বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর হয়েছে। হয়তো ৫০ হাজার বইও লেখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন অবস্থান থেকে এসব লিখেছেন। কিন্তু স্মরণে রাখা দরকার, যারাই এসব লিখেছেন তারা সবাই মোটামুটি মধ্যবিত্ত, এলিট বা এককথায় ওপরতলার মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও কিছু ইতিহাসচর্চা হয়, বই লেখা হয় যেমন সেনাবাহিনী। আবার ছাত্রনেতা, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক এরাও লিখেছেন। এভাবে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যা ধারণা তৈরি হয়েছে সেসব তৈরি হয়েছে বই পড়ে, কিংবা এসব বইয়ে উল্লিখিত ধারণাগুলোর প্রচার থেকে। কিন্তু এসব কোনো বইই দুই-তিনশো পৃষ্ঠার বেশি হয় না এবং এসব বই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যারা লিখেন তাদের এবং কিছু পাঠাগারেই থাকে। আমি নিজে গত ৪০-৪৫ বছর ধরে গ্রামে-গঞ্জে, বিভিন্ন স্থানে গিয়ে যা দেখেছি বুঝেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে যে মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের কথা এসব বইয়ে উঠে আসেনি। আবার সাধারণ মানুষের কাছেও লিপিবদ্ধ এসব ইতিহাস পৌঁছায়নি। সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধকে জেনেছে বুঝেছে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে। যে একাত্তর তারা দেখেছে এবং মানুষের স্মৃতিতে ও জনশ্রুতিতে যে একাত্তর আছে সেই একাত্তরকেই তারা ধারণ করে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে যেটা স্পষ্ট হয় তা হলো, দেশে বিদ্যমান একাধিক উপরাষ্ট্রিক চরিত্রের মতোই ইতিহাসের আখ্যানেরও একাধিকতা আছে। অর্থাৎ বড়লোক, গুলশান-বনানীর মানুষ, রাজধানীর মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ, গ্রামের মানুষের বাস্তবতা যেমন এক নয় তেমনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বাস্তবতাও এক নয়। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটগুলোকে সন্নিবেশ করে, ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা ও অংশগ্রহণের চরিত্র সবমিলিয়ে কেন ইতিহাস লেখা হচ্ছে না সেটা সত্যিই চিন্তার বিষয়।
আমার যেটা মনে হয় আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। যে কারণে প্রায়ই আমরা একটা কথা শুনি যে, ‘মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।’ তার মানে ‘ভুল ইতিহাস’ও আছে। তাহলে ভুলটা কীভাবে হয়। কমবেশি ভুল যা হয় বা হয়েছে, সেটা একাত্তর পরবর্তী নানা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বা প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে। আর ‘ভুল ইতিহাস’ নিয়ে যে বিতর্ক সেটা পরবর্তী রাজনৈতিক কারণে। রাজনৈতিক অবস্থান থেকে তৈরি বিতর্কটা কী? যেমন ‘কে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে?’ এখন কথা হলো, ‘কে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে?’ এটা যদি মূল আলোচ্য হয় তাহলে তো যে দীর্ঘ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতা আর মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম এগিয়ে গিয়েছে সেসব আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না, বা সে সবের গুরুত্বকে অস্বীকার করা হয়। এখানে তথ্যের খাতিরে বলে রাখা দরকার ১৭ এপ্রিল যখন মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দেয়, সেখানে বলা হয়েছে যে, ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মতো দাবি করা হয় যে, ‘মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।’ কে কী করেছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না, এসব একটা রাজনৈতিক ঝগড়ায় পরিণত হয়েছে। এসব হচ্ছে কে কোন অবস্থানে গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সবল করতে পারে সেই চেষ্টা। লক্ষণীয় হলো, ঘোষণার রাজনীতি সবাই করে : বিএনপি করেছে, আওয়ামী লীগও করে, বামপন্থিরাও করে। ঘোষণার রাজনীতি ইতিহাসচর্চার বিষয় নয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো দেশের মানুষের কাছে ইতিহাসের চেয়ে ইতিহাসের এসব বিতর্কটাই পৌঁছায়, এসব চিন্তাভাবনাই স্থান পায়। অন্য যে বিষয়টা নিয়ে অনেক কথা হয় সেটা হলো সংখ্যার হিসাব। কতজন শহীদ হয়েছে, কতজন মুক্তিযুদ্ধ করেছে, কতজন রাজাকার হয়েছে এসব বিতর্ক। এসব বিতর্কও কিন্তু রাজনৈতিক কারণেই সামনে এসেছে, জল ঘোলা করা হয়েছে। ফলে আমার মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা আমাদের দেশে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যারা ইতিহাসচর্চা করেন, যারা ইতিহাসের বই লিখছেন তারা কীসের ভিত্তিতে করছেন? সাধারণত নানা দলিলের ভিত্তিতে সেটা করা হয়। সেটা সেনাবাহিনীর দলিলই হোক কিংবা প্রশাসন বা সংবাদপত্রের দলিল বা অন্য কোনো দলিলই হোক। কিন্তু এসব দলিল যখন রচিত হয়েছে সেটা সঠিক কি না তাও যাচাই করা দরকার। বিশেষ করে, যুদ্ধের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এসব দলিল নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়। কারণ যখন তারা এসব রচনা করেছে, যুদ্ধের মাঠ থেকে করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিন্তু যাচাই-বাছাই ছাড়াই যুদ্ধের ইতিহাসের দলিলগুলো সন্নিবেশিত হয়। একই ঘটনা কিন্তু নির্যাতনের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। অনেকেই লিখেছেন এখানে এই হয়েছে, সেখানে ওই হয়েছে। কিন্তু পরে তো সেসব যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে যাচাই-বাছাই করতে হয়। আমার নিজের মাঠে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেও এটা আমি দেখেছি যে, অনেক ক্ষেত্রেই সেটা করা হয়নি বা করা হয় না।
এখন প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় এই সংকটগুলো কেন তৈরি হয়েছে, কেন আমরা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও যথাযথভাবে ইতিহাসচর্চা এগিয়ে নিতে পারলাম না। এর কারণটা হলো, ইতিহাসের জাতীয়তাবাদী ধারা। আমরা খুব স্বল্প পরিসরে ইতিহাস চর্চাটা করি, খুব অল্প তথ্যের ভিত্তিতে চর্চা করি আর সবচেয়ে বড় কথা জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের কথা বাদ দিয়েই সেটা করি। তাই অবধারিতভাবে এই ইতিহাস ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এটা আর থামবে বলে মনে হয় না। এই সেদিনও দেখলাম একজন সম্পাদক বলছেন, আমাদের ইতিহাসের দুটি ধারা, একটা জাতীয়তাবাদী ধারা আরেকটা বামপন্থি ধারা। তিনি বলছেন, শেখ মুজিব জাতীয়তাবাদী ধারার নেতা আর মওলানা ভাসানী বামপন্থি ধারার নেতা। অনেকেই এরকম বলছেন। কিন্তু শেখ মুজিব আর মওলানা ভাসানী যে দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন সেটা আমাদের আলোচনায় আসছে না! এভাবে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান হয়ে যাচ্ছে ভাসানীর আর ৭ই মার্চ হয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর। এই ধরনের চিন্তাভাবনার কারণে আমরা এদেশে একাত্তর পূর্বের রাজনৈতিক বিতর্ককেও টেনে আনছি পরবর্তী সময়ের ইতিহাসে।
প্রশ্ন হলো ইতিহাসচর্চার এই ধরনের সংকটগুলো কাদের সমস্যা? এগুলো এলিটদের সমস্যা, মধ্যবিত্তের সমস্যা। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই ইতিহাসচর্চার কোনো সম্পর্ক নেই। বেশিরভাগ ইতিহাসকারই এগুলো থেকে মুক্ত নন। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেমন এটা করেন, কবি লেখক সাহিত্যিকরা এটা করেন। কিছু কিছু ব্যতিক্রম আছে যারা সাধারণ মানুষের ইতিহাসচর্চা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেসবও বেশিরভাগই আবেগ আর সহানুভূতির জায়গা থেকে। নির্যাতনের মাত্রা কত ভয়াবহ ছিল, মানুষ কত কষ্ট করেছে এমন একটা পরিসর থেকেই তারা সেটা করেন। আমি এখন নিজের যে বইটা সম্পাদনা করছি, বইটার নাম হয়তো হবে ‘বাংলাদেশের একাত্তর’। ছয় সাতশো পৃষ্ঠার একটা বই, একটা আকরগ্রন্থের মতো, যেখানে সবকিছু একসঙ্গে দেওয়ার একটা চেষ্টা করতে চাই। সেখানে আমি দেখতে পাচ্ছি আমাদের গবেষণা দলের সদস্যরাই লিখেছেন, ‘চরম ভয়াবহভাবে’, ‘হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল’, ইত্যাদি শব্দ-বাক্যের ব্যবহার। কিন্তু এগুলো তো ইতিহাসের ভাষা না। দরকারও নেই। ‘আক্রমণ’ করেছে এটাই তো যথেষ্ট।
ইতিহাসচর্চার এসব সমস্যার পাশাপাশি জরুরি বিষয়টা হলো সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের কথা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে না পারার ব্যর্থতা। আমরা কেবল এলিট শ্রেণির ভূমিকাকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কিন্তু এলিট শ্রেণির হাতেই ক্ষমতা থাকায় সেখানে স্বাভাবিকভাবেই দ্বন্দ্ব থাকবে। এ কারণেই ইতিহাসচর্চা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চাও তাই ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এসব কারণেই স্বাধীনতা পরবর্তী ৫০ বছরেও আমাদের দেশের ইতিহাসচর্চার এই সীমাবদ্ধতা রয়েই গেছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে মূলত গ্রামে-গঞ্জে, সাধারণ মানুষের জমি-জিরাত ঘরবাড়িতে, বাজার-ঘাটে। শহরাঞ্চলেও হয়েছে। কিন্তু কোথাও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ইতিহাসটা যথাযথভাবে উঠে আসেনি। একাত্তরে নারীর ভূমিকা উঠে আসেনি। অথচ, নারীরাই ছিল একাত্তরের যুদ্ধে দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধাদের মূল আশ্রয়দাতা, মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী এবং যুদ্ধের জন্য নিজের ও পরিবারের জীবন বিপন্নকারী বড় শক্তি। একাত্তরে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হিন্দু জনগোষ্ঠীর ইতিহাসও একইভাবে অনুপস্থিত রয়ে গেছে। একাত্তরের শরণার্থীদের ইতিহাসও আড়ালেই রয়ে গেছে। অর্থাৎ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় গুরুত্ব পায়নি।
লেখক : ইতিহাসবিদ, শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক
