কর ফাঁকি সংক্রান্ত আলোচিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্স কেলেঙ্কারিতে নাম আসা বাংলাদেশি অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চেয়েছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে অর্থ পাচার রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাও জানতে চেয়েছে আদালত।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) আগামী ৯ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন আকারে এসব বিষয় জানাতে বলেছে হাইকোর্ট।
বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ আদেশ দেয়।
শুনানিকালে আদালত দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে এসব অপরাধ রোধে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের ধীরগতিতে উষ্মা প্রকাশ করে হাইকোর্ট। সুইস ব্যাংকসহ বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংকে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম খান ও সুবীর নন্দী দাস। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি আদেশসহ রুল দেয় হাইকোর্ট। আদেশে সুইস ব্যাংকসহ বিদেশি ব্যাংকে বাংলাদেশের অর্থ পাচারকারী কারা, তাদের কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে সেসব তথ্যসহ অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকারের পদক্ষেপ কী তা জানতে চায় হাইকোর্ট। এছাড়া রুলে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের নাগরিক কিংবা কোম্পানি বা অন্য কোনো সত্তার গচ্ছিত অর্থ উদ্ধারে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ও আইনগত কর্র্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, পানামা পেপার্স ও প্যারাডাইস পেপার্সে যেসব বাংলাদেশি নাগরিক ও কোম্পানির নাম এসেছে তাদের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না সেটি জানতে চেয়েছিল হাইকোর্ট।
এর ধারাবাহিকতায় পানামা ও প্যারাডাইস কেলেঙ্কারিতে উঠে আসা বাংলাদেশি ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা গত রবিবার আদালতে উপস্থাপন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে ১৪ জনের নাম এসেছিল পানামা পেপার্সে। আর ২৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম আসে প্যারাডাইস পেপার্সে। যেখানে আলোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের এবং বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু, তার স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা, তাদের ছেলে তাবিথ আউয়াল, তাফসির আউয়ালের নাম রয়েছে তালিকায়। প্রতিবেদনের ওপর ওইদিন শুনানি শুরু হয়। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম খান।
গতকাল শুনানিকালে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘চার বছর আগে নাম এসেছে তাদের। এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আমাদের কথা হলো কী পদক্ষেপ নিয়েছেন। এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হবে? কাউকে না কাউকে তো কিছু করতে হবে।’ আদালত আরও বলে, ‘মানি লন্ডারিং হোক তা কেউ চায় না। তারপরও হয়ে যাচ্ছে। এত রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই বাংলাদেশ। আমরা কেউ চাই না এখানে দুর্নীতি অর্থ পাচার হোক। তাই এখন বসে থাকার সময় নেই। আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে।’
জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আরও বলেন, ‘দুই-একজন পিয়ন-চাপরাশি ধরলে তো হবে না। বড় বড় দুর্নীতিবাজদের ধরেন।’
দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানামা ও প্যারাডাইসে নাম আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে বিএফআইইউকে ২০১৬ ও চলতি বছর দুটি চিঠি দিয়েছিল দুদক। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। এখন তারা যদি তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ না করে তাহলে দুদক কীভাবে ব্যবস্থা নেবে। আদালতে এ বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম। দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিএফআইইউ কোনো পদক্ষেপ আদৌ নিয়েছে কিনা সেটি আমাদেরকে এবং আদালতকে জানাতে বলেছে হাইকোর্ট।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আমিন উদ্দিন মানিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘এর আগে অর্থ পাচারের আটটি মামলার তথ্য আদালতে দিয়েছি। অর্থ আদায়ে চেষ্টার বিষয়টিও উল্লেখ করেছি। পানাম প্যারাডাইস পেপার্সের বিষয়ে আদালত সুনির্দিষ্টভাবে আজকেই (গতকাল) উল্লেখ করেছেন। দুদক বলছে তারা এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাচ্ছে না। আদালত যেসব বিষয়ে সিআইডি ও বিএফআইইউর কাছে জানতে চেয়েছে সেটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করা হবে।’
