হাইকোর্টে করা রিট মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই নির্মাণাধীন সরকারি একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২০৫ বিঘা জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে পাবনার এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। তিনি হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ ও রুলের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এবং এগুলোকে রায় হিসেবে দাবি করে লোকজনকে বিভ্রান্ত করছেন। এমনকি মাইকিং করে সমাবেশ করেছেন তিনি। আরশাদ আলী সরদার নামে এই বিএনপি নেতা দলের পাবনার সুজানগরের সাগরকান্দি ইউনিয়ন শাখার সাবেক সভাপতি।
সাগরকান্দি ইউনিয়নের চররামকান্তপুর এলাকায় ৬৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল)।
আইনজীবীরা বলছেন, উচ্চ আদালতের কোনো রায়, আদেশ ও রুলের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের অপচেষ্টা আদালত অবমাননার শামিল। যে ব্যক্তি এ ধরনের অপচেষ্টা করেন তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা যায়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, পাবনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জমিটি বন্দোবস্তের পর এখানে এখন সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায় রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ আগামী মার্চ থেকে শুরু হবে। এখানে চীনা এক্সিম ব্যাংক প্রায় সাড়ে ৭শ’ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে।
পাবনার জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পাবনার সুজানগর উপজেলার আমিনপুর থানার চররামকান্তপুর মৌজায় দিয়ারা জরিপ করে জরিপ অধিদপ্তর। এরপর সেই জমি এক নম্বর খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়। সেখান থেকে ২০৫ একর জমি সরকারি প্রতিষ্ঠান নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশনকে দীর্ঘ মেয়াদি বন্দোবস্ত দেয় সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়। দিয়ারা জরিপ যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি এমন অভিযোগ এনে পাবনা জেলাপ্রশাসকের কাছে ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর একটি আবেদন করেন বিএনপি নেতা আরশাদ আলী সরদার।
জেলা প্রশাসকের কাছে করা আবেদনে আরশাদ আলী দাবি করেন, দিয়ারা জরিপ প্রক্রিয়া আইন সংগতভাবে হয়নি। এই জরিপ পুনরায় করার আবেদন জানান তিনি। জেলা প্রশাসক তার বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ আছে কি না তা দেখাতে বলেন। কিন্তু আরশাদ আলি কোনো ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। জেলা প্রশাসক এ ধরনের আবেদন করে সময়ক্ষেপণ না করানোর জন্য তাকে অনুরোধ করেন।
এরপর ২০১৯ সালেই জেলা প্রশাসক আবেদনটি নিষ্পত্তি করেননি এমন দাবি জানিয়ে আরশাদ আলী উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। গত বছরের ১১ নভেম্বর বিচারপতি এম. এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে একটি রুল ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করেন। আরশাদ আলী সরদারের আবেদনের শুনানি না করা কেন অবৈধ হবে না চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে পাবনা জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে পাবনা জেলা প্রশাসককে দিয়ারা জরিপসংক্রান্ত আরশাদ আলী সরদারের আবেদনের শুনানি করে তা নিষ্পত্তি করার আদেশ দেওয়া হয়।
আদালত এই আদেশ দেওয়ার পর আরশাদ আলী গত ১৯ ডিসেম্বর এলাকায় এসে মাইকিং করে প্রচার করেন এই চরের জমি উচ্চ আদালত থেকে তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপরের দিন ২০ ডিসেম্বর চররামকান্তপুর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভেতর স্থানীয় মানুষদের নিয়ে একটি সমাবেশ করেন। এ সময় তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের দখলে থাকা সব জমি দখল করে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, সরকারের কোনো বিধান নেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি ইজারা দেওয়ার। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থানীয় কর্মীদের চাকরি ছেড়ে এলাকা থেকে চলে না গেলে হত্যা করারও হুমকি দিয়েছেন এই বিএনপি নেতা। এ দিন আরশাদ আলী বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা রক্ষীদের মারধর করেন। স্থানীয় গ্রামবাসীদের খেপিয়ে তুলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা দেয়ালের একটি অংশ ভেঙে ফেলেন। এ ঘটনার পরের দিন সুজানগর উপজেলার আমিনপুর থানায় বেআইনি সমাবেশ ও ভাঙচুর করার অভিযোগে আরশাদ আলীসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সালাম পরামানিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমাবেশে আরশাদ আলী বলেছেন আদালত তাদের এই জমি দিয়ে দিয়েছে। সবাই এই জমি দখল করে নাও। তবে জমি দখল করার আগে উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য পাঁচ লাখ টাকা খরচ হিসেবে সকলকে ভাগ করে দিতে বলেন আরশাদ।
আদালতের আদেশের ভুল ব্যাখ্যা কেন দিচ্ছেন জানতে চাইলে আরশাদ আলী সরদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খাসজমি আমাদের না দিয়ে সরকারের বন্দোবস্ত দেওয়ার কোনো বিধান নেই। সরকার এভাবে জমি নেওয়ার কোনো আইন নেই। যা বলার আমরা আদালতকে বলব।’
পাবনার জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাগরকান্দি ইউনিয়নের ১২টি মৌজার ৯৫ ভাগই সরকারি খাসজমি। মূলত পদ্মা থেকে জেগে ওঠা এসব চরে কোনো দিনই ভূমি জরিপ হয়নি। এসব চরে কয়েক হাজার একর খাসজমি রয়েছে। যা স্থানীয় এক শ্রেণির প্রভাবশালী দীর্ঘদিন দখল করে রেখেছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী জানিয়েছেন, আরশাদ আলী সরদারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে চর কেষ্টপুর মৌজা। এখানে ৭শ’ একর খাসজমি দখল রেখেছেন তিনি। স্থানীয় লোকজন বলছে, আরশাদ আলী জমিদারি আমলের কিছু ভুয়া কাগজ তৈরি করে চরটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। শুধু এই চরের নয় চররামকান্তপুর মৌজারও ভুয়া কাগজ তৈরি করেছেন এই স্থানীয় ভূমিদস্যু।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাবনার জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেন বলেন, ‘আমরা যথাযথ আইন মেনেই খাসজমি বন্দোবস্ত দিয়েছি। আদালতের আদেশের কপি আমাদের কাছে এসেছে আমরা এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
আমিনপুর থানার রেকর্ডপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, আরশাদ আলীর বিরুদ্ধে ১০টির বেশি মামলা রয়েছে। অধিকাংশ মামলাই অস্ত্র, বিস্ফোরক আইনে ও বেআইনিভাবে অন্যের জমি দখলের অভিযোগে করা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালতের আদেশকে কেউ যদি ভুল বা উল্টো ব্যাখ্যা দেয় সেটা তো আদালতের আদেশের প্রতি অসম্মান করা। যে ব্যক্তি এই ধরনের কাজ করবে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা যাবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কেউ চাইলে লিখিতভাবে এটি আদালতের নজরে আনতে পারে।’
হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্ট শুধু একটি রুল দিয়েছে। ওই জমি তো তাকে বন্দোবস্ত দেয়নি। এখন কেউ যদি রুলকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আদেশ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন সেটা তো আদালত অবমাননার শামিল। এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা যেতে পারে।’
