রাজধানীর রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর দিল্লুর রহমান ও তার সহযোগীদের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটকে (সিটিটিসি) এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তদন্ত চলাকালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), সিটিটিসি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চাইলে দিল্লুর রহমান ও তার তিন সহযোগীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল রবিবার এসব আদেশ দেয়। পীর দিল্লুর রহমানের অনুসারীদের করা মামলায় যারা হয়রানির শিকার হয়েছেন তারা চাইলে মামলা করতে পারবেন বলে আদেশে বলা হয়েছে।
দেশের ছয়টি জেলায় রাজারবাগের পীর ও তার অনুসারীদের করা ৩৪টি মামলায় আটজন ভুক্তভোগীর করা রিট আবেদন এবং রাজারবাগের পীর ও তার তিন সহযোগীর দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞার নির্দেশনা চেয়ে করা আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেয় আদালত। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি দিন রেখেছে আদালত। রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও এমাদুল হক বশির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।
‘দরবার শরিফের কার্যক্রম জঙ্গিদের মতো’: এদিকে রাজারবাগ দরবার শরিফের বিষয়ে গতকাল সিটিটিসি’র প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রাজারবাগ দরবারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘দৈনিক আল ইহসান’ ও ‘মাসিক আল বাইয়্যিনাত’ পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা, তাদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত বিভিন্ন বই, ইতঃপূর্বে তাদের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন জেলায় তাদের অনুসারীদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে করা মামলা ও ওইসব মামলার তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা ইসলাম ধর্মের নামে এবং অনেক ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের খ-িত ব্যাখ্যার মাধ্যমে মানুষ হত্যা ও তথাকথিত জিহাদকে উসকে দিচ্ছে। তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে জঙ্গিদের কার্যক্রমের মিল রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তারা মানুষের ধর্মানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে পীর এবং তার দরবার শরিফ সামাজিকভাবে কুসংস্কার, ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের এসব কার্যক্রম সরাসরি সরকারি নীতিমালা, দেশের প্রচলিত আইন, সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরোধী।
সিটিটিসি বলেছে, ‘সার্বিক পর্যালোচনায় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, তারা এখনো জঙ্গি সংগঠন হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত না হলেও তাদের বিভিন্ন প্রকাশনা, বক্তব্য, মুরিদ ও অনুসারীদের প্রতি তাদের নির্দেশনার ফলে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে তাদের এসব বক্তব্য ও প্রচার প্রচারণার কারণে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের ‘লোন উলফ’ হামলায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে।’
প্রতিবেদনে অনুসন্ধানের বরাতে বলা হয়, সারা দেশে অসংখ্য খানকা, মাদ্রাসা মসজিদসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সহজ-সরল মানুষকে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে দরকারের অনুসারী করার চেষ্টা করা হয়। আর এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার যে অভিযোগ উঠেছে তারও সত্যতা রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জের নাম বদলে গোলাপগঞ্জ করে তাদের পত্রিকার মাধ্যমে প্রচার করছে। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে নূরানীগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও জেলার নাম পরিবর্তন করে নূরগাঁও, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাম পরিবর্তন করে আমানবাড়িয়া এরকম আরও বেশ কয়েকটি জেলা ও স্থানের নাম পরিবর্তন করে নিজেদের সাম্প্রদায়িক মনোভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
এদিকে রাজারবাগ পীরের অনুসারীদের মামলায় হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের পক্ষে রিট আবেদনের আইনজীবী শিশির মনির গতকাল শুনানিকালে আদালতকে বলেন, মামলা পরিচালনার দরুন তিনি ও তার পরিবার নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পরে হাইকোর্ট শিশির মনিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে পীর ও তার অনুসারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটকারী পক্ষের আইনজীবী এমাদুল হক বশির আদালতকে জানান, তিনিও নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আদালত তাকে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার নির্দেশ দেয়।
এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ আদেশে রাজারবাগের পীর ও দরবার শরিফের সম্পদের তদন্ত করতে দুদককে নির্দেশনাসহ দরবার শরিফের কার্যক্রমে জঙ্গি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না সে বিষয়ে তদন্ত করতে পুলিশের সিটিটিসিকে এবং রাজাবাগের পীর ও তার মুরিদ কর্তৃক ৮ ব্যক্তিকে মামলা দিয়ে কারা হয়রানি করছে সে বিষয়ে তদন্ত করে সিআইডিকে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। গত ২৩ সেপ্টেম্বর চেম্বার আদালত হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত না করে শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেয়।
