ভাষার শুদ্ধতা

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০২ এএম

‘ভাষা’ মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য। একজন মানুষের প্রাথমিক চাহিদাগুলোর অন্যতম হচ্ছে, ‘ভাষা’ শিক্ষা। কথাবার্তা, আদান-প্রদান, মতবিনিময়, কথোপকথন, সুখ-দুঃখ, অভিযোগ, অনুযোগ, আপত্তি, মনভাব প্রকাশ, দোয়া-প্রার্থনা, প্রত্যাশাসহ সব ধরনের পারস্পরিক সম্পর্কের লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। মানুষ সৃষ্টির পর মহান আল্লাহ ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। সেদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পরম দয়াময়। কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। মানব সৃষ্টি করেছেন। তাকে ‘ভাষা শিক্ষা’ দিয়েছেন।’ সুরা আর রাহমান : ১-৪

পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষা রয়েছে। মানুষ সব ভাষায় কথা বলে না বা বলতে পারে না। কেবল, মাতৃভাষাতেই কথা বলে। মাতৃভাষা বলতে উদ্দেশ্য, মায়ের ভাষা অথবা শৈশবে শিক্ষালাভ করা ভাষা। ভাষা বিভাজন মহান আল্লাহ কর্র্তৃক সৃষ্ট। এর হাত ধরে পারস্পরিক পরিচিতি ও সম্প্রীতির প্রসার ঘটে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের নর-নারীরূপে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদের বহুগোত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছি যেন তোমরা পরস্পর পরিচিতি লাভ করতে পারো। নিশ্চিতরূপে সেই মহান আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।’ সুরা হুজুরাত : ১৩

তবে ভাষা কিংবা বংশগত পরিচিতি শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয় বরং তাকওয়ার ভিত্তিতে তা নির্ধারিত হয়। আয়াতের শেষাংশে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.)  থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সম্মানিত? জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বেশি আল্লাহকে ভয় করেছে সে বেশি সম্মানিত।’ সহিহ্ বোখারি : ৩৩৮৩

ইসলামে ‘মাতৃভাষার’ গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ উম্মতের হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। সবাই আপন আপন ভাষায় হেদায়েতের বাণী পৌঁছিয়েছেন। কালামে পাকে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ সুরা ইবরাহিম : ৪

হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.) কাবা সংস্কারের সময় বিশ্বনবীর আগমনী দোয়া করেছিলেন। তাতেও আপন ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে রাসুল প্রেরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি তাদের মধ্য থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করুন। যিনি আপনার আয়াতগুলো তাদের পড়ে শোনাবেন, তাদের পবিত্র করবেন এবং তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন।’ সুরা বাকারা : ১২৯

হাদিসে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের স্বভাষায় রাসুল প্রেরণ করা হয়েছে, আমাকে প্রত্যেক লাল, কালো অর্থাৎ সারা পৃথিবীর জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।’ সহিহ্ মুসলিম : ৫২১

ইসলাম মানুষকে মাতৃভাষায় পারদর্শিতা অর্জনে উৎসাহ প্রদান করে। পৃথিবীতে আগমনকারী সব নবী-রাসুল আপন আপন ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। নবী করিম (সা.)-এর জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি তৎকালীন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শুদ্ধভাষী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলতেন। ইমাম সুয়ূতি (রহ.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) পৃথিবীর সবচেয়ে শুদ্ধভাষী ছিলেন।’ আল মুজহার ফি উলুমিল লুগাহ ওয়া আনওয়ায়িহা

বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা, শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করে। হৃদয়ে প্রভাব ফেলে। সেই সঙ্গে সবার জন্য কথা ও মর্ম উপলব্ধি করা সহজ হয়। হজরত মুসা (আ.) প্রাঞ্জল ভাষার গুরুত্ব অনুধাবন করে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, যেন নিজের বাচনিক জড়তা দূর হয় এবং স্বীয় ভাই হজরত হারুন (আ.) কে সহযোগী হিসেবে মনোনীত করা হয়। কেননা, হজরত হারুন (আ.)-এর ভাষাশৈলী অত্যন্ত চমৎকার ছিল। ঘটনাটি পবিত্র কোরআনে এসেছে, হজরত মুসা (আ.) বলেন, ‘হে আমার রব, আমার জন্য আমার বক্ষ উন্মোচন করে দিন। আমার কাজ আমার জন্য সহজ করে দিন। আর জিহ্বা থেকে আমার জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে সক্ষম হয় এবং আমার পরিবার থেকে আমার জন্য একজন সাহায্যকারী মনোনীত করে দিন। হারুন আমার ভাইকে (মনোনীত করুন)।’ সুরা ত্বহা : ২৫-৩০

শুধু বিশুদ্ধ ভাষা নয় বরং ইসলাম আরও উৎসাহ প্রদান করে নরম ও কোমল ভাষায় কথা বলার প্রতি। আন্তরিকতার সঙ্গে সত্যের দাওয়াত প্রদান এ ধর্মের অনন্য সৌন্দর্য। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ হজরত মূসা (আ.)-এর প্রতি ফেরাউনকে নরম স্বরে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের জন্য নির্দেশ করেছেন। ‘তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা (আল্লাহকে) ভয় করবে।’ সুরা ত্বহা : ৪৪

পক্ষান্তরে, মহান আল্লাহ কর্কশ ও অসুন্দর আওয়াজে কথা বলার মন্দ দিক উল্লেখ করে বলেন, ‘চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রেখো। সবচেয়ে খারাপ (কর্কশ) স্বর হলো গাধার কণ্ঠস্বর।’  সুরা লোকমান : ১৯

হজরত আবু সালাবা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি আমার কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় এবং জান্নাতের মনজিলে আমার থেকে অধিক দূরে থাকবে, যার চরিত্র খারাপ ও ভাষা কর্কশ।’ তাফসিরে ইবনে কাসির

অতএব, ভাষা ও মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে সবার উচিত বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি সুন্দর ও প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত