পীরগঞ্জের মাঝিপল্লীতে মানুষের মাঝে বিশ্বাসের ভিত শক্ত হতে শুরু করেছে। ১৭ অক্টোবর রাতের ভয়াবহতা পেছনে ফেলে সামনে তাকাতে চাইছেন তারা। তবে কারও কারও চোখে এখনো ভেসে ওঠে সেই রাতের ভয়াবহতা, আগুনের লেলিহান শিখা। আগুনে পুড়ে ও লুটপাটে হারানো সম্পদের শোক কারও কারও বুকে বাজছে এখনো। তবে ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন হারানো সম্পদ ফিরে না পেলেও জীবনকে নতুন করে গোছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। সুধীজন, রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও এমপি-মন্ত্রীদের আশ^াসে আস্থা রাখছেন মাঝিপল্লীর বাসিন্দারা। পাচ্ছেন নতুন করে বাঁচার সাহস।
মাঝিপল্লীর বাসিন্দারা জানান, সরকার, দাতা সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলো যেভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে তাতে অল্প সময়ের মধ্যে এসব এলাকার লোকজন তাদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
তারা জানান, ঘটনার পরদিন ১৯ অক্টোবর জাতীয় সংসদের স্পিকার ও রংপুর-৬ আসনের সাংসদ ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ১০০ বান্ডিল ঢেউটিন, ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্ত বরাদ্দ থেকে ৬৬ জনকে জনপ্রতি ১০ হাজার করে মোট ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া জীবিকার জন্য ১৫ জেলেকে মাছ ধরার জাল দেওয়া হয়।
এরপর ২০ অক্টোবর ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান ৩৩ জনকে ৫ হাজার টাকা করে এবং ২৮ জনকে ১০ হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, ২৫ প্যাকেট গোখাদ্য, ৪০ প্যাকেট শিশুখাদ্য বিতরণ করেন। একই দিন জেলা পরিষদ রংপুরের পক্ষ থেকে ২৫ জনকে ৩ হাজার টাকা করে ৭৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এর পরদিন দুর্যোগ ব্যপস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান অগ্নিকান্ড ও ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং ৬৬টি পরিবারের মাঝে ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৬৬টি কম্বল, ৬৬টি শাড়ি, ৬৬টি লুঙ্গি বিতরণ করেন। ওই দিন জেলা প্রশাসন রংপরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর সংস্কার ও মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত দুটি মন্দিরের জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। উল্লিখিত সহায়তা ছাড়াও বেসরকারি সংস্থা রেড ক্রিসেন্ট, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন, আরডিআরের পক্ষ থেকে ৩৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
শিরীন শারমিন চৌধুরী নিজ নির্বাচনী এলাকা রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া ও বড় করিমপুরে সম্প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অনাকাক্সিক্ষত হামলার তীব্র নিন্দা জানান। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও ঘরবাড়ি পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্তকরণের পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সাহস ও আশ্বাস দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিক আপনাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, অঙ্গসংগঠনসহ প্রশাসন তাদের পাশে আছে ও থাকবে। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান। ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির সংস্কারসহ পুনর্নির্মাণ এবং আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দেন।
এরপর পরিদর্শনে গিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, পীরগঞ্জের জেলেপল্লীতে যারা হামলা চালিয়েছে তারা কেউই রেহাই পাবে না। দ্রুত জড়িতদের চিহ্নিত ও আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সান্তনা দিয়ে বলেন, সরকার সব সময় আপনাদের পাশে আছে এবং থাকবে।
ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১২ বছরে এমন ঘটনা ঘটেনি। যারা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল তারাই নাশকতা করে, বোমা ফাটিয়ে অসাম্প্রদায়িক দেশকে সাম্প্রদায়িক বানিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে চায়। এ কারণে তারা বিশৃঙ্খলা করছে। প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত জনসাধারণকে উদ্দেশে করে বলেন, প্রত্যেককে সচেতন থাকতে হবে। ভয় করে মুখ বন্ধ রাখলে চলবে না, এদের চিহ্নিত করতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। সবাইকে ঐক্যবন্ধভাবে কাজ করতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সবাপতি সুধীর চন্দ্র দেশ রূপান্তরকে জানান, সবাই সাহসী হয়ে উঠছে। ভয় তাদের আর দমাতে পারবে না। রংপুরের পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আপনারা সাহস হারাবেন না।
ইতিমধ্যে উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার অন্যতম হোতা সৈকত মন্ডল, রবিউল ইসলামসহ ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর এ ঘটনাটি আসলে সাম্প্রদায়িক ছিল না, ব্যক্তিগত রেষারেষি থেকে শুরু।
