কুষ্টিয়ায় ওঝা-কবিরাজের অপচিকিৎসা ও জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসা অবহেলায় সাপের কামড়ে আহত রোগীদের মৃত্যুহার শতভাগে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালের নথিপত্রের তথ্যমতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে সাপের কামড়ে আহত হয়ে আসা ৩২ জন রোগীর সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। যদিও বিষধর সাপের কামড়ে আহত মোট রোগীর প্রতি চারজনের মধ্যে একজন রোগী হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হন বলে কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। জীবিত অবস্থায় হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছেও চিকিৎসকদের অবহেলায় সময়মতো অ্যান্টিস্নেক-ভেনাম ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে না পারায় এসব রোগীর মৃত্যু হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের। অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজন সচেতনতার অভাবে সাপের কামড়ে আহত রোগীকে ওঝা-কবিরাজের কাছে নিয়ে গিয়ে সময়ক্ষেপণ করছেন এবং এটাই রোগীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলে দাবি হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষধর সাপের কামড়ে আহত রোগীদের বাঁচাতে প্রয়োগযোগ্য চিকিৎসার সময় পাওয়া যায় খুব কম। সে কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাপের কামড়ে আহত রোগীর জরুরি চিকিৎসায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টি ভেনাম সংরক্ষণের দাবি তাদের।
দৌলতপুর উপজেলার দক্ষিণ দাড়েরপাড়া গ্রামের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া সোনিয়া খাতুনকে গত ১ অক্টোবর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় সাপে কামড়ে দেয়। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকলে তাকে দ্রুত কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায় পরিবারের লোকজন। সেখানে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। সোনিয়ার পিতা জালাল উদ্দিনের অভিযোগ, ‘হাসপাতালে ভর্তির পর প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা মেয়েটা বেঁচে ছিল, কিন্তু এ সময়ের মধ্যেও সোনিয়াকে অ্যান্টি ভেনাম দেয়নি ডাক্তার।’
গত ৬ অক্টোবর ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডুউপজেলার তাহেরহুদা গ্রামের বাসিন্দা বকুল হোসেনকে (৩৫) সাপে কামড়ালে পরিবারের লোকজন দুজন ওঝা ডেকে আনেন বাড়িতে। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিষ ধ্বংসের চেষ্টা চালায় ওঝাদ্বয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরিবারের লোকজন বকুলকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে ভর্তির পর অ্যান্টিস্নেক-ভেনাম প্রয়োগের আগে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বকুলের মৃত্যু হয়। রোগীর সঙ্গে আসা প্রতিবেশী শহিদুল্লাহ বলেন, ‘একদিকে ঠকবাজ ওঝাদের খপ্পরে পড়ে বকুলের জীবন যায় যায়, অন্যদিকে এত ঝক্কি-ঝামেলা শেষে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির পরও বাঁচানো গেল না।’
হাসপাতালে সাপের কামড়ে আহত রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য জানতে চাইলে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসক ডা. আশরাফুল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে সঠিক তথ্য এ মুহূর্তে আমার কাছে নেই।’
একই তথ্য জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আবদুল মোমেন ‘এত বড় হাসপাতালে কয়জন সাপের কামড়ে আহত হয়ে ভর্তি হয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে বলতে হবে’ বলেই ফোন কেটে দেন। পরে আর তিনি ফোন ধরেননি।
কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন ডা. এইচএম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে অ্যান্টি ভেনাম ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা হয়। শুধু বিষধর সাপের কামড়ে আহত রোগীদের চিকিৎসায় বিনামূল্যে দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা সাপের কামড়ের স্থান দেখলেই বুঝতে পারেন সেটা বিষধর কি না। তবে আমার জানামতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবিরাজ বৈদ্যদের কাছে নিয়ে সময়ক্ষেপণের কারণে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।’
