বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগের অভিযোগ ওঠায় এ বিষয়ে তদন্তসহ সরকারের বিবৃতি দাবি করেছে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এই দাবি জানান।
চুন্নুর পর বিএনপির সদস্য হারুনুর রশীদও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেন। এ সময় পররাষ্টমন্ত্রী সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, বিএনপি গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্টের পেছনে ৩২ কোটি টাকা খরচ করেছে। কী কারণে বিএনপি এই লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছিল, এটা কী দেশের জনগণের স্বার্থে, রাষ্ট্রের স্বার্থে, নাকি জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধেএ বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিএনপির একজন নেতা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন ক্ষমতাসীন দল ২০১৪ সাল থেকে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। এই লবিস্ট নিয়োগের পেছনে ক্ষমতাসীন দল ৩ লাখ ২০ হাজার ডলার বা ৩০ কোটি টাকা প্রতি বছর খরচ করে আসছে। ক্ষমতাসীন দল আসলে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল কি না, করলে কী কারণে করেছে, এই টাকা কী সরকারি কোষাগার থেকে গেছে, নাকি দলের নিজস্ব উৎস থেকে গেছে দেশের মানুষ এবং আমরাও জানতে চাই। বিএনপি লবিস্ট নিয়োগের টাকা কোথায় পেল? আওয়ামী লীগও লবিস্ট নিয়োগ করেছিল কি না, করলে তার ফান্ড কোথা থেকে পেল? এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ সংস্থার তদন্ত বা সরকারের বিবৃতি দাবি করি। দেশের মানুষকে এটা জানাতে হবে।
পরে বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, উদ্বেগের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে চাই কোনো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে অনুমান নির্ভর বক্তব্য দেওয়া সমীচীন নয়। সংসদের গত বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তারপর দেখলাম পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন র্যাব তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। তার মানে কি র্যাব সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের? এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে সুস্পষ্ট বিবৃতি চাই। অনুমাননির্ভর বক্তব্য দেওয়া ঠিক নয়। ১২টি আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘকে নোটিস করেছে র্যাবকে শান্তিরক্ষা মিশনে না নিতে। যুক্তরাষ্ট্র যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সেটার কী অবস্থা? এসবকে কেন্দ্র করেই তো লবিস্ট। আমি বলব পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের করে দিয়েছেন। এসব নিয়ে আগামী দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদে বিবৃতি চাই। যদি আপনি বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন, আমরা ধরে নেব সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ধরনের বিবৃতি দিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন।
জনগণের করের কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকার দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম পুষছে বলে সংসদে জানিয়েছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি বলেন, একটি ফার্ম বিজিআরকে গত বছর সরকার ত্রৈমাসিক ৮০ হাজার ডলার করে দিয়েছে, বছরে যার পরিমাণ ৩ লাখ ২০ হাজার ডলার (আনুমানিক ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা)। বিজিআর ছাড়াও গত বছর সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিডল্যান্ডার গ্রুপের সঙ্গে ৪০ হাজার ডলারে একটি চুক্তি করে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম। এ ছাড়া কোনওয়াগো কনসালটিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার এক মাসের জন্য আরেকটি চুক্তি করে। ৩৫ হাজার ডলার অগ্রিম দেওয়ার শর্তে চুক্তিটি হয়, যাতে সই করেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। রুমিন আরও দাবি করেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ অ্যালক্যাড অ্যান্ড ফে নামের লবিং প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে ১২ লাখ ডলারের (১০ কোটি টাকার বেশি) বেশি দিয়েছে। রুমিন ফারহানা বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আর সব মন্ত্রী প্রথমে খুব কড়া ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করলেও এখন গলার স্বর নিচু। এখন নিজেদের সমস্যা খতিয়ে দেখার আলাপ হচ্ছে। প্রয়োজনে লবিস্ট, ল ফার্ম নিয়োগের কথা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ কোনো নতুন বিষয় নয়। জনগণের করের কোটি কোটি টাকা খরচ করে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম পুষছে সরকার।
এ সময় তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর এক মজার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এখন আর র্যাব গভীর রাতে সন্ত্রাসীদের নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যাচ্ছে না কিংবা গোপন সংবাদ পেয়ে কোনো সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে আগে থেকে ওতপেতে থাকা সন্ত্রাসীরা পুলিশ বা র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে না। আর তারপর পালানোর সময় মারা যাচ্ছে না কোনো নির্দিষ্ট মানুষ। ঠিক যেমন সন্ত্রাসীরা সাধু হয়ে গিয়ে র্যাবকে গুলি করা বন্ধ করেছিল সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদকে হত্যার পরপর।
