ইউক্রেনে বাইডেনের কৌশল এক ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:৩৬ পিএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ঘরোয়া কর্মসূচি ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ (যার মোটা দাগের বাংলা ‘ভালো করে আবার গড়ে তুলি’) কংগ্রেসে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন প্রেক্ষাপটে তিনি, দেশ নয়, বরং বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক জোটকেই আবার আগের মতো জোরদার করে গড়ে তোলায় প্রয়াসী বলে মনে হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় বাইডেন তার পূর্বসূরি ট্রাম্পের করা রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতি মেরামত করার কথা বলেছিলেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে তার জাতীয়ভাবে যতটা তার চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ রয়েছে। কারণ জাতীয় পরিসরে কংগ্রেস এবং অঙ্গরাজ্যের গভর্নররা ব্যাপক প্রভাব ও ক্ষমতার অধিকারী। জাতীয় পর্যায়ে গভীর দলীয় মেরুকরণ ঘটলেও ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান নেতৃত্ব বাইডেনের দূরকল্প এবং ক্রমশই যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠা রাশিয়া এবং আরও দৃঢ় এক চীনের বিপরীতে ‘মার্কিন বৈশ্বিক নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার’ করার সংকল্পের পেছনে ঠিকই একতাবদ্ধ।

আর ইউরেশিয়ায় রাশিয়ার ভীতি প্রদর্শন এবং ইউক্রেনে সম্ভাব্য আক্রমণের ভয় দেখিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের তাতিয়ে তোলা এবং পূর্ব ইউরোপে মার্কিন সেনা মোতায়েন করার প্রস্তুতি নেওয়ার চেয়ে ইউরোপ-আমেরিকা জোট পুনর্গঠনের অধিকতর ভালো কায়দা আর কী হতে পারে? প্রশান্ত মহাসাগরীয় জোট পুনর্গঠনের জন্য চীনের উত্থান এবং তাইওয়ানে তাদের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ভয় দেখিয়ে এশীয় মিত্রদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলার চেয়ে ভালো উপায়ই বা আর কী? এই কৌশলের অংশ হিসেবেই বাইডেন অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধের সম্ভাব্য দৃশ্যকল্পকে জোরেশোরে উত্থাপন করছেন। যদিও ক্রেমলিন প্রায়ই একে হালকা করে দেখাচ্ছে। এটিকে আত্মরক্ষামূলক প্রস্তুতি বলে না, কল্পনাশক্তি খুব বেশি হলেও না।

এটা প্রায় যেন বাইডেনের রাশিয়াকে উসকে দেওয়ার মতো হচ্ছে : যেন বলা হচ্ছে, ‘যাও দেখি, আক্রমণ করই না’!

ইরান বা ভেনিজুয়েলার মতো দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদ্ধতি একটি চৌকস কৌশল হতে পারে। তবে এটি রাশিয়া এবং চীনের মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে বেপরোয়া হিসেবেই চিহ্নিত হবে। মস্কো ও পেইচিংও তাদের প্রভাব জোরদার করার জন্য প্রতিবেশী অঞ্চলে আগ্রাসী পদক্ষেপ নিচ্ছে। পশ্চিমারা পাল্টা হিসেবে তাদের এসব পদক্ষেপকে নিজেদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো, জোট গঠন এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকি জারি করার মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।

কিন্তু রাশিয়া ও চীনকে একই সঙ্গে কোনায় ঠেলে দেওয়া হলে যথাযথ কূটনীতির অবকাশ তেমন থাকে না। ১৯৯০-এর দশকে ইরাক এবং ইরানের মতো অনেক দুর্বলতর অ-পরমাণু শক্তির বিরুদ্ধেও এ ধরনের ‘দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের’ চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আর তার পরবর্তী দশকে এ কৌশল প্রেসিডেন্ট বুশের ‘এক্সিস অব ইভিল’ (অশুভ অক্ষ) কৌশলে রূপান্তরিত হয়। সেটিও এক নির্বোধ বিপর্যয়ে পর্যবসিত হয়েছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন গত মাসে জেনিভায় তার রুশ প্রতিপক্ষ সের্গেই লাভরভের সঙ্গে দেখা করার সময় অদ্ভুতভাবে তার সুর শোনায় পূর্বসূরি জেমস বেকারের মতোই। তিন দশক আগে সুইজারল্যান্ডের ওই শহরেই জেমস বেকার তার ইরাকি প্রতিপক্ষ তারিক আজিজের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। বেকারের মতোই আত্মবিশ্বাসী ব্লিঙ্কেন বলছিলেন, ‘আলোচনা দর-কষাকষি নয়। এর উদ্দেশ্য হুমকি দেওয়া নয়, বরং অবগত করা। তিনি শান্তিপূর্ণ ফলাফলের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে হিসাব কষায় আরেকটি ভয়ানক ভুল করার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের বিরুদ্ধে দুটি যুদ্ধ করেছে। ইরানকে কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আটকে রেখেছে। এসবের জন্য তিনটি দেশকেই ভয়ানক মূল্য দিতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকলাপ আরও অস্থিতিশীলতা আর নিরাপত্তাহীনতারই বীজ বপন করেছে। ইরানকে উসকে দিয়েছে পারমাণবিক শক্তি অর্জন করার পথে। বলা বাহুল্য, রাশিয়া ইরাক বা ইরান নয়। যুক্তরাষ্ট্রও আর ইরাকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় যুদ্ধ বা আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক অপমানের পরে ১৯৯১ সালের মতো সেই বৈশ্বিক শক্তি নয়। ওয়াশিংটন যুদ্ধের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন চাইছে না কিংবা ইউক্রেন বা তাইওয়ানকে মুক্ত করতে ৫ লাখ বা কোনোসংখ্যক সেনাই পাঠাতে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দিন আগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আলোচ্যসূচিতে ইউক্রেন ইস্যুটি তুলতে সফল হয়ে থাকতে পারে। তবে এর প্রস্তাবটি রাশিয়া এবং চীন কার্যত এক কথায় খারিজ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন তৎপরতাটি স্রেফ এক জনসংযোগ অনুশীলনে পর্যবসিত হয়। কোনো পশ্চিমা নেতাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের মতো বাইডেনের কৌশলগুলোর পেছনে এত বেশি উৎসাহ দেখাননি। বরিস জনসন ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করছেন। আরও একবার ব্রিটিশ জনসাধারণকে প্রতারিত করার পর নিজের চাকরি বজায় রাখার জন্য লড়াই করছেন তিনি। ইউক্রেন নিয়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বরিস জনসনের দায়িত্বজ্ঞানহীন উসকানি প্যারিস এবং বার্লিনে তার ইউরোপীয় মিত্র নেতাদের শঙ্কিত করেছে। ওই দুই নেতা প্রকাশ্য হম্বিতম্বি আর যুদ্ধবাজ বাগাড়ম্বরের চেয়ে নীরব কূটনীতি পছন্দ করেন বেশি।

বস্তুত ইউক্রেন নিয়ে উত্তেজনা বেড়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে ২০০৩ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের আগের সময়টির মতোই ইঙ্গ-মার্কিন এবং ফরাসি-জার্মান অক্ষের মধ্যে সেই একই ধরনের অসংগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এই ইউরোপীয় শক্তিগুলোর কাছে একটি দৃঢ় ন্যাটোর জন্য বাইডেনের উৎসাহের আতিশয্য আসলে জোটটির প্রতি তার পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদাসীনতার চেয়ে কম উদ্বেগজনক নয়। সত্যি বলতে, হয়তোবা আরও বেশিই দুশ্চিন্তার। বস্তুত বাইডেনের এহেন কঠিন আলিঙ্গন বরং শ্বাসরোধ করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের প্রশংসা যদি রুশ এই লৌহমানবকে উৎসাহিত করে থাকে তাহলে বাইডেনের খ্যাপা ধরনের বৈরিতা পুতিনকে বিপজ্জনক কোণেই ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধংদেহী বকবকানিতে বিচলিত হয়ে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যাতে বাইডেন খুব খুশি নন।

বাইডেন বাজি ধরেছেন যে বিপজ্জনক এই পদ্ধতি উভয় ক্ষেত্রেই জয় নিশ্চিত করতে পারে। রাশিয়া যদি পিছিয়ে যায় তবে এটি হবে বাইডেনের জন্য এক কৌশলগত বিজয়। আবার যদি তারা ইউক্রেনকে আক্রমণও করে (যেমনটি বাইডেন বলে আসছেন) তখন ভবিষ্যদ্বাণী সফল হওয়ার জন্য তাকে একজন দূরদর্শী কৌশলবিদ হিসেবে দেখা হবে যিনি কি না তোষামোদ করার পথে যাননি। তবে ইউরোপীয়রা খুব ভালোভাবেই বোঝে যে পুতিনের রাশিয়া নাৎসি জার্মানি নয়। রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক লেনদেন করা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মানিকে শান্ত করার মধ্যে কোনো প্রতারণামূলক তুলনা মানতে রাজি নয় আজকের ইউরোপ।

লেখক : আল-জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। আল-জাজিরা থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত