ঐতিহ্য হারাচ্ছে সন্ধ্যা নদীর ভাসমান চালের হাট

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২২, ০১:২২ এএম

সন্ধ্যা নদীর বুকজুড়ে ছই ছাড়া ছোট ছোট নৌকা সারবাঁধা। নৌকার খোলে বড় আকারের সাজিভর্তি চাল। নৌকার আরোহীরা শীতের সকালের মিঠেকড়া রোদ সামলাতে কেউ মাথায় ছাতা, কেউবা গামছা বেঁধে বসে আছেন। কেউ দরদাম হাঁকছেন। কেউ লগিতে ভর দিয়ে নৌকা নিয়ে যাচ্ছেন পাইকারের বড় নৌকার কাছে। অসংখ্য নৌকার আগমনে সন্ধ্যার বুকজুড়ে মৃদু দোলা। দুলছে কুটিয়ালদের নৌকাগুলোও।

বরিশালের বানারীপাড়ার উপজেলার পাশের গ্রামগুলো থেকে গৃহস্থ ও কুটিয়ালরা এসব নৌকায় করে চাল নিয়ে বাজারে এসেছেন বিক্রির জন্য। বাজার বলতে স্থলবাজার নয়। নদীর বুকে ভাসমান বাজার। এই চাল কেনার জন্য ইঞ্জিনচালিত বড় বড় নৌকা নিয়ে এসেছেন পাইকাররাও। অসংখ্য নৌকা আর ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে খুব ভোর থেকেই জমজমাট হয়ে ওঠে এই ভাসমান চালের বাজার। তা অব্যাহত থাকে দুপুর অবধি। সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার বসে এই হাট।

তবে সন্ধ্যা নদীর ঐতিহ্যবাহী এ ধান-চালের ভাসমান হাটটি জৌলুস হারিয়ে ফেলছে। নানা সীমাবদ্ধতা ও ধান-চালের ব্যবসা অন্যত্র স্থানান্তর হওয়ায় এ হাট কালের পরিক্রমায় এখন বন্ধের পথে। বরিশালের বালাম চালের যে সুখ্যাতি ছিল, তার বড় মোকামই ছিল বানারীপাড়ার এ ভাসমান হাট। সেই বালাম চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হতো বানারীপাড়ায়। ইতিমধ্যে বিলুপ্তির পথে সে বালাম চাল। আর এরই সঙ্গে এ ভাসমান হাটের সুনাম-সুখ্যাতিতেও ভাটা পড়েছে। হাটের পরিধি সংকুচিত হয়েছে। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ী, কৃষক ও কুটিয়ালরা ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন এ হাট থেকে।

স্থানীয় লোকজন ও কৃষি বিভাগ জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র ভাসমান এ চালের বাজারটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বরিশালের ইতিহাস ঐতিহ্য। প্রায় ২০০ বছর ধরে এ বাজার চলে আসছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা আসত বরিশালের বালাম ও অন্যান্য সুস্বাদু চাল সংগ্রহ করতে। কিন্তু এখন বালাম চাল ইতিহাসের অংশ। বানারীপাড়ার বাইশারি গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, এখন আর এখানে বালাম চাল পাওয়া যায় না। স্থানীয় ও ব্রি জাতের ধানের চাল পাওয়া যায়। তবে এটা গৃহস্থি হওয়ায় চালের গুণগত মান বজায় থাকে বলে ক্রেতাদের কাছে এখনো এই চালের কদর রয়েছে।

মকবুল মিয়া নামে আরেক চাল বিক্রেতা বলেন, চাল নিয়ে বাজারে আসার জন্য আমাদের রাতে প্রস্তুতি নিতে হয়, এতে পরিবারের নারী সদস্যরাও আমাদের সহায়তা করেন। হাটের আগের দিন রাত জেগে প্রস্তুতি নিই। তারপর শেষ রাতে বাজারের উদ্দেশে রওনা দিই।

সুরুজ মোল্লা নামে আরেক কৃষক বলেন, দুপুরের আগেই সব চাল বিক্রি হয়ে যায়। নৌকায় মালপত্র সহজে, বিনা ব্যয়ে পরিবহন করা যায় বলে এ পেশায় এখনো টিকে আছি। তবে অতীতের মতো তেমন লাভ হয় না। আধুনিক চালকল ভাসমান বাজারের জন্য হুমকি হয়ে গেছে।

কুটিয়ালরা জানান, এই হাটে প্রতি মণ আউশ চাল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। প্রতি হাটে এখনো কয়েকশ মণ চাল বিক্রি হয়।

ভাসমান এ হাটকে বাঁচিয়ে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত