৮১ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বাসায় ফেরায় আপাতত স্বস্তি প্রকাশ করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এমনটিই জানিয়েছেন তারা। আর তার বোন সেলিমা ইসলাম জানিয়েছেন, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্বজনদের ফিরোজায় না যাওয়ার কথা বলেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাসায় ফেরার পর গতকাল সারা দিন গুলশানের বাসভবন ফিরোজার দোতলায় নিজ কক্ষে শুয়ে-বসে সময় কাটিয়েছেন তিনি। বাসায় তৈরি তরল খাবার তাকে খেতে দেওয়া হয়। দুপুরে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক মো. মামুন খালেদা জিয়াকে দেখতে বাসায় গিয়েছিলেন।
বাসায় খালেদা জিয়াকে সার্বক্ষণিক দেখভাল করেন তার ব্যক্তিগত কর্মী ফাতেমা। ফাতেমা ছাড়াও একজন নার্স আছেন যিনি থেরাপি দিয়ে থাকেন এবং ওষুধপত্র এগিয়ে দেন।
হাসপাতাল গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খালেদা জিয়াকে হাসপাতালের কেবিন থেকে গুলশানের বাসভবনে নেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু আমি নই, দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসী চেয়ারপারসনকে একনজর দেখতে পেরে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছেন। করোনার কারণে তার বাসভবনে কাউকে যেতে দেওয়া হবে না। শুধুমাত্র চিকিৎসকরা তাদের প্রয়োজনে যাবেন।’
খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৮১ দিন পর চেয়ারপারসন বাসায় ফিরেছেন। দুই-এক দিন বিশ্রামে থাকুক। আমরা পর্যবেক্ষণ করি। আগামীকাল (আজ) বৃহস্পতিবার তার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারি।’
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়ে গেছে। তার লিভার সিরোসিস ও খাদ্যনালিতে রক্তক্ষরণের সমস্যা রয়েছে। এখন তার যে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন তা দেশে নেই। কিন্তু সরকার যেতে দিচ্ছে না। হাসপাতালের চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিয়েছেন তা সাময়িক। কোথাও দেয়াল হেলে পড়লে বাঁশ-কিংবা কাঠ দিয়ে যেভাবে ঠেকিয়ে রাখা হয় তেমনটা হয়েছে চেয়ারপারসনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে।’
গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগত একাধিক নেতাকর্মী স্বস্তি প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, চেয়ারপারসন ভালো নেই। তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। এরপরও চিকিৎসকদের পরামর্শে চেয়ারপারসনকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়ায় আমরা স্বস্তি অনুভব করছি। হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়ার পথে তাকে একনজর দেখতে পারায় আমাদের ভালো লাগছে। চেয়ারপারসনও হাত নেড়ে আমাদের শুভেচ্ছার জবাব দিয়েছেন।’
তারা আরও বলেন, ‘দুঃখ হয় তাকে (খালেদা জিয়া) উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে আমরা সরকারকে বাধ্য করতে পারিনি। সরকার চেয়ারপারসনকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে চায়। কিন্তু আমাদের ও দেশের জনগণের দোয়া এবং চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টায় সাময়িক চিকিৎসায় কিছুটা ভালো আছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে পারলে আরও কিছুদিন ভালো থাকতে পারতেন তিনি।’
খালেদা জিয়ার মেজো বোন সেলিমা ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়ার পর গত মঙ্গলবার রাতে খালেদাকে দেখতে ফিরোজায় গিয়েছিলাম। নেতাকর্মীদের ভিড়ে বাসায় ঢুকতে কষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিছু সময় সেখানে থেকে খালেদার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। এখন আর যাওয়া যাবে না করোনার কারণে।’
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিতে সরকারের কাছে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু সরকার অনুমতি দেয়নি। বিদেশে নিতে পারলে কিছুটা স্বস্তিতে থাকতে পারতাম।’
বাসায় নেওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে : খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য চেয়ারপারসনকে বাসায় নেওয়া হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এর আগে কিন্তু বাসায় থেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। পরে তার শারীরিক জটিলতা বাড়ায় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এখন বাসায় কতটা নিরাপদে রাখা যাবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া হাসপাতালে থাকলে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকরা দেখতে পারতেন। কোনো টেস্ট করার দরকার হলে তাৎক্ষণিক টেস্ট করা যেত। কিন্তু বাসায় তো সেটা করা যাবে না।’
৭৬ বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার ‘পরিপাকতন্ত্রে’ রক্তক্ষরণ এবং লিভার সিরোসিসের কথা জানান চিকিৎসকরা। বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার ‘সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেই’ দাবি করে তাকে বিদেশে পাঠানোর জন্য কয়েক দফা পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। সাময়িক মুক্তির শর্তের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবারই তা নাকচ করে সরকার।
