এবছর শান্তিতে নোবেলের জন্য মারিয়া রেসা এবং দিমিত্রি মুরাতভ নামে দুইজন সাংবাদিকের নাম ঘোষণা করেছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। গণতন্ত্র এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় লড়াই করার জন্য ফিলিপাইন ও রাশিয়ার এই দুই সাংবাদিককে এবার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নোবেল কমিটি।
মারিয়া রেসা (৫৮) তার জন্মস্থান ফিলিপাইনে ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতার ব্যবহার এবং বেড়ে চলা কর্তৃত্ববাদ প্রকাশের জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহার করেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য ২০১২ সালে তিনি এবং আরও কয়েকজন মিলে র্যাপলার নামের একটি ডিজিটাল মিডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তিনি সেটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন সাংবাদিক এবং র্যাপলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে মারিয়া রেসা নিজেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার একজন নির্ভীক রক্ষক হিসেবে দেখিয়েছেন। র্যাপলার দুতার্তে শাসনের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযানে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। এই অভিযানে মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে তা দেশটির জনগণের বিরুদ্ধেই একটি যুদ্ধের মতো হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও মিসেস রেসা এবং র্যাপলার ভুয়া খবর ছড়ানো, বিরোধীদের হয়রানি করা এবং জনসাধারণের বক্তব্যে হস্তক্ষেপ করার জন্য কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে তাও ফাঁস করেন।
দিমিত্রি আন্দ্রেইভিচ মুরাতভ (৫৯) কয়েক দশক ধরে রাশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে বাক স্বাধীনতা রক্ষায় লড়াই করেছেন। ১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরু করা স্বাধীন সংবাদপত্র নোভাজা গেজেটার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি মোট ২৪ বছর ওই সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদক ছিলেন। ক্ষমতার প্রতি মৌলিকভাবে সমালোচনামূলক মনোভাব নিয়ে নোভাজা গেজেটা আজ রাশিয়ার সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদপত্র। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা এবং পেশাগত সততার মাধ্যমে সংবাদপত্রটি রাশিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো নিন্দনীয় বিষয়গুলোর তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে, অন্যান্য মিডিয়া যেসব বিষয়ে খুব কমই সংবাদ প্রকাশ করে। ১৯৯৩ সালে শুরুর পর থেকে নোভাজা গাজেটা দুর্নীতি, পুলিশি সহিংসতা, বেআইনি গ্রেপ্তার, নির্বাচনী জালিয়াতি এবং রাশিয়ার ভেতরে ও বাইরে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ‘ট্রল কারখানা’ সহ বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।
নোভাজা গেজেটার সাংবাদিকদেরকে এর জন্য অনেক হয়রানি, হুমকি, সহিংসতা এবং হত্যার শিকার হতে হয়েছে। পত্রিকাটির শুরু থেকে এর ছয়জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চেচনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে আলোড়ন তোলা নিবন্ধের লেখিকা আনা পলিটকভস্কাজাও ছিলেন। এতো এতো হত্যাকাণ্ড এবং হুমকি সত্ত্বেও নোভাজা গেজেটার প্রধান সম্পাদক মুরাতভ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নীতি ত্যাগ করেননি। তিনি ধারাবাহিকভাবে সাংবাদিকদের যা ইচ্ছা তা লেখার অধিকার রক্ষা করেছেন, যতক্ষণ তারা সাংবাদিকতার পেশাগত ও নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলেছে।
মুক্ত, স্বাধীন এবং সত্য-ভিত্তিক সাংবাদিকতা ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা এবং যুদ্ধের প্রচারণা থেকে রাশিয়ায় জনগণকে রক্ষা করে। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্যের স্বাধীনতা জনগণকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে সহায়তা করে। এই অধিকারগুলো গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত এবং যুদ্ধ ও সংঘাতের বিরুদ্ধে সুরক্ষা ঢাল। মারিয়া রেসা এবং দিমিত্রি মুরাতভকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার উদ্দেশ্য এই মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষায় লড়াই এবং রক্ষার গুরুত্বকে তুলে ধরায় তাদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া, আমাদের সময়ে সফল হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ব, নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি উন্নত বিশ্বব্যবস্থা সফলভাবে গড়ে তোলা কঠিন হবে।
নোবেল পুরস্কার জয়ের খবর শুনে র্যাপলারের এক লাইভ সম্প্রচারে মারিয়া রেসা বলেন যে, তার জয় দেখিয়ে দিয়েছে যে ‘বাস্তব তথ্য ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়... বাস্তব তথ্য ছাড়া বিশ্ব মানে সত্য এবং বিশ্বাস ছাড়া একটি বিশ্ব’।
এই বছর যারা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের মধ্যে মারিয়া রেসাই একমাত্র নারী।
জনপ্রিয় টেলিগ্রাম চ্যানেল পোডিয়মকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুরাতভ বলেছেন, ‘আমি হাসছি। আমি এটা মোটেও আশা করিনি। এটা পাগলামি’।
তিনি এই পুরস্কারকে ‘রাশিয়ান সাংবাদিকতার প্রতিফল’ বলেছেন, যা এখন দমন করা হচ্ছে।
রাশিয়ার সরকারের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ অবশ্য মুরাতভকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং বলেন যে, ‘তিনি অবিচলভাবে নিজের আদর্শ অনুযায়ী কাজ করেন, তিনি তার আদর্শের প্রতি নিবেদিত, তিনি প্রতিভাবান, তিনি সাহসী’।
গত নভেম্বরে ফিলিপিনো কর্তৃপক্ষ রেসা এবং র্যাপলারের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ এনেছে এবং দাবি করেছে যে সরকারের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
২০১৮ সালে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে যে, র্যাপলারে বিদেশী বিনিয়োগ একটি মিডিয়া কোম্পানির ওপর নিষিদ্ধ বিদেশী নিয়ন্ত্রণের সমান। অভিযোগ অস্বীকার করে এর বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে ফিলিপাইনের কোর্ট অফ আপিলে আবেদন করে র্যাপলার। কিন্তু আদালত র্যাপলারের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।
২০১৮ সালে র্যাপলারকে দেশটির রাষ্ট্রপতির অফিসিয়াল অনুষ্ঠান কভার করতে নিষেধ করা হয়। প্রেসিডেন্ট দুতার্তের মুখপাত্র বলেছিলেন যে, তিনি র্যাপলারের ওপর ‘আস্থা হারিয়েছেন’।
এরপরও র্যাপলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
১৯৩৫ সালের পর এই প্রথম কোনো সাংবাদিককে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হল। সে বছর সাংবাদিক হিসেবে শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন জার্মানির কার্ল ভন অসিয়েৎস্কি। তার দেশের যুদ্ধ-পরবর্তী গোপন অস্ত্র কর্মসূচি প্রকাশের জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
সংবাদপত্রের সদস্যরা ১৯০৭ সাল থেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়ে আসছেন। সেবছর ইতালীয় সাংবাদিক আর্নেস্তো তেওদোরো মোনেতা ‘ফ্রান্স এবং ইতালির মধ্যে বোঝাপড়া তৈরিতে সরকারি ও প্রাইভেট গণমাধ্যমে এবং শান্তি সভায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য’ নোবেল জিতেছিলেন। সেই বছর তার সঙ্গে ফরাসি আইনবিদ লুই রেনল্টকেও পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। ‘হেগ এবং জেনেভা সম্মেলনের আচার-আচরণ ও ফলাফলের উপর তার ব্যাপক প্রভাবের জন্য’ তাকে পুরস্কারের অংশীদার করা হয়।
এবার ১০২তম বারের মতো নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আগের বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, জুনিয়র, পোল্যান্ডের লেক ওয়ালেসা, সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ নেতা মিখাইল গর্বাচেভ এবং চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গত বছর জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এই পুরস্কার পেয়েছিল।
