শরীর ও মন একটি অপরটির পরিপূরক। তবে মন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে নাকি শরীর মনকেসেটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অবকাঠামো ও ক্রিয়াকলাপের বাহ্যিক রূপ বিদ্যমান। কিন্তু মনের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ। আমরা মন বলতে বুঝি, চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, কল্পনা ও ইচ্ছা প্রভৃতির মতো মানসিক কাজের সমষ্টিকে।
মনের বিষয়টি শরীরের মতো নয়। মানসিক কাজ যখন চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা ইত্যাদি দ্বারা হয়; তখন মনেরও পরিশ্রম হয়। তবে কেউ কোনো কিছুর বিয়োগ, ভয় কিংবা হতাশায় গভীরভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে, কারও কোনো ইচ্ছাপূরণ না হলে, কারও কথা ও কাজে প্রচণ্ড দুঃখ পেলে মন আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এই আঘাতের প্রভাব যখন মনে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন মানুষ মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়। এই মানসিক অবসাদ শরীরকে বিষিয়ে তোলে। মন প্রসঙ্গে হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, মানুষের শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরো আছে, যখন তা ঠিক থাকে, তখন সমস্ত শরীর ঠিক থাকে। আর যখন তা খারাপ হয়ে যায়, তখন সমস্ত শরীর খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখো, সে গোশতের টুকরোটি হলো কলব বা হৃদয়।’ সহিহ্ বোখারি : ৫২
হাদিসে ব্যবহৃত কলব শব্দ দ্বারা গোশতের টুকরো অর্থাৎ হৃদয় উদ্দেশ্য। কোরআনে কারিমে ব্যবহৃত কলবের অর্থও করা হয় হৃদয় দ্বারা। কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘তাদের হৃদয়ে রোগ আছে।’ সুরা বাকারা : ১০
হাদিসের মর্ম দ্বারা বোঝা যায়, মনের অবস্থান হৃদয়ে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে হৃদয় হলো বুদ্ধিমত্তা কিংবা বিবেচনার কেন্দ্রস্থল। কিন্তু কোরআনে ‘কলব’ বা ‘হৃদয়ের’ পর ব্যবহৃত শব্দ ‘আকল’ বা ‘বিবেচনা’ দ্বারা বোঝা যায়, মনের অবস্থান মস্তিষ্কে। কেননা বিবেচনাবোধ মস্তিষ্কের কাজ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত অনুযায়ী মস্তিষ্কই বিবেচনার আধার। তাফসিরে রুহুল মায়ানিতে উল্লেখ আছে, কোরআনে ব্যবহৃত কলব শব্দের ব্যাপারে অনেক স্কলার এই মত দিয়েছেন, কলবই হলো সব জ্ঞানের উৎস। আর তা হলো মস্তিষ্ক। আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা মতে, মনের অবস্থান মস্তিষ্কে। মন শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার করে। তবে হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারের মাত্রা বেশি। তাই মনে হয় হৃদয়েই মনের অবস্থান।
শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষাও জরুরি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং প্রতিষেধক দ্রব্য গ্রহণ করা হলেও মনের অবকাঠামোগত কোনো বাহ্যিক আকৃতি না থাকায় মানসিক অসুখের সুস্থতার ক্ষেত্রে তা খুব একটা দেখা যায় না।
মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার মূলে রয়েছে, রোগগ্রস্ত ব্যক্তির নেতিবাচক চিন্তা করা কিংবা অপর কারও থেকে মানসিক আঘাত পাওয়া। মানবতার ধর্ম ইসলাম মানসিক রোগের মূলকে উৎপাটন করে। যে বিষয়ের চিন্তা-ভাবনা করা ক্ষতিকর কিংবা যে বিষয়ের চিন্তা-ভাবনায় হতাশা ও বিষন্নতা বাড়ে, ইসলাম সে বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে নিষেধ করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমাদের মনে যা আছে, তোমরা তা প্রকাশ করো অথবা গোপন রাখো, আল্লাহ তার হিসাব তোমাদের কাছ থেকে গ্রহণ করবেন।’ সুরা বাকারা : ২৮৪
এমন কোনো বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করা, যার কারণে মানসিক অবসাদ আসতে পারে সেটার জন্যও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। পড়াশোনায় অকৃতকার্য, কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতা, উপার্জনে অক্ষমতা, দাম্পত্য জীবনে অসুখী, নিঃসন্তান থাকা এবং কাক্সিক্ষত বস্তু অর্জন করতে না পারা প্রভৃতি বিষয়ে ব্যর্থ হয়ে মানুষ ভয়ংকর রকমের বিষন্নতা ভোগে। অথচ কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘বিষন্ন হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সঙ্গে আছেন।’ সুরা তওবা : ৪০
কোনো মুমিনের জন্য বিষন্নতায় ভোগা উচিত নয়। তবে মুমিন ব্যক্তির মনে বিষন্নতা আসতে পারে। কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। কেননা তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করে। আল্লাহ তাদের বিষন্নতা দূর করে দেন। মুমিন ব্যক্তি যদি এমন বস্তুর আশা করে, যা তার জন্য ক্ষতিকর তবে আল্লাহ সেটা তাকে দেন না। হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, হতাশায় না ভুগে ধৈর্যশীল হলে আল্লাহ মুমিনকে তার কাক্সিক্ষত বস্তুর দ্বিগুণ পরিমাণ দিয়ে থাকেন।
মানুষকে কষ্ট দেওয়া হারাম। তা শারীরিক হোক কিংবা মানসিক। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ সুরা আহজাব : ৫৮
ইসলাম অল্পে তুষ্ট থাকার শিক্ষা দেয়। কাক্সিক্ষত বস্তু অর্জিত না হলেও অল্প তুষ্টির শিক্ষা মানুষকে বিষন্নতা থেকে মুক্ত রাখে। সর্বোপরি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ইসলামি অনুশাসন মেনে চললে এবং পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করলে আশা করা যায়, কারও পরিবারের কোনো সদস্য মানসিক অবসাদে ভোগবে না। তবুও আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনায় কেউ মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হলে পরিবারের সদস্যদের উচিত তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া।
মানসিক রোগী পাগল নয়। দুঃখ-কষ্ট ও হতাশায় ভোগে যে কারও এমন অবস্থা হতে পারে। অনেক সময় এমন রোগগ্রস্ত মানুষের প্রতি অসহ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নানা অপ্রীতিকর ও জঘন্য খারাপ আচরণ করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং এই সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পরিবার-পরিজনদের সহমর্মিতা ও যত্নশীলতায় ধীরে ধীরে সেরে উঠতে পারে। এর অন্যথায়, হতাশায় ভুগে ভুগে স্থায়ীভাবে মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে মানুষটি। শরীরের চেয়ে মনের সুস্থতার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অথচ যারা মানসিক সমস্যায় ভোগে তাদের বেশির ভাগকেই চিকিৎসা নিতে দেখা যায় না।
আরেক শ্রেণির মানসিক রোগগ্রস্ত মানুষ আছে, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিষফোঁড়া। যাদের মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণ দুশ্চিন্তা নয় বরং লোভ ও ভোগবাদিতা। ভোগবাদিতার কারণে তাদের মানবিকবোধ লোপ পেয়েছে। লোভ ও ভোগের নেশায় তারা যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে পিছপা হয় না। ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে সমাজের অসহায় দুর্বলদের ওপর নির্যাতন করে, তাদের রক্ত চুষে নিজেদের ভোগবাদের সাম্রাজ্য কায়েম করে।
তারা এসব করে মূলত মানসিক স্বাস্থ্যহীনতার কারণে। ধর্মীয় ভীতি এবং সুশিক্ষার অভাবে তাদের মানস থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। সমাজে যেখানে সাম্য-শান্তির চর্চা হয়, সেখানে এমন ভোগবাদী মানসিকতা পোষণ করলে সেটা মানসিক অসুস্থতা হিসেবেই সংজ্ঞায়িত হবে।
