পিছিয়ে পড়া নেতাদের গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২২, ০১:৪৯ এএম

নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। এ অবস্থায় দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, দেশে অতীতে যে কয়টি সফল আন্দোলন হয়েছে তার নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র-যুবকরা। তেমনি আগামীর আন্দোলনেও দেশের ছাত্র-যুবকরাই নেতৃত্ব দিক। এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দসহ বিভিন্ন কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়া নেতাদের দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি সাহসী নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলন সফল করতে যুবকরাই এগিয়ে আসবে। এ জন্য আমরা সারা দেশে যুবকদের সংগঠিত করছি। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে যারা দলের বাইরে আছেন তাদের দলে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের জনগণ আজ ভোটাধিকার, মানবাধিকারসহ সংবিধান স্বীকৃত সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। এ অবস্থায় জনগণ তাদের সব ধরনের অধিকার ফিরে পেতে বিএনপির দিকে তাকিয়ে আছে। বর্তমানে আমরা যে আন্দোলনে আছি তা সফল করতে বদ্ধপরিকর।’  

গত ২৫ জানুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বেনজীর আহমেদ টিটুকে দলের ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। দীর্ঘ ২০ বছর পর তাকে দলে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

এ বিষয়ে গতকাল টিটু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকমান্ড আমার দিকে তাকিয়েছে। এ জন্য আমি খুবই কৃতজ্ঞ। আমাকে মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে, দলের প্রতি কমিটেড থাকলে এবং ধৈর্য ধরে থাকতে পারলে দল কোনো না কোনো সময় মূল্যায়ন করে। আমার মতো যারা দীর্ঘদিন দলের বাইরে আছেন তাদের জন্য এটি একটি মেসেজ।’ তিনি বলেন, ‘রাজনীতি একদিনের জন্য নয়। এটি একশ মিটার দৌড় নয়। এটি ম্যারাথন দৌড়। খুব দ্রুত কিছু পেলে তা আবার খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। ধরে রাখা যায় না।’

গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অব্যাহতি দিয়ে অনিন্দ ইসলাম অমিতকে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে তিনি সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার দাবিতে প্রথম দফায় যে কয়টি জেলায় সমাবেশের ডাক দেওয়া হয় তার মধ্যে ছিল যশোর। কিন্তু জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সে সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ায় অমিত দলের দুই হাজারের বেশি নেতাকর্মী নিয়ে সকাল পৌনে ৮টায় শহরে ঝটিকা মিছিল করে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে মাঠ দখল করেন। দুপুর ২টায় অনুষ্ঠেয় সমাবেশের এই ময়দান সকাল ৯টার মধ্যেই জনতার দখলে চলে যায় এবং শুরু হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশের কার্যক্রম। তার সাহসী ভূমিকা দলে প্রশংসিত হয় এবং অন্যান্য জেলা নেতারা তার পদক্ষেপ অনুসরণ করতে শুরু করেন।

অমিতকে মূল্যায়নের বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে যারা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন তাদের ফ্রন্টলাইনে তুলে আনার দায়িত্ব আমাদের। পাশাপাশি অতীতে আন্দোলন সংগ্রামে যারা সাফল্য দেখিয়েছেন, কিন্তু দল মূল্যায়ন করতে পারেনি তাদের এখন সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে।’

বেনজীর আহমেদ টিটুকে মূল্যায়ন করার পর আশার আলো দেখছেন বিএনপিতে পিছিয়ে পড়া অনেকেই। এর মধ্যে রয়েছেন যুবদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জাকির হোসেন সিদ্দিকী। বিগত দিনে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি যে ভূমিকা রেখেছিলেন সেভাবে তাকে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে মনে করেন অনেকে। আগামীতে যুবদলের যে কমিটি হবে সে কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে আশা করছেন সাবেক ছাত্রদল নেতাদের অনেকে।

এ বিষয়ে জাকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দলের নিবেদিত কর্মী। দল যেখানে আমাকে যোগ্য মনে করবে সেখানে পদায়ন করবে। আমি অতীতের মতোই সাধ্যমতো চেষ্টা করব সরকারবিরোধী আন্দোলন সফল করতে।’  

দীর্ঘদিন কোনো পদে নেই সাবেক ছাত্রদল নেতা সাঈদ ইকবাল মাহমুদ। সর্বশেষ ২০০৪ সালে সাহাবুদ্দিন লাল্টু ও আজিজুল বারী হেলাল কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন তিনি। এরপর দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই।

গতকাল সাঈদ ইকবাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সব সময় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল ছিলাম। বিএনপির হাইকমান্ড সাবেক নেতাদের যেভাবে মূল্যায়ন করছেন তাতে আমি নিজেও আশার আলো দেখছি। দেশ ও দলের এই ক্রান্তিলগ্নে আমি কাজ করার কথা ভাবতে শুরু করেছি।’

২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাজিব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল সে কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন ইসহাক সরকার। এরপর আর কোনো পদ পাননি তিনি। এরপর ২০১৮ সালের ১০ জুলাই রাজধানীর বনানী থেকে গ্রেপ্তার হন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। ৩৮ মাস পর জামিনে মুক্তি পান। তার বিরুদ্ধে ৩১৩টি মামলা রয়েছে।

গতকাল দেশ রূপান্তরকে ইসহাক সরকার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পদ নেই আমার। পদ না থাকলেও দলের জন্য কাজ করছি। দীর্ঘদিন পর বেনজীর আহমেদ টিটু ভাইকে মূল্যায়নের পর আমি আশাবাদী হয়ে উঠেছি।’

তরুণ নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধ ও সর্বশেষ ’৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে সফলতা এনেছিলেন ছাত্র-যুবকরা। ’৯০-এর গণআন্দোলনের সময় আমরা যুবক ছিলাম। সে সময় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে নিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম করে সফল হয়েছি। তেমনি আগামী দিনে আন্দোলনে সফলতা আনতে পারে একমাত্র যুবকরাই। আর তাই সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যুব নেতাদের দলে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল নেতাদের নিয়ে আসা হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত