নিশ্চয় দুনিয়া বিদায়ের কাছাকাছি সময়ে চলে এসেছে। অচিরেই মানুষ এই নশ্বর জগৎ থেকে বিদায় নিয়ে চিরস্থায়ী আবাসে স্থানান্তরিত হবে। কাজেই মানুষের একনিষ্ঠ কর্তব্য হলো, বেশি বেশি উত্তম ও সৎকাজ নিয়ে ইন্তেকাল করা। সত্যিকারের জ্ঞানী তো তারাই, যারা বিচার দিবসকে স্মরণ রাখে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে। কোরআন-হাদিসে বিভিন্ন বর্ণনায় ও বুজুর্গদের আলোচনায় কিয়ামতের ভয়াবহতা ও বিভীষিকাময় অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, চরম উদ্বেগের কারণে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী মা তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে, মানুষ বিভ্রান্তের মতো দিক-বেদিক পালিয়ে বেড়াবে! সেদিন আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা করার কেউ থাকবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর শিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে, ফলে আসমানসমূহে ও জমিনে যারা আছে তারা সবাই বেহুঁশ হয়ে পড়বে, যাদের আল্লাহ ইচ্ছে করেন তারা ছাড়া।’ সুরা আয জুমার : ৬৮
কিয়ামত সম্পর্কে বলা হয়েছে, দুজন ব্যক্তি কেনাবেচার জন্য কাপড় মেলে ধরবে, কিন্তু ‘তা ভাঁজ করা ও লেনদেন শেষ করার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। কেউ তার উটের দুধ দহন করে বাড়ি ফিরে আসবে, কিন্তু ‘তা পান করার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। কেউ নিজের পশুগুলোকে পানি পান করানোর জন্য জলাধার ভর্তি করবে এবং তখনো পানি পান করানো শুরু করবে না তার আগেই কিয়ামত হয়ে যাবে। কেউ খাবার খেতে বসবে এবং এক গ্রাস খাবার মুখ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সুযোগও পাবে না; প্রত্যেকেই যে যেখানে থাকবে সেখানেই মূর্ছা যাবে ও তাৎক্ষণিক মারা যাবে।
হাশরের জন্য সর্বপ্রথম যার কবর খুলে দেওয়া হবে তিনি হলেন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। মানুষজন সেদিন হাশরের জন্য আহ্বানকারী ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে অনুসরণ করবে। জমিন পরিবর্তিত হয়ে অন্য জমিন হবে, সেদিন ময়দার রুটির মতো সাদা পরিষ্কার ও মসৃণ জমিনের বুকে মানবজাতিকে পুনরুত্থিত করা হবে। এতে কারও কোনো চিহ্ন (ঘর, উদ্যান, গাছ, পাহাড়, টিলা ইত্যাদি) থাকবে না। সেদিন সৃষ্টিকর্তার সামনে সব আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে যাবে, চেহারাগুলো অবনত থাকবে এবং সব সৃষ্টিই মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করবে; তখন চলাচলকারীদের পায়ের মৃদু আওয়াজ ও হালকা শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যাবে না।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সব আদম সন্তানকে সেদিন কিয়ামতের ময়দানে একত্রিত করা হবে; সবাই তাদের রবের অভিমুখী থাকবে, তখন আর তাদের কোনো গোপনীয়তাই গোপন থাকবে না। সে দিনটি হবে খুবই ভয়ংকর, দুশ্চিন্তা ও কষ্টের; তারা নিজ নিজ কবর থেকে খাতনাবিহীন, খালি পা ও বস্ত্রহীন অবস্থায় দাঁড়াবে। অপরাধী, পাপাচারীদেরকে ঘিরে ধরবে কঠিন লাঞ্ছনা ও সংকটময় অবস্থা; আল্লাহর নির্দেশে তাদের তা এমনভাবে ছেয়ে ফেলবে যে সব শক্তি ও অনুভূতি এর সামনে অক্ষম হয়ে পড়বে। সেদিন নবী-রাসুল, সিদ্দিক (সত্যনিষ্ঠ) ও সৎকর্মশীলদের বস্ত্র পরিধান করানো হবে। সর্বপ্রথম যাকে বস্ত্র পরিধান করানো হবে তিনি হচ্ছেন হজরত ইবরাহিম খলিল আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
সেদিনটি হবে খুবই ভারী ও দুঃসহ; যা অবলোকন করবে আসমান ও জমিনের ভালো মন্দ সবাই। এমনকি সব ফেরেশতা ও নবী-রাসুলরাও উপস্থিত হবেন। মানুষ, জিন, পাখি ও প্রাণীকুল ইত্যাদি সৃষ্টির সবাইকেই সেদিন উপস্থিত করা হবে। সেদিনের ভয়াবহতায় বাচ্চারা বুড়ো হয়ে যাবে; সেই দিনটিই হচ্ছে: বিচার দিবস। সেদিন কিছু সংখ্যক মানুষ দয়াময় আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবে; তারা সূর্যের তাপ, গরম ও সৃষ্টির নিশ্বাস থেকে নিরাপদ থাকবে। তারা হলেন ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, ২. ওই যুবক যার জীবন গড়ে উঠে তার প্রতিপালকের ইবাদতের মধ্যে, ৩. এমন ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, ৪. ওই দুই ব্যক্তি যারা পরস্পরকে ভালোবাসে আল্লাহর জন্য; একত্র হয় আল্লাহর জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য, ৫. এমন ব্যক্তি যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী পাপাচারের আহ্বান জানায়, কিন্তু ‘সে এই বলে প্রত্যাখ্যান করে, আমি আল্লাহকে ভয় করি, ৬. এমন ব্যক্তি, যে এমন গোপনে দান করে, তার ডান হাত যা খরচ করে তা তার বাম হাত জানে না এবং ৭. এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর জিকির করে, অতঃপর তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে।
সেদিন অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হবে, ব্যাপক ভিড় হবে, প্রচণ্ড গরম, তৃষ্ণা পাবে। তারপর মহান আল্লাহ কিয়ামতের ময়দানে তার নবীর জন্য হাউজে কাউসার উন্মুক্ত করে দেবেন। তারপর আরও কঠিন পরীক্ষা শুরু হবে; মানুষ দীর্ঘক্ষণ যাবৎ দাঁড়িয়ে থাকবে, কিন্তু ‘আল্লাহতায়ালা তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করবেন না। মানুষ অসহনীয় দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতায় জর্জরিত হবে। লোকেরা বলতে থাকবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছো তা কি দেখতে পাচ্ছে না? তোমরা কী এমন কাউকে খুঁজে বের করবে না, যে তোমাদের জন্য তোমাদের রবের কাছে সুপারিশকারী হবে? এমতাবস্থায় মানুষ সুপারিশের জন্য নবী কারিম (সা.)-এর কাছে যাবেন। তিনি আল্লাহর হুকুমে সুপারিশ করবেন, তার শাফায়াত গ্রহণ করা হবে।
তারপর আল্লাহতায়ালা যেভাবে চাইবেন, সেভাবে চূড়ান্ত বিচার করতে আসবেন। ফেরেশতারাও পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবে। আল্লাহতায়ালা যখন চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য সৃষ্টির সবার সামনে জ্যোতি প্রকাশ করবেন, তখন জমিন তার রবের নুরে উদ্ভাসিত ও আলোকিত হয়ে উঠবে। অতঃপর আমলনামা পেশ করা হবে যাতে ছোট ও বড়, সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুই লিপিবদ্ধ থাকবে! ছোট বা বড় কোনো অপরাধ বাদ যাবে না, এমনকি যত তুচ্ছ আমল হোক না কেন তার হিসাব সেখানে লিপিবদ্ধ থাকবে। সব গোপনীয়তা সেদিন প্রকাশ পেয়ে যাবে। বিচারের ভয়ে প্রত্যেক জাতিকে নতজানু হতে দেখা যাবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ বান্দার নিকটবর্তী হবেন এবং তার যাবতীয় অপরাধের স্বীকারোক্তি গ্রহণ করবেন। সেদিন ন্যায়বিচারের পাল্লাগুলো (মিজান) স্থাপন করা হবে এবং ভালো-মন্দ যেকোনো আমল তা শস্যদানা পরিমাণ ওজনের হলেও পরিমাপ করা হবে। এতে কারও পাল্লা ভারী হবে আবার কারওটা হালকা হবে। আল্লাহ তার বান্দাদের সব কৃতকর্মের বিচার করবেন।
যারা যার ইবাদত করত কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সেসবের অনুসরণ করতে বলবেন; তখন যার ইবাদত করত তার পিছু নেবে। জাহান্নামের ওপর সেতু স্থাপন করা হবে। এই পুলসিরাত কেবলমাত্র মুমিনরা অতিক্রম করবে। মুমিনরা যখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতের দরজাসমূহের কাছাকাছি পৌঁছাবে, তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি এক পুলের কাছে তাদের আটকে রাখা হবে। তারপর দুনিয়ায় একের প্রতি অন্যের যা জুলুম ছিল তার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে। অবশেষে যখন তারা একেবারে পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ হয়ে যাবে তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
১৭ ডিসেম্বর মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা।
অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
