জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্য নিয়েই কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের এটাই আজকে লক্ষ্য, যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি (বঙ্গবন্ধু) বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা। আজকের দিনে সেই প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।’
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে গতকাল সোমবার ‘মুক্ত স্বদেশে জাতির পিতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্যে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে তিনি যুক্ত হন।
দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুর ভাষণটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই ভাষণটা ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা। এই ভাষণটা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামো কী রকম হবে, স্বাধীন রাষ্ট্র কীভাবে চলবে, স্বাধীন রাষ্ট্র কীভাবে, কোন আদর্শে চলবে, সেই আদর্শই তিনি এই ভাষণে দিয়েছিলেন। একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা জাতির পিতার সেই ভাষণে ছিল।’
পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি থাকা অবস্থায় যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, তখনো যে তিনি নির্ভয় ছিলেন, সে কথাও বলেন সরকারপ্রধান। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) ভাষণে এটাও বলেছিলেন, যখন তাকে ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ হয়, একটি দাবি তিনি শুধু করেছিলেন যে আমাকে তোমরা মেরে ফেলতে পারো, কিন্তু আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে পৌঁছে দিয়ো। আমার বাংলার মাটিতে পৌঁছে দিয়ো। পাকিস্তানের কারাগারে তার ওপর নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছিল, যা কেউ কখনো জানতে পারেনি। জাতির পিতা মৃত্যুকে কখনো ভয় করেননি, জয় করেছিলেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) প্রিয় স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন। ফিরে আসাটা আমাদের জন্য যে কত প্রয়োজনীয় ছিলৃকারণ এই বাংলাদেশ তিনি স্বাধীন করেছিলেন, তার যেই স্বপ্ন বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলবেন।’
সেই স্বপ্ন পূরণে যে যাত্রা বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের সেই অগ্রযাত্রাই ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এই আঘাতটা শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা না। এই আঘাতটা ছিল একটা স্বাধীন দেশের আদর্শকে হত্যা করা, চেতনাকে হত্যা করা। সেটাই আপনারা দেখতে পাবেন। ১৫ আগস্টের পর থেকে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা এভাবেই রাষ্ট্রটা চালিয়েছিল। সেখানে ১৫ আগস্টের খুনি, স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী, তারাই ক্ষমতায় বসেছিল। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো চেষ্টা তারা করেনি।’ আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রাখায় দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের শহীদ মনিরুল আলম মিলনায়তন প্রান্তে থেকে এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহিউদ্দিন আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জাতির পিতার স্বদেশে ফিরে আসার ওপর একটি ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানার তার বাবাকে নিয়ে লেখা ‘বাবা’ এবং মাকে নিয়ে লেখা ‘রেণু আমার মা’ কবিতা দুটি অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করে শোনান বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর।
এদিকে গতকাল নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত হয়েছে। সকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ছোট বোন ও জাতির পিতার ছোট মেয়ে শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সকালে ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে রক্ষিত তার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে ২৯০ দিন বন্দি থাকার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে ফিরে আসেন। এর পর থেকে জাতি প্রতি বছর দিনটিকে জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। পরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সিনিয়র নেতারা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম; সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক; প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সবুর, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এ বি এম রিয়াজুল কবির কাওছার ও আনোয়ার হোসেন।
এ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীনতা পূর্ণতা পেয়েছিল। মুজিববিহীন বাংলায় বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর এই বাংলাদেশ তার সার্থকতা নিয়ে আসবে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৫০ বছর পূর্তিতে বঙ্গবন্ধুর পবিত্র আত্মা নিশ্চয়ই শান্তি পাচ্ছে যে আজ তার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের পথে বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে, খাদ্যে উদ্বৃত্তের দেশে উন্নীত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পৃথিবীর সামনে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে গতকাল বিকেলে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সীমিত পরিসরে আওয়ামী লীগ আলোচনা সভার আয়োজন করে। আলোচনা সভায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। গতকাল বেলা ১১টা ২০ মিনিটে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান এমপির নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধের বেদিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি ও আফজাল হোসেন, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া প্রমুখ।
