শিক্ষা ইসলামের প্রাথমিক এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা গুরুত্বারোপ করেছেন। কোনো জাতির উন্নতির শিখরে পৌঁছার জন্য শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতিকে সভ্য করা সম্ভব নয়। সার্বিক বিবেচনায় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে মূলত আলোচ্য বিষয়, ইসলামি শিক্ষা। ব্যক্তি হিসেবে যেমন শিক্ষা প্রয়োজন, তদ্রƒপ মুসলিম হিসেবে অবশ্যই ইসলামিক শিক্ষা অর্জন করা বাঞ্ছনীয়।
হাদিসের ভাষ্যমতে, দ্বীনি শিক্ষা অর্জন প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। দ্বীনের বিধি-বিধান জানার জন্য, ইসলামি শিক্ষা অতি জরুরি। যার মধ্যে ইসলামের শিক্ষা নেই, তার অবস্থা হচ্ছে-বিরান বাড়ির ন্যায়। শিক্ষার বিষয়ে অসচেতনতা, জটলায় আবদ্ধ এক শ্রেণির সমতুল্য। কর্মে ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তথ্য প্রদান কিংবা জ্ঞানদানকে পাঠদান বলে। শিক্ষা যেমন জরুরি, তার সঙ্গে ইসলামিক শিক্ষা ছাড়া পূর্ণ মুসলিম হওয়ার সাক্ষ্যও বহন করা অসম্ভব।
শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘পড়ুন (হে রাসুল!) আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি জমাট রক্তের পিণ্ড (ভ্রƒণ) থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আপনি পড়ুন, আপনার রব বড়ই দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে তিনি এমন জ্ঞান দিয়েছে, যা সে জানত না।’সুরা আলাক : ১-৫
আল্লাহতায়ালা যেখানে শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন, সেখানে অবশ্যই শিক্ষা অর্জন করতে হবে। তবে সেটা যেন হয় দ্বীনি শিক্ষা। ইলমের মধ্যেও রয়েছে কিছু প্রকারভেদ, যেমন একদা খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর এক প্রশ্নের জবাবে হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, ইলম হলো তিনটি বিষয়, আয়াতে মুহকামা (কোরআন), প্রতিষ্ঠিত সুন্নত (হাদিস) ও ন্যায়বিধান (ফিকাহ)। তিরমিজি
হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, (শিক্ষিত তিনি) যিনি শিক্ষানুযায়ী কাজ করেন অর্থাৎ শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষাও থাকে। তিরমিজি ও আবু দাউদ
জ্ঞান হলো, মালুমাত তথা তথ্যাবলি। এটি দুইভাবে অর্জিত হয়। ক. হাওয়াচ্ছে খামসা তথা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। যথা ১. চোখ, ২. কান, ৩. নাক, ৪. জিহ্বা ও ৫. ত্বক। এই জ্ঞানকে ইলমে কাসবি তথা অর্জিত জ্ঞান বলে। খ. অহি। যথা১. কোরআন ও ২. সুন্নাহ বা হাদিস। এ প্রকার জ্ঞানকে ইলমুল অহি বা অহির জ্ঞান বলে। ইন্দ্রিয় লব্ধ জ্ঞান সদা পরিবর্তনশীল আর অহির জ্ঞান অপরিবর্তনীয়।
নবী-রাসুলদের দাওয়াতি কাজের মূল ভিত্তি ছিল জ্ঞানের আলো দিয়ে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসা। যুগের জ্ঞানী ব্যক্তিরা নবী-রাসুলের ওয়ারিশ। তদ্রƒপ তাদের অবশ্যই দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া আবশ্যক। সেক্ষেত্রে-পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের জ্ঞান যেমন জরুরি তেমনি অহির জ্ঞানও।
মুসলিম কিংবা অমুসলিমকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইসলামের জ্ঞান আবশ্যক। সে জন্য প্রতিটি ব্যক্তির জন্য দ্বীনি ইলম অর্জন করা ফরজ করে দেওয়া হয়েছে। ইসলামে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো আদম সন্তানকে মানুষরূপে গড়ে তোলা। যে শিক্ষা আত্মপরিচয় দান করে, মানুষকে সৎ ও সুনাগরিক হিসেবে গঠন করে এবং পরোপকারী, কল্যাণকামী ও আল্লাহর প্রতি অনুরাগী হতে সাহায্য করে, সেটাই প্রকৃত শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে, অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচিত করে, দূরদর্শিতা সৃষ্টি করে। তাই আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে প্রথমে তার শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘আর আল্লাহতায়ালা শেখালেন আদমকে সমস্ত বস্তুসামগ্রীর নাম।’ সুরা বাকারা : ৩১
যে জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের অন্তর হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা থেকে মুক্ত হয়ে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়, তাই ইসলামি শিক্ষা। অতএব ইসলামের শিক্ষা একান্ত জরুরি। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী কারিম (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘দুই ব্যক্তি ছাড়া আর কারও প্রতি ঈর্ষা করা যায় না। যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দিয়েছেন, তারপর তাকে ওই ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে খরচের তাওফিক দিয়েছেন এবং যাকে আল্লাহ (দ্বীনের) জ্ঞান দান করেছেন সে তা দ্বারা ফায়সালা করে এবং লোকদের তা শেখায়।’ সহিহ্ বোখারি
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে স্বয়ং আল্লাহ শিক্ষাদান করেছেন। তিনি বলেন, আমার রব আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, তা কতই না উত্তম শিক্ষা এবং আমার রব আমাকে তারবিয়াত করেছেন, তা কতই না শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণ। মুসনাদে আহমাদ
মূলত শিক্ষা হলো এক ধরনের আত্মোপলব্ধি। শিক্ষিত মানুষ বিনীত ও নিরহংকার হয়ে থাকেন। শুধু ভাষা জ্ঞান, বর্ণ জ্ঞান কিংবা বিষয় জ্ঞানের নাম শিক্ষা নয়। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অক্ষরজ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও অহির শিক্ষায় আলোকিত হয়ে তিনি হয়েছেন বিশ^ শিক্ষক।
বস্তুত যে শিক্ষা মানুষের কল্যাণে কিংবা উপকারে আসে না, তা শিক্ষা নয়। যে শিক্ষা দুনিয়ার শান্তিও পরকালে মুক্তির সহায়ক তাই প্রকৃত শিক্ষা। ইসলামি শিক্ষার প্রতিপাদ্য-বিশ্বভ্রাতৃত্ব, মানবকল্যাণ, ত্যাগ ও বিনয়। যদি কোনো শিক্ষা হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা ও অহংকারের উদ্রেক ঘটায়, সে শিক্ষা মূর্খতা ও অজ্ঞতা ছাড়া কিছুই নয়। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এবং আদর্শ গুণাবলিসম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি ইসলামি শিক্ষার উদ্দেশ্য।
