নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সংলাপ শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেল ৪টায় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বহু কাক্সিক্ষত এই সংলাপ। বঙ্গভবনে দলের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের নেতৃত্বে সংলাপে অংশ নেয় জাপা। সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা এবং সবার মতামত নিয়ে রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য একটি ইসি গঠনের আশা প্রকাশ করেছেন বলে বঙ্গভবন সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে সংলাপে ইসি গঠনের আগে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নসহ রাষ্ট্রপতির কাছে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে জাপা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্রেস অনুবিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সবার মতামত নিয়ে গ্রহণযোগ্য একটি ইসি গঠনের আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেয়। প্রতিনিধিদলটি বঙ্গভবনে পৌঁছালে তাদের স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি।
আলোচনায় রাষ্ট্রপতি বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হবে। তার আগে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সময় রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন সম্ভব হবে এবং নতুন নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচনসহ সব নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে নতুন ইসি গঠনের আগেই আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাপা। দলটি মনে করে, এখনো যে সময় রয়েছে তার মধ্যেই ইসি গঠনের আইন করা সম্ভব। তা না হলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করে তা করতে পারেন। আর আইন প্রণয়ন না করে গত দুবারের মতো সার্চ কমিটি গঠন করা হলে ওই কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য চারজনের নাম প্রস্তাব করেছে দলটি।
সংলাপ শেষে বেরিয়ে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠক করেছি। আমরা রাষ্ট্রপতিকে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছি। সংবিধানের আলোকে আইন প্রণয়ন করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা বলেছি। আমরা মনে করি, যে সময় আছে তার মধ্যে আইন তৈরি করা সম্ভব। সরকার চাইলে আমরা আইনটিও তৈরি করে দিতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যদি মনে করে এখন আইন করা সম্ভব নয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করে করতে পারেন। পরবর্তী সময়ে সেটি আইনে পরিণত করা যাবে। আর যদি অধ্যাদেশ জারি করা সম্ভব না হয়, তাহলে আগের মতো সার্চ কমিটি গঠন করা হলে আমরা চারজনের নামের প্রস্তাব দিয়েছি। তবে এখনই আমার দেওয়া নামগুলো আপনাদের জানাচ্ছি না।’
জাপা নেতারা জানিয়েছেন, সার্চ কমিটির জন্য চারজনের নামের প্রস্তাবের বাইরে জাপা আরও একজনের নাম নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে প্রস্তাব করেছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে জাপার প্রস্তাব : রাষ্ট্রপতির কাছে জাপার দেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানে আইনের দ্বারা নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও অদ্যাবধি নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে কোনো আইন প্রণীত হয়নি। আমরা মনে করি, আগামীতে যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে তার জন্য উপরিউক্ত সংবিধানের বিধান অনুসরণে একটি আইন করা দরকার। আইনের উদ্দেশ্য হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশন গঠন এবং সেই অনুযায়ী যোগ্য, মোটামুটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার বাছাই করার মাপকাঠি এবং পন্থা সুনির্দিষ্ট করা।’
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ‘সংবিধানের সপ্তম ভাগে নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ অনুচ্ছেদে বলা আছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্র্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে। কীভাবে এটি প্রযোজ্য হবে বা কার্যকর করা যাবে তার বিস্তারিত বর্ণনা থাকা আবশ্যক। সে কারণে এ বিষয়ে একটি আইন থাকা প্রয়োজন। যে আইনে সহায়তা না করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং কী ধরনের শাস্তি হবে তা সুস্পষ্টভাবে বলা থাকবে।’
এতে বলা হয়, ‘সময় স্বল্পতার কারণে যদি সংসদে আইন প্রণয়ন করা সম্ভব না হয়, তাহলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে আইনগুলো বলবৎ করতে পারেন। যদি কোনো কারণে অধ্যাদেশ জারি সম্ভব না হয় এবং আগের মতো সার্চ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে সার্চ কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য জাপার পক্ষ থেকে চার-পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।’
ইসি গঠন নিয়ে মতামত জানাতে প্রথম দল হিসেবে বঙ্গভবনে যায় জাপার প্রতিনিধিদল। দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাপার আট সদস্যের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা হলেন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশিদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, কো-চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম এবং সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা।
আরও ৮ দলের সঙ্গে সংলাপের দিনক্ষণ চূড়ান্ত : ইসি পুনর্গঠনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনার জন্য আরও ৮টি রাজনৈতিক দলের সংলাপের জন্য দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন বলেন, আরও ৮টি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের ঠিকানায় সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামীকাল বুধবার বিকেল ৪টায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), রবিবার বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবে। সোমবার (২৭ ডিসেম্বর) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও সন্ধ্যা ৬টায় খেলাফত মজলিস, পরদিন মঙ্গলবার (২৮ ডিসেম্বর) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, ২৯ ডিসেম্বর (বুধবার) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ও সন্ধ্যা ৬টায় ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
