অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার শিক্ষায় শিশুদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৮ পিএম

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের জন্ম ১৯৪৭ সালে, রাজশাহীতে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে এক স্বতন্ত্র নাম হিসেবে আবির্ভূত হন সেলিনা হোসেন। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ আরও বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন ডি.লিট উপাধি। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২৫টি। এবার দুর্গাপূজায় দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক হামলা-সহিংসতা এবং দেশে ধারাবাহিকভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বদলে সাম্প্রদায়িকতা ও ঘৃণা-বিদ্বেষের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন সেলিনা হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরেই হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এবার দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে লাগাতার একের পর হিন্দুদের মন্দির-পূজামণ্ডপ-ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর-লুটতরাজ চালানো হয়েছে সেটা সম্প্রতি আর দেখা যায়নি। এ সহিংসতার ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন?

সেলিনা হোসেন : আমি এ ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত। আমি এ হামলার ঘটনাকে দেখছি আমাদের জাতিসত্তার মৌলিক অসাম্প্রদায়িক মানসচেতনা থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটা ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত হিসেবে। এ ধরনের জাতিগত সাম্প্রদায়িক অবস্থান নিয়ে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। আমরা কী জন্য অন্যের ধর্মকে আঘাত করব? আমার ধর্ম আমার কাছে পবিত্র বিশ্বাস। প্রত্যেকের ধর্ম প্রত্যেকের কাছে পবিত্র বিশ্বাস। সেটা নিয়েই প্রত্যেকে তার জীবনযাপন করেন। কেন আমরা সাম্প্রদায়িক আঘাত হেনে তার ধর্মপালনকে নষ্ট করব? অপরের ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত হানব?

দেশ রূপান্তর : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বরাবরই দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা-সহিংসতার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটকে দায়ী করে আসছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু কুমিল্লার নানুয়া দীঘির প্রথম ঘটনার পরদিন প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও একের পর এক হামলা ছড়িয়ে পড়তে থাকল। সহিংসতা রোধ করতে না পারার জন্য পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতার কথাও আলোচিত হচ্ছে। তাহলে আওয়ামী লীগ কী করে এ ক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াতের চেয়ে ভিন্নতার দাবি করবে কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার দাবি করবে?

সেলিনা হোসেন : এটা আওয়ামী লীগের একধরনের ব্যর্থতা। আওয়ামী লীগের আমলে, বিশেষত যখন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায়, তখন দেশে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটবে এটা আমি নিজেও কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। আমার মনে হয়েছিল, দুর্গাপূজার আগে সব জায়গায় পূজার আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে তিনি কঠোরভাবে নির্দেশ দেবেন। যাতে কোথাও কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঘটনা ঘটার সুযোগ না হয়। তিনি সেই নির্দেশ দিয়েছেনও। কিন্তু তারপরও কেন এমন সব হামলার ঘটনা ঘটতে থাকল, কেন এসব হামলা ঠেকানো গেল না, সেটা আমার নিজের কাছেও একটা বিরাট প্রশ্ন।

দেশ রূপান্তর : লক্ষ করলে দেখা যাবে শুধু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানই নয়, পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীও হামলা-সহিংতার শিকার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সেলিনা হোসেন : এ পরিস্থিতির অবশ্যই মূল্যায়ন হওয়া উচিত। তারা এ দেশের নাগরিক। তারা তাদের নিজ নিজ জাতিসত্তা নিয়ে এ দেশে বসবাস করছে। সাংবিধানিকভাবেই সব জাতিসত্তার অধিকার স্বীকৃত। তাহলে তারা কেন এ দেশে এমন নিপীড়ন-নির্যাতনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বেঁচে থাকতে বাধ্য হবে? সুতরাং আমি এ বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি দূর করে সব জাতিসত্তার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমি আমাদের সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। কিন্তু এখন রাজনীতিতে ধর্মীয় মতাদর্শের আধিপত্য দিন দিন বাড়ছে। শুধু ইসলামপন্থি দলগুলোই নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতসহ বেশিরভাগ দলই এখন ধর্মীয় মতাদর্শকে সর্বাগ্রে স্থান দিচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বাহাত্তরের সংবিধান ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার চার মূলনীতিতে ফিরে যাওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

সেলিনা হোসেন : এটা আমাদের গভীর কষ্টের জায়গা। বেদনার জায়গা। এটা নিয়ে আমি এখন কী বলব? কাকে বলব? আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যে চেতনায় বঙ্গবন্ধু বাহাত্তরের অসাম্প্রদায়িক সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন, সেই জায়গা থেকে যে আমাদের জাতি আমাদের রাষ্ট্র দূরে সরে গেছে এ বেদনা রাখার জায়গা আমাদের নেই। কিন্তু জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকেই এ চেতনায় ফিরে যেতে হবে, এ অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিষয়টি সবারই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে, সবাইকেই এটা মেনে চলতে হবে। কারণ বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে যেকোনো দলই ক্ষমতায় আসতে পারে, ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার চেতনা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অবমূল্যায়ন করে কেউই এ রাষ্ট্র পরিচালনা করার অধিকার রাখেন না। কেননা সেটা করা হলে স্বাধীনতার কোনো অর্থ থাকে না। তাহলে আজকে কেন আমরা দলমত নির্বিশেষে স্বাধীনতার চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সোচ্চার হয়ে উঠছি না?

দেশ রূপান্তর : স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার হতে চললেও দেশে সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যম ও ক্যাডেট কলেজের মতো কয়েক ধারার শিক্ষা চালু রয়েছে। এক ধারার শিক্ষা যেমন চালু হয়নি, তেমনি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা সংস্কারের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের চিন্তা-চেতনার বৈষম্য কমিয়ে আনারও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতিসহ পরমতসহিষ্ণুতা সৃষ্টি না হওয়া বৃহত্তর জাতীয় চেতনা প্রতিষ্ঠা না হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা কতটা দায়ী বলে মনে করেন?

সেলিনা হোসেন : আমি তো সবসময়ই মনে করি দেশের পুরো প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামো সরকারি হওয়া উচিত। সব শিশুই প্রথমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই ধারার শিক্ষা নেবে। এরপর কেউ যদি মনে করে, সে ধর্মীয় শিক্ষা নেবে, তাহলে সে তখন সেই শিক্ষা নেবে। কেউ যদি অন্য কোনো বিষয়ে শিখতে চায় তার জন্যও সেই ব্যবস্থা থাকবে। আমার মনে হয়, পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষার ক্ষেত্র নির্বাচনের এ ব্যবস্থাটা বিশ^বিদ্যালয় স্তরে গিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

দেশ রূপান্তর : রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কিংবা ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বিশ্ব রাজনীতির সমকালীন মেরুকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। অনেকে বিশেষত, প্রতিবেশী ভারতে বিজেপির নেতৃত্বে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং সেখানে মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতি-গোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের সঙ্গে এ ধরনের সহিংসতার বিস্তারের বিষয়টিকে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। আপনার মূল্যায়ন কী?

সেলিনা হোসেন : এ ধরনের সমস্যা এখন দুনিয়ার সবখানেই ঘটছে। কিন্তু সেটা যে দেশেই হোক না কেন, আমি বলব ধর্ম প্রত্যেক মানুষের পবিত্র বিশ্বাস। সেই ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে অপরাজনীতি করার অধিকার কারও নেই। সেটাই যে দেশেই হোক না কেন। এমন অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকেই সব দেশে সবখানে সব জাতিসত্তার নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষজন যাতে একসঙ্গে এক দেশে এক রাষ্ট্রে সম্প্রীতির মেলবন্ধনে জীবনযাপন করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি করেছে। দেশে যোগাযোগব্যবস্থা, বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। নারী শিক্ষায় দারুণ অগ্রগতি হয়েছে। মানুষের গড় আয়ও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কিন্তু সামাজিক-

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এসব অগ্রগতির সুফল দেখা যাচ্ছে না। সমাজ ক্রমেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে, মানবিক প্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

সেলিনা হোসেন : এটা তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সমাজের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হলে তো আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে এবারও এমন পূজাম-পে হামলার ঘটনা ঘটত না। এ দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা কেন আক্রান্ত হবে? অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুরা কেন আক্রান্ত হবে? এ দেশ যাদের মাতৃভূমি তারা কেন আর সবার সঙ্গে সমান মর্যাদায় থাকতে পারছেন না? এটা তো আমারও প্রশ্ন।

দেশ রূপান্তর : বর্তমান বাংলাদেশের এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী বলে মনে করেন? এখন আমাদের করণীয় কী?

সেলিনা হোসেন : প্রথমেই জোর দিতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিশুদের এমন শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণ করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে দেশকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে মুক্ত করতে। সব সাম্প্রদায়িক হামলার দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করে দেশে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে কেউ আর কোনোদিন এ দেশে এমন সাম্প্রদায়িক হামলা না চালাতে পারে। কোনো ধর্মাবলম্বীরা যাতে অন্যের দ্বারা কখনো আক্রান্ত না হয়।

দেশ রূপান্তর : দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন আপনারা তরুণ। এখন আপনারা এ দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিক। স্বাধীন বাংলাদেশকে ঘিরে যে স্বপ্ন আপনারা দেখেছিলেন আজকের বাংলাদেশ সে স্বপ্নের কতটা পূরণ করতে পারছে?

সেলিনা হোসেন : স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের অনেক স্বপ্নই পূরণ হয়েছে। এখনো আমরা আরও অনেক স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলেছি। পাকিস্তানি উপনিবেশে এটা একটা দারিদ্র্যপীড়িত দেশে পরিণত হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণসহ অনেক ক্ষেত্রেই আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। আজ আমরা একটা সমৃদ্ধ-সম্পদশালী দেশে পরিণত হতে চলেছি। বাংলাদেশ উন্নয়নের গতিধারায় এগিয়ে চলেছে। শিক্ষায় সাফল্য এসেছে। নারী শিক্ষা ও বাল্যবিয়ে রোধের ক্ষেত্রেও অনেক সফলতা এসেছে। নানা দিকেই অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সমাজে যদি মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা না যায় তাহলে উন্নয়নের এ অগ্রযাত্রা সহজ হবে না। সমাজের সব স্তরে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। সেটা করা না গেলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের আরও অনেক সময় লেগে যাবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সেলিনা হোসেন : দেশ রূপান্তরকেও অনেক ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত