জঙ্গি দমনে এটিইউর মাস্টারপ্ল্যান

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ০১:১৪ এএম

দেশে জঙ্গিবাদ দমনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) হাতে নিয়েছে পুলিশের বিশেষায়িত অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)। আর এ মাস্টারপ্ল্যানের অধীনে বম্ব ডিসপোজাল বিভাগের অধীনে গড়ে তোলা হয়েছে দুটি গবেষণা সেল। যেখান থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জঙ্গিদের গতিবিধি। পাশাপাশি অভিযানের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে এটিইউর দুইশোর বেশি সদস্যকে সোয়াট (বিশেষ অস্ত্র ও কৌশল) ও কমান্ডো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদের সরবরাহ কমাতে রুট চিহ্নিত করে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। এছাড়া রাজধানীর পূর্বাচলে নিজস্ব ভবন গড়ে তোলার পাশাপাশি আট বিভাগে চালু হচ্ছে এটিইউর নিজস্ব কার্যালয়। যেখানে একজন পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে কার্যক্রম চলবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের আভিযানিক শাখার পুলিশ সুপার ছানোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গিদের এখন অপারেশন চালানোর মতো ক্ষমতা নেই। অনলাইনে কিছু উগ্রবাদী লোকজন সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া ছিন্ন-ভিন্ন কিছু লোকজন আছে। তারা চুপ থাকলেও তাদের ওপর পুলিশের নজরদারি আছে। এজন্য অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটে দুটি গবেষণা সেল তৈরি করা হয়েছে। একটি অস্ত্র ও অন্যটি বোমা বিষয়ে। তারা জঙ্গিদের এ ধরনের কার্যক্রম মনিটরিং করে। সেখান থেকে হাতেগোনা কয়েকজনকে মোস্ট ওয়ানটেড হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের অভিযান চালানো হয়।’

এটিইউর এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য দেশের আট বিভাগে ইউনিটের আঞ্চলিক কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুতই ভাড়া বাসা থেকে পূর্বাচলে নিজস্ব ভবনে ইউনিটের কার্যক্রম শুরু করা হবে। ঢাকা মেট্রো অফিসও থাকবে সেখানে। এছাড়া ইউনিটের অন্তত দুই শতাধিক সদস্যকে সোয়াট ও কমান্ডো ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। তারা যেকোনো ধরনের অপারেশন চালাতে সক্ষম।’

অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে আগে বেশি কাজ করত পুলিশের আরেকটি সংস্থা র‌্যাব। ২০১৩ সালের পর থেকে টার্গেট কিলিং শুরু করে জঙ্গিরা। ২০১৫ সালের দিকে টার্গেট কিলিং বেড়ে গেলে জনমনে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এরপর জঙ্গিবাদ দমনে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অধীনে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) নামে একটি নতুন ইউনিট গঠন করা হয়। ডিএমপির ইউনিট হিসেবে তাদের কার্যক্রমের পরিধিও ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে আইজিপির নির্দেশে ঢাকার বাইরেও তাদের অপারেশন চালাতে হয়েছিল। যে কারণে জাতীয়ভাবে কাজ করতে পুলিশের কাঠামোতে ‘অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট’ নামে আরেকটি ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এই ইউনিটের অনুমোদন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এরপর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে এই ইউনিটের গঠন ও এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫৮১টি পদ সৃষ্টি করা হয়। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে ৩১টি ক্যাডার পদ এবং ৫৫০টি পদ অস্থায়ীভাবে সৃষ্টি করা হয়। একজন অ্যাডিশনাল আইজি, একজন ডিআইজি, দুজন অতিরিক্ত ডিআইজি, পাঁচজন এসপি, ১০ জন অ্যাডিশনাল এসপি, ১২ জন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) এবং ৭৫ জন ইন্সপেক্টর, ১২৫ জন সাব-ইন্সপেক্টরসহ বাকি পদগুলো কনস্টেবল পদমর্যাদার। যানবাহন যুক্ত করা হয় ৪১টি। জঙ্গি দমনে মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে ছয়টি শাখায় বিভক্ত করে সাজানো হয়েছে এ বিশেষ ইউনিটকে। তার মধ্যে সোয়াট টিম, ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন টিম, বম্ব এক্সপ্লোশন ইনভেস্টিগেশন টিম, ক্রাইসিস ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম, এক্সপ্লোসিভ ডিসপোজাল টিম ও কে-নাইন স্কোয়াড (ডগ স্কোয়াড) অন্যতম। এছাড়া রয়েছে দুটি বিশেষ গবেষণা সেল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জঙ্গিদের দুর্বল করতে তাদের অস্ত্র ও বিস্ফোরকের উৎস বন্ধ করতে গবেষণা সেল দুটি কাজ করছে। তারা বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের ধরন সম্পর্কে অনুসন্ধান করে থাকে। এরপর সেখানে ব্যবহৃত রাসায়নিক সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তার আমদানিকারকের বিষয়ে তথ্য নিয়ে ক্রেতা সম্পর্কে একটি ধারণা নিয়ে তথ্যভান্ডার (ডেটাবেইজ) তৈরি করে। এছাড়া ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কেও একটি গবেষণা সেল রয়েছে। ওই সেলের সদস্যরা দীর্ঘদিন তদন্ত শেষে কোন মতাদর্শের জঙ্গিরা কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে সে সম্পর্কে তথ্যভা-ার তৈরি করে। এই তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সীমান্তের দুটি পথে এখন অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে জঙ্গিরা। এর মধ্যে একটি পাহাড়ি ও অন্যাটি নদীপথে। নদীপথ হিসেবে তারা ব্যবহার করছে উত্তরবঙ্গের একটি জেলাকে এবং পাহাড় হিসেবে বেছে নিয়েছে পার্বত্যাঞ্চলকে। ফেনী ও আরও একটি জেলা থেকে পর্যায়ক্রমে হাতবদল হয়ে জঙ্গিদের কাছে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র এসেছে। এ কারণে ওইসব এলাকার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের আভিযানিক শাখার এক কর্মকর্তা জানান, জঙ্গিরা আগে পুরান ঢাকার বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে বিস্ফোরক কিনত। বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসার পর ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের ডেকে পাঠানো হয়। এরপর যাচাই না করে এসব বিস্ফোরক কারও কাছে বিক্রি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সেখান থেকে বিস্ফোরক না পেয়ে জঙ্গিরা এখন ম্যাচের কাঠির বারুদ বোমার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন পুলিশ বক্সে বোমা হামলার ঘটনায় এ ধরনের বারুদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ কারণে ম্যাচ তৈরির বিভিন্ন কারখানার কর্মকর্তাদের কাঠির মাথায় বারুদের পরিমাণ কমিয়ে তুলনামূলক অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।

এটিইউ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনলাইনে অনেক জঙ্গি সক্রিয় রয়েছে। তারা শুধু নিজেদের ভিন্নমত প্রকাশ করে থাকে। তাদের তুলনামূলক কম হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তারা নজরদারিতে রয়েছে। এছাড়া জঙ্গিদের আরও একটি গ্রুপ রয়েছে। তারা কথা কম বলে, কাজ করে বেশি। ওই গ্রুপটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেএমবির পুরনো ওই গ্রুপটি আইএসকে তাদের মডেল হিসেবে মান্য করে। এ কারণে তারা তাদের ধাঁচে চলতে চায়। ওই গ্রুপটি অস্ত্রবাজিতে বিশ্বাসী এবং হত্যাকাণ্ডে তারা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে শুধু আত্মরক্ষার্থে। এমন পরিস্থিতিতে ধারালো অস্ত্র ক্রেতাদের ওপরও নজরদারি করছে পুলিশ। পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র পাচারের রুটেও কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গি নিধন করতে অ্যান্টি টেররিজমকে আলাদাভাবে সাজানো হচ্ছে। তারা বেশ কিছু মাস্টারপ্ল্যান করেছে। বোমাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গবেষণা সেলে পাঠানো হয়। তাদের কাছ থেকে বোমা বানাতে পারদর্শীদের সম্পর্কে একটি ধারণা নিয়ে ওই জঙ্গিদের মোস্ট ওয়ানটেড হিসেবে চিহ্নিত করে বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়। হাতেগোনা ওই কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে জঙ্গিদের একটি বিশাল গোষ্ঠী বোমার প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষতা হারাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ধরনের একাধিক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপশি অস্ত্রের ব্যবহার রুখতে সীমান্ত এলাকায় বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। তবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এই মুহূর্তে জঙ্গিদের বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটানোর সামর্থ্য নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত