‘বিজু’ না রাজনীতি কী কারণে বিয়ে করেননি জয়নাল হাজারী: আলোচনা ফেসবুকে

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০৫:৪৭ পিএম

জয়নাল আবদীন হাজারী দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আওয়ামী লীগ নেতা। ফেনী জেলায় তার কথাই ছিল আইন। তার আঙ্গুলি হেলনে চলত ফেনীর রাজনীতি, জীবনযাত্রা। গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হতেন প্রায়ই, যার বেশির ভাগ ছিল নেতিবাচক সংবাদ। ফলে সারা দেশে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ‘ফেনীর গডফাদার’ নামে।

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তিনি রয়ে যান চিরকুমার। প্রেমিকার ওপর অভিমান করে করেননি সংসার। প্রেমিকার বিচারও চেয়েছিলেন জনসমক্ষে। কঠোর জয়নাল হাজারীর প্রেমিক চরিত্রকেও স্মরণ করছেন মানুষ।

একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনে প্রকাশ হওয়া টকশো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিউজফিডে বারংবার আসছে। যেটিতে হাজারী কথা বলেছিলেন তার প্রেমিকা বিজুকে নিয়ে। হাজারী বলেছেন, বিজু ওয়াদা করেছিল কোনো দিন বিয়ে করবে না তাকে ছাড়া, কিন্তু বিজু বিয়ে করেছেন। ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। এ কারণে বিজুর বিচার চাই।

গতকাল মঙ্গলবার ফেনী শহরের মাস্টার পাড়ায় জয়নাল হাজারীর বাড়ি শৌল কুঠিরে গিয়ে কথা হয় তার ভাগনে শাখাওয়াত হোসেন মন্টু ও আনোয়ার হোসেন শিমুর সঙ্গে।

তারা বলেছেন, তাদের মামা রাজনীতির জন্যই বিয়ে করেননি। তাদের মা একাধিকবার ভাইকে বিয়ের কথা বলেছেন। তখন জয়নাল হাজারী বলত রাজনীতি করছি বিয়ের সময় কোথায় পাব। রাজনীতির কারণে বিয়ে করা হবে না। ইসলামে বিয়ে ফরজ সে জন্য বিয়ে করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি।

বিয়ে না করার পেছনে ‘বিজু’ নামের চরিত্রটির সঙ্গে এই রাজনীতিকের সম্পর্ক ও বিচ্ছেদের কাহিনি অনেকবারই সামনে এসেছে। নিজের লেখা ‘বিজুর বিচার চাই’ নামের বইতেও ওই নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের নানা মুহূর্ত উঠে আসে। এক সময় বইটি ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল।

কিন্তু কেন তার এই একলা যাপন? কেনই-বা কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেননি? সদ্য মারা যাওয়া জয়নাল হাজারীর অবিবাহিত জীবন নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে জনমানুষের মধ্যে কৌতূহলে কখনোই ভাটা পড়েনি। তিনি নিজেও গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে একাধিকবারই ব্যক্তিগত জীবনের বাহাস শুনিয়েছেন। তবে চিরকুমার জয়নাল হাজারী কখনোই অবিবাহিত জীবনকে কোনো ‘গ্যাপ বা শূন্যতা’ হিসেবে স্বীকার করেননি।

বিয়ে না করা প্রসঙ্গে কয়েক বছর আগেই জয়নাল হাজারী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এটা আমার রাজনৈতিক জীবনে কোনো ‘গ্যাপ’ নয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যদি বলি- অনেক বাম রাজনীতিক যারা কমিউনিস্ট বা কংগ্রেস পার্টি করতেন তারা বিয়ে করেননি। আর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যদি দেখি পৃথিবীর অনেক দার্শনিক, বিজ্ঞানীও বিয়ে করেননি, বিয়ে নিয়ে চিন্তাও করেননি। বিয়ে হলো, কি হলো না, চিরকুমার থাকলাম, কি থাকলাম না- এটি রাজনীতির কোনো বাধাও নয়, পরিপূরকও নয়।

তার ভাষ্য ছিল এ রকম- আমার যখন বিয়ের বয়স তখন আমি সেই ৬৯, ৭০, ৭১- সালের উত্তাল সময়ে ছিলাম। তখন প্রেম, বিজু ও বিয়ে নিয়ে চিন্তা করার সময় ছিল না। এরপর মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে ছয় মাসের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাই। আসলে আমার জীবনটা সব সময় বিপদসংকুল ছিল। ফলে বিয়েটা আর করা হয়নি।

গত জুলাই মাসের শুরুতে চিত্রনায়িকা পরীমণি প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মন্তব্য করে নতুন করে আলোচনায় আসেন জয়নাল হাজারী। ঢাকার সাভারের বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পরীমণির মামলা দায়েরের পর গত ২ জুলাই সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে জয়নাল হাজারী এ ঘটনার জন্য নায়িকাকেই দায়ী করেন। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এক তরুণীকে প্রকাশ্যে নিপীড়নকারী যুবকদের পক্ষ নিয়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। লিখেছেন-‘বাধনের বিচার চাই’ নামে বই।

২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১৬ আগস্ট রাতে তার বাড়িতে অভিযান চালায় যৌথবাহিনী। তিনি তখন পালিয়ে ভারতে চলে যান। ২০০৪ সালে হাজারীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে তিনি ভারত থেকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে করা একে একে সব মামলা থেকে অব্যাহতি পান প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ।

সোমবার বিকেল ৫টায় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। ব্যক্তিজীবনে জয়নাল হাজারী চিরকুমার ছিলেন।

১৯৪৫ সালের ২৪ আগস্ট ফেনী শহরের সহদেবপুর নিবাসী হাবিবুল্লাহ পণ্ডিতের বাড়িতে আব্দুল গণি হাজারী ও রিজিয়া বেগমের সংসারে জন্ম হয় জয়নাল আবেদীন হাজারীর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত