ধরনা দিয়েও সরকারি সুবিধা না পাওয়া বৃদ্ধের আত্মহনন

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:০৯ এএম

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে অভাব ও ক্ষুধার জ্বালায় ইদ্রিস আলী (৭০) নামে এক বৃদ্ধ আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসী। গত মঙ্গলবার দুপুরে প্রাগপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মহিষকুন্ডি গ্রামের হাতিশালা এলাকার নিজ বাড়ি থেকে ওই বৃদ্ধের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি একই এলাকার প্রয়াত আব্দুর রহমানের ছেলে।

গ্রামবাসী বলছেন, বৃদ্ধ ইদ্রিস আলী বয়স্ক ভাতা বা হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের দেওয়া একই ধরনের অন্য সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বহুবার ধরনা দিয়ে অর্থাভাবে তার বয়স্ক ভাতার কার্ডও হয়নি। তার দিনমজুর এক সন্তান থাকলেও তিনি থাকেন ঢাকায়। পুত্রবধূ তাকে দুই বেলা দুমুঠো ভাত খেতে দিতেও কার্পণ্য করত। একবেলা খাবার খেতে দিলেও শ্বশুরকে বকাঝকা করত পুত্রবধূ। আর এমন ঘটনা ছিল ইদ্রিস আলীর নিত্যদিনের। সব কষ্ট বুকে চেপে রেখে তিনি পেটে ক্ষুধা নিয়েই সবার সঙ্গে হাসিমাখা মুখ নিয়ে মিশতেন। প্রায় অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটত অসহায় বৃদ্ধ ইদ্রিস আলীর। গত সোমবার দিনভর অনাহারে থেকে গভীর রাতে ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে নিজ ঘরের বারান্দায় ডাবের (চালের ছাউনির কাঠামো) সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। পরদিন সকালে পুত্রবধূ ও প্রতিবেশীরা ইদ্রিস আলীর মরদেহ ঝুলতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশের একটি দল ইদ্রিস আলীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় মহিষকুন্ডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইদ্রিস আলী নামে ওই বৃদ্ধ খাবার কষ্টে থাকতেন সব সময়ই। বেটার বউ (পুত্রবধূ) তাকে দেখতে পারতেন না। একবেলা খাবার খেতে দিলেও বকাঝকা করতেন। এমন কষ্ট থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। বয়স্ক ভাতা, ফেয়ার প্রাইস বা সরকারি এ ধরনের সব সুবিধা থেকেই বঞ্চিত ছিলেন ইদ্রিস। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে তিনি বহুদিন ধরনা দিলেও কোনো কাজ হয়নি।’

ইদ্রিস আলীর দিনমজুর ছেলে সিদ্দিক আলীও (৩৫) তার অভাবের সংসারে বাবার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৩ বছর আগে আমার মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আমার আব্বা মানসিকভাবে একটু দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন থেকেই আগে দিনমজুরের কাজ করলেও বয়স হয়ে যাওয়া এবং পেটের ব্যথায় কাজকাম করতে পারত না। দিনমজুরের কাজ করে আমিই সংসার চালাই। কাজের সূত্রে ঢাকাতে থাকতে হয়। বাড়িতে আমার স্ত্রী সাফিনা খাতুন ও বাচ্চাদের সঙ্গেই বাবা বাড়িতে থাকত। অভাবের সংসারে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কিছু সমস্যা ছিলই।’

শ্বশুরের মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে পূত্রবধূ সাফিনা খাতুন (২৭) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সোমবার সকালে সংসারের একটা কাজ নিয়ে রাগারাগি হয়েছিল। তারপর শ্বশুর বাড়িতে আর খেতে আসেনি।’

ইদ্রিস আলী হতদরিদ্রদের জন্য সরকারি সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করলেও তা পাননি বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মহিষকু-ি গ্রামের বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন। তবে এ জন্য প্রকৃত বয়সের চেয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স কম উল্লেখ থাকাকে দায়ী করেছেন তিনি। এই জনপ্রতিনিধি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কিছু করার ছিল না। কারণ ইদ্রিস আলীর প্রকৃত বয়স সত্তরোর্ধ্ব হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে তার বয়স ৫৯ বছর উল্লেখ থাকায় তাকে আমরা বয়স্ক ভাতার কার্ড দিতে পারিনি। বিভিন্ন সময় সে বয়স্ক ভাতা কার্ডের জন্য অনুরোধ করলেও দিতে পারিনি। তার নামে সরকারি সুবিধার কোনো কার্ডই ছিল না।’

স্থানীয় প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামানও মৃত ইদ্রিস আলীর পারিবারিক দৈন্যতা ও অভাব-অনটনের কথা স্বীকার করে গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন শুনতে পাচ্ছি লোকটার সংসারে খুব অভাব ছিল। খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট ছিল। কিন্তু সে তার এত কষ্টের কথা কখনো কাউকে বলেনি। বিষয়টি জানাজানির পর গত রাতে (মঙ্গলবার) প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসে সব শুনে লিখে নিয়ে গেছেন। আপনারা ওনাদের সঙ্গে কথা বলেও জানতে পারবেন।’

এ বিষয়ে কথা বলতে দৌলতপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আতাউর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

ক্ষুধার জ্বালায় বৃদ্ধের আত্মহত্যার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার গতকাল মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেখুন, এটা খুব দুঃখজনক একটা উদাহরণ হয়ে যাবে। সরকার যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এ দেশে কোনো মানুষ না খেয়ে মারা যাবে, এটা হয় না। আমি রাতে গিয়েছি ঘটনাস্থলে, সেখানে পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে যেটা জেনেছি, না খেয়ে মারা গেছে এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। তবে ইদ্রিস আলী পেটের পীড়াজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। সেই সঙ্গে পারিবারিক কিছু কলহ থাকলেও থাকতে পারে।’

দৌলতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম জানান, ইদ্রিস আলীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত