অন্যায় কিংবা ভুল পদ্ধতির সমালোচনা মানুষের হৃদয়ে কখনো কখনো ভয়ংকর ক্ষতের সৃষ্টি করে। নিকটজনের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরায়। মন-মানসিকতা থেকে শান্তি-স্বস্তি দূর করে দেয়। এই যে ভুল পদ্ধতির সমালোচনা, এটা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এরও করা হতো। নবী করিম (সা.)-এর মহান জীবনী থেকে জানা যায়, সমালোচনাকে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব চমৎকারভাবে বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করতেন। শুধু বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণের মধ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকতেন না বরং এই যে অবাঞ্ছিত সমালোচনা, এই সমালোচনা থেকে ইতিবাচক ফলাফলও বের করে আনতেন। নেতিবাচক সমালোচনা থেকে ইতিবাচক ফলাফল অর্জনের ক্ষেত্রে নবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন আমাদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ।
এক দিনের কথা, জায়েদ ইবনে সানা নামক এক ইহুদি ধর্মগুরুর কাছ থেকে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু অর্থ ঋণ নিলেন। সে নবী করিম (সা.)-এর কাছে ঋণ শোধের নির্ধারিত সময়ের তিন দিন আগে এসে ঋণ শোধ করার দাবি জানায়। এমনকি সে তাগাদা দিতে গিয়ে নবী করিম (সা.)-এর কাঁধ বরাবর তার চাদর ও জোব্বা ধরে খুব জোরে টান দিয়ে মন্দভাষায় বলতে থাকে, আল্লাহর কসম! হে বনী আবদুল মুত্তালিব! তোমরা তো এক টালবাহানাকারী গোত্র। আমার আগে থেকেই জানা আছে, তোমাদের এই টালবাহানার স্বভাব! ঋণ নিলে তোমাদের আর কোনো খবর থাকে না! তুমি আমার পাওনা পরিশোধে টালবাহানা করছো।
এ সময় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন হজরত উমর (রা.)। তিনি ইহুদি যাজকের এমন বাজে আচরণ দেখে ভীষণভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে ভর্ৎসনা করে বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমন! তুমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে এমন আচরণ করছো? যিনি তাকে সত্যসহকারে পাঠিয়েছেন, তার কসম খেয়ে বলছি, যদি বেহেশত হারানোর আশঙ্কা না থাকত, আমি তরবারি দিয়ে তোমার গর্দান থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতাম।’
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত উমরের এমন আচরণ ও প্রতিক্রিয়াকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেননি। বরং তিনি হজরত উমর (রা.)-কে বললেন, এই মানুষটি তোমার কাছ থেকে উত্তম আচরণ লাভের যোগ্য। তোমার উচিত ছিল, আমাকে দ্রুত ঋণ পরিশোধের জন্য তাগাদা দেওয়া এবং তাকে তার দাবি নম্রভাবে পেশ করার জন্য বলা। এরপর ঋণদাতার দিকে ফিরলেন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)। বললেন, ঋণ শোধের নির্ধারিত সময়ের এখন পর্যন্ত তিন দিন বাকি আছে। এবার তিনি হজরত উমর (রা.)-এর দিকে ফিরলেন এবং তার পক্ষ থেকে ঋণের অর্থ শোধ করে দিতে বললেন। শুধু কি পাওনা অর্থই পরিশোধ করে দিতে বলেছেন? না, সঙ্গে বলে দিলেন, জায়েদের যা প্রাপ্য, তাকে তার চেয়ে বেশি দিয়ো। বেশি দিতে বলার কারণ হলো, জায়েদ বিন সানার প্রতি তার হুমকির ক্ষতিপূরণ। সুনানে কুবরা বায়হাকি : ১১২৮৪
আমরা জানি, আল্লাহর রাসুল (সা.) কখনো নিজ স্বার্থে কারও থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। কেবল আল্লাহতায়ালার সীমা কোনোভাবে লঙ্ঘন করা হলে তখনই তার থেকে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটত। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো নিজের জন্য প্রতিশোধ নেননি; যে পর্যন্ত না আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুণœ হয়। আল্লাহর সীমালঙ্ঘন হলে তখন তিনি আল্লাহর স্বার্থে প্রতিশোধ নিতেন। সহিহ মুসলিম : ৪২৯৬
বর্ণিত ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ইহুদির অন্যায় আচরণ, তির্যক ভাষায় বংশ নিয়ে সমালোচনা, নির্দয়ভাবে গায়ের কাপড় ধরে টান দেওয়া সত্ত্বেও তিনি ক্রুব্ধ হননি। বরং তার দাবি পূরণে মনোযোগী হয়েছেন। সমালোচনার মোকাবিলায় সীমালঙ্ঘনের আশ্রয় নিলেন না, বরং বাজে সমালোচনা আর রূঢ় ব্যবহারের পরিণামে তিনি তাকে আরও উত্তম আচরণ উপহার দিলেন।
ইহুদি জায়েদ বিন সানা আল্লাহর রাসুলকে একভাবে নয়, নানাভাবে কদর্য, সমালোচনা করেছে। ব্যক্তিগতভাবে যেমন অপমান করেছে, তেমনি বংশের উল্লেখ করেও অপমান করেছে। যখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন নির্দয় সমালোচনা করা হয়, তখন কিন্তু তিনি সহায়-শক্তিহীন দুর্বল ছিলেন না, তিনি ইচ্ছে করলেই তার থেকে কড়ায়-গণ্ডায় এমন অবাঞ্ছিত আচরণের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, তবুও তিনি কিছুই করলেন না। উল্টো আরও এমন উত্তম আচরণ করলেন, যে আচরণে ইহুদি ধর্মপ্রচারক হয়ে গেলেন ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসারী। আল মুজামুল কাবির তাবারানি : ৫১৪৭
আরেকবার জেহাদ থেকে ফিরে এসে মালে গনিমত বিলি-বণ্টনের সময় নও-মুসলিমদের অন্যদের তুলনায় একটু বেশি দিলেন। আল্লাহর রাসুলের এমন বিচক্ষণ বণ্টনের পরও অনেকেই নিজেদের প্রাপ্যের ব্যাপারে অভিযোগ ওঠালেন, করলেন সমালোচনাও। এ বিষয়ে অবগত হওয়ার পরও কারও প্রতি রাগ করেননি, তিরস্কার করেননি। উল্টো তিনি তাদের মুখোমুখি হয়ে ধন্যবাদ দিয়ে তাদের অতিরিক্ত গনিমত দেওয়ার কারণ সবিস্তারে বুঝিয়ে বললেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা শুনে আনসাররা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা সন্তুষ্ট, আমরা পরিতৃপ্ত; আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।
বর্ণিত ঘটনায় তারা একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বণ্টননীতি নিয়ে সমালোচনা করেছে, রহমাতুল্লিল আলামিনের ইনসাফকে সন্দেহ করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। এই যে সমালোচনা, সন্দেহ ও অভিযোগ উত্থাপন এর ফলে তিনি কিন্তু তাদের ভর্ৎসনা করেননি। তাদের সঙ্গে বিনম্র আচরণ করেছেন, নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। অথচ আল্লাহ প্রদত্ত রেসালাতের দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত। তিনি আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন। তিনি রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। সেদিক থেকেও তিনি কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন না।
এভাবেই রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমালোচনার মোকাবিলা করতেন। অন্যায়-অন্যায্য সমালোচনায় তাকে ক্ষতবিক্ষত করা হলেও তিনি ভেঙে পড়তেন না, মুষড়ে যেতেন না। বরং সমালোচককে আরও আপন করে নিতেন। সমালোচনার ফলাফলকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতেন। আমরাও যদি দ্বীন-দুনিয়ার সব কাজে সফল হতে চাই, তাহলে আমাদেরও এভাবে সমালোচনার মোকাবিলা করতে হবে। তবেই মিলবে ইতিবাচক ফল। নয়তো সমালোচনা থেকে শুরু হবে শত্রুতা ও বিদ্বেষ, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
