী বার্তা, ঢাক ও কাঁসর-ধ্বনি। এসবই ছিল শরৎ ঋতুর বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম লক্ষণ। এখন অনেক কিছুই বদলে গেছে। প্রকৃতির ক্ষেত্রে যেমন, জীবনাচারের ক্ষেত্রেও তেমনি।

শরৎ ঋতুতে বাঙালি হিন্দুর সর্ববৃহৎ পার্বণ দুর্গাপূজা। আমাদের ছেলেবেলায় ষাটের দশকে ঢাকা শহরে পূজার আনুষ্ঠানিকতার কেন্দ্রে তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, সূত্রাপুর, রায়েরবাজারসহ কিছু অঞ্চলে পুজোর বড় আয়োজন ছিল। বারোয়ারি বা সম্মিলিত উদ্যোগে ওগুলো সম্পন্ন হতো। ঢাকেশ্বরী মন্দির, জগন্নাথ কলেজ এবং জগন্নাথ হলে পূজা কমিটির উদ্যোগে পূজা হতো। রামকৃষ্ণ মিশনের পূজার আয়োজক ছিল স্বয়ং মিশন প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত পাড়া, মহল্লায়, ঋষিপাড়ায়, স্থানীয়ভাবে স্বল্প পরিসরে বারোয়ারি পূজা হতে দেখেছি। অধিক আড়ম্বরপূর্ণ হয়তো ছিল না। কিন্তু নির্মল আন্তরিকতাপূর্ণ ছিল। নতুন জামা-কাপড় জুতা পরিধান করে নিজ নিজ এলাকার পূজায় সবাই অংশ নিত। ঠাকুর দেখতে দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াত না। বড়জোর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে, তাঁতীবাজার অঞ্চলেই যেত।

আমরা স্কুলের বন্ধুরা মিলে পূজা দেখতে যেতাম। প্রসাদ খেতাম। হিন্দু ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি খেতাম। আমরাও তাদের আনন্দের অংশীদার হতাম। আগেই বলেছি, তখন পূজা আজকের ন্যায় আড়ম্বরপূর্ণ ছিল না। বেশ শান্ত পরিবেশে পূজা-পার্বণগুলো সম্পন্ন হতো। শারদীয় দুর্গাপূজাকে সার্বজনীন বলে আখ্যা দেওয়া হলেও, এই পূজাকে কেন্দ্র করে শ্রেণিবৈষম্য, জাতবৈষম্য কিন্তু কোনো না কোনোভাবে দৃশ্যমান অতীতেও ছিল। এখন তো আরও প্রকট, নগ্ন ও মোটা দাগে দৃশ্যমান। ঢাকা শহরে দুর্গাপূজার সব আনুষ্ঠানিকতা সে সময় ধর্মীয় বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে গ্রাম, মফস্বলে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড যেমন যাত্রা, মেলা, নাটক, পালাগান ইত্যাদি পূজার অনুষঙ্গ হিসেবে অনুষ্ঠিত হতো। বিশেষ করে হিন্দুপ্রধান অঞ্চলসমূহে। ঢাকা শহরসহ সারা দেশে এখন দুর্গাপূজা অনেক আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালিত হয়। পূজার অস্থায়ী আয়োজনও দেখা যায় মাঠে, উন্মুক্ত স্থানে। পূজা এখন ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার উত্তর দিকের অভিজাত অঞ্চলেও। সেখানে বিত্তবান-বনেদি হিন্দুরা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এবং আভিজাত্যপূর্ণ পূজার আয়োজন করেন। সাধারণরা সেখানে তেমন পা মাড়ায় না। আমাদের শ্রেণি-বিভক্ত সমাজের দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবেই অভিজাত শ্রেণির পূজাগুলোকে অনায়াসে চিহ্নিত করা যায়।

পশ্চিম বাংলা বা কলকাতার শারদীয় পূজার নানা গল্প শুনতাম। স্বাধীনতার পর তার দৃষ্টান্তগুলো ক্রমশই আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। যেমন পূজাকে কেন্দ্র করে পূজার গানের রেকর্ড, শারদীয় সংখ্যা উল্টোরথ, প্রসাদ, আনন্দবাজার, দেশ, যুগান্তর হতো নানা ঢাউস আকৃতির প্রকাশনাগুলো। তাতেই উপলব্ধি করা সহজ হতো কলকাতার দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক ব্যাপকতা ও বিশালতা।

এই আকর্ষণে সত্তরের দশকে দুর্গাপূজায় কলকাতায় গিয়েছিলাম। ঘুরেছিলাম কলকাতা, শহরতলি ও বিভিন্ন জেলায়। বারোয়ারি পূজার পাশাপাশি বনেদি পরিবারগুলো নিজ নিজ বাড়িতেও নিজেরা আয়োজন করে পুজোর। এতে আত্মীয়-পরিজনরা যোগ দিতেন এবং ঠাকুর ভাসান পর্যন্ত অবস্থান করতেন। জেলা শহরে, শহরতলিতে এবং কলকাতা শহরের বারোয়ারি পূজাম-পে মাইকে গান বাজানো ছিল অনিবার্য। মাইকে বাজত পূজার গান। বাংলা গানের বরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি লতা, আশা ভোঁসলে থেকে অবাঙালি শিল্পীদের গাওয়া বাংলা গানও বের হতো পুজোয়। পূজাতে বের হওয়া গানসহ বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পীদের গাওয়া গান সারাক্ষণ বাজত। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির মিলনমেলা স্বরূপ আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করত ম-পগুলোতে।

কিছুকাল আগে আবার শারদীয় পূজায় কলকাতায় গিয়েছিলাম। ঘুরে ছিলাম অকুস্থানে। দেখেছি সম্পূর্ণ বিপরীতরূপ। আগেকার পরস্পরের মধ্যকার আন্তরিকতা নেই। যার যার তার তার অবস্থা। পোশাক-পরিচ্ছেদেরও ব্যাপক পরিবর্তন। কারও গায়ে আগের মতো তাঁতের শাড়ি, সুতির জামা-কাপড় নেই। সবাই বলিউডের নায়িকাদের অনুকরণে আদলে হাল ফ্যাশনের জামা, শাড়ি কাপড় পরে আছে। বাঙালি পোশাক-পরিচ্ছেদ যেন প্রায় কারও গায়েই নেই। ম-পে এসে ঠাকুর দর্শন ও প্রণাম সেরে যার যার মতন চলে যাচ্ছে। যেন কেউ কারও নয়। কারও সঙ্গে কারুর কথা বলা, পারস্পরিক আন্তরিকতার লেশমাত্র নেই। মন্ডপের মাইকে অনবরত বাজছে গান। তবে কোনো বাংলা গান নয়। বাজছে কেবলই হিন্দি গান। ওই গানের শব্দযন্ত্রের তা-বে গানের কথা বোঝার সাধ্য কারও নেই। যুবক-যুবতীরা হিন্দি গানের তালে নাচানাচি করছে। ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম অমন বৈপরীত্যে। পূজার গানের আগের সংস্কৃতি নেই। নেই অতীতের ন্যায় শারদীয় সংখ্যারও আধিক্য। বাংলা গানের স্বর্ণযুগ যেন সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। সে স্থানে চলে এসেছে হিন্দি গান এবং হিন্দি গানের অনুকরণে বিকৃত বাংলা গানের দাপট। যেগুলো শোনার অযোগ্য বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। অতীতের পূজার গান পেতে যেতে হয়েছে যাদবপুর, গড়িয়াহাট ও হাতিবাগানের ফুটপাতে সাজানো সিডিতে রূপান্তরিত অতীতের গান খুঁজতে। হিজ মাস্টার্স ভয়েজ, গ্রামোফোন কোম্পানির কালো রেকর্ড এখন দুষ্প্রাপ্য। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে ওগুলো লুপ্ত হয়ে গেছে।

একইভাবে বাংলা চলচ্চিত্রও হারিয়েছে তার স্বর্ণযুগ। ওগুলো এখন কেবলই স্মৃতি। হাতিবাগানের পেশাদার নাট্যমঞ্চের নাটকেরও বিলোপ ঘটেছে। শারদীয় পূজায় মুক্তি পাওয়া বাংলা ছবি ও হাতিবাগানের নাটক দেখার চল বলে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবই ইতিহাসে ঠাঁই নিয়েছে। টালিগঞ্জের বাংলা ছবির সংলাপ কেবল বাংলায় কিন্তু রুচিপূর্ণ বাংলা ভাষায় নয়। এছাড়া আঙ্গিক, কাহিনী সমস্তই বলিউড, দক্ষিণ ভারতের মারদাঙ্গা ছবির আদলে। সুস্থ বিনোদনের চলচ্চিত্রের বিপরীতে স্থূল কদাকার কুরুচিপূর্ণ কলকাতার বাংলা ছবি আর বাংলাদেশের বাংলা ছবির মধ্যে অমিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। দুই বাংলার চলচ্চিত্র শিল্পের ওপর ভর করেছে হিন্দি ও দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্রের ব্যাপক প্রভাব।

পশ্চিম বাংলায় সাংস্কৃতিক বিনোদনের অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম ছিল যাত্রাশিল্প। শারদীয় পূজার এবং শীত মৌসুমে শহরতলি, গ্রাম-মফস্বলে জেলায় জেলায় যাত্রাপালা অনিবার্য বিনোদনের মাধ্যম ছিল। কালের পরিক্রমায় ওই মাধ্যমটি আর আগের মতো ব্যাপকভাবে নেই। লুপ্ত হয়ে গেছে। থাকলেও সেখানে স্থূলতা ঢুকে মাধ্যমটি কুরুচিতে ভর করে টিকে আছে।

আমাদের বাংলাদেশে তো যাত্রাশিল্পের সমাধিই রচিত হয়ে গেছে। বিগত দশকগুলোতে মৌলবাদী শক্তিগুলো জেলায় জেলায় যাত্রাদলগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে আর যাত্রা মঞ্চায়নে বাধা দিয়েছে প্রশাসনের চোখের সামনেই। একইভাবে সারা দেশে দুর্গাপূজার ম-পগুলোতে প্রতিমা ভাঙচুর আর হামলাও চলছে সমানতালে। হিন্দুদের পুজোর প্রতিমা-মন্দিরে হামলাগুলো থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বাউলগান, পালাগান, কবিগানের আসর বন্ধ করা এমনকি বাউল-ফকিরদের চুল কেটে দেওয়ার ঘটনাগুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কেননা এই দুই প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক হামলাই একই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও স্বার্থ হাসিলের জন্য করা হয়ে থাকে। 

আসলে একটি দেশ ও জাতির সাংস্কৃতিক মানের ওপরই নির্ভর করে সভ্যতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা, রুচি, আচার-আচরণ ইত্যাদি। পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক অধঃপতনের দৃষ্টান্ত তো অত্যন্ত মোটা দাগে দৃশ্যমান। অসাম্প্রদায়িকতার জন্য খ্যাত পশ্চিম বাংলা এখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কুরুক্ষেত্রে পরিণত। গত লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফল তো তারই নির্জলা প্রমাণ। লোকসভার ৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ২২টি, হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি ১৮টি এবং জাতীয় কংগ্রেস ২টি আসন লাভ করেছিল। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল অধিক আসন পেয়ে বিজয়ী হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির ভোটপ্রাপ্তির হিসাবটি কিন্তু বেশ অর্থবহ। তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ২ কোটি ৮৭ লাখ। আর বিজেপির ২ কোটি ২৮ লাখ। এছাড়া বিজেপির ৯২ জন প্রার্থী হেরেছেন ৬০০ থেকে ১০০০ ভোটের ব্যবধানে। সাংস্কৃতিক অধঃপতনের নজির তো এই পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার হয়ে যায়।

এই যে মন-মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গির এবং রুচিবোধের পরিবর্তন তার পেছনে ক্রিয়াশীল ভূমিকা পালন করেছে পুঁজিবাদী দর্শন। আত্মকেন্দ্রিকতা, ভোগবাদিতা, বিচ্ছিন্নতা, মুনাফার লিপ্সা সমস্তই পুঁজিবাদী দর্শনের অন্তর্গত। ভারতীয় পুঁজিপতিরা এতটাই শক্তিশালী যে তারাই নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি, অর্থনীতি, গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র শিল্প, টিভি চ্যানেল থেকে সমস্তই। কোন দল তাদের আজ্ঞাবহ হয়ে তাদের মুনাফা সম্প্রসারিত করবে, সেই বিবেচনায় তারা ওই দলকেই কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে সর্বাত্মক সহযোগিতা, সমর্থন দিয়ে থাকে। সহজভাবে বললে ওই পুঁজিপতিরাই যে দলকে পছন্দ তাকেই ক্ষমতায় বসায় আর অপছন্দের অর্থাৎ তাদের স্বার্থরক্ষার বিপরীতে যে দল তাকে ক্ষমতায় আনা তো পরের কথা, ক্ষমতার কাছে-কিনারে পর্যন্ত ঘেঁষতে দেয় না। তাদের মিডিয়াগুলো তাদের অনুগত দলের গুণগানের প্রচারণা চালায়। বর্তমান বিজেপি সরকার কৃষি আইন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ যাদের হাতে তুলে দিয়েছে, সেই আদানি, আম্বানিরাই তাদের মুনাফার স্বার্থে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছে এবং বিজেপির পেছনে টাকা ঢালছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধ্বজাধারীর সাম্প্রতিক বাস্তব চিত্র এমনই। এছাড়া বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও একই অবস্থা কম-বেশি বিরাজমান।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর উপায় নেই। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। ওই পরিবর্তনেই সূচিত হবে সব মানুষের অধিকার ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনমুক্ত সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ।

লেখক নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত