শিরকের পরিণতি

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:০৪ এএম

শিরক অর্থ ‘অংশীদার করা’, ‘সহযোগী বানানো’। কার্যত আল্লাহতায়ালার সঙ্গে ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর অংশীদার, সমকক্ষ ও সহযোগী সাব্যস্ত করাকে শিরক বলে। ইসলামে শিরক মহাপাপ ও গুরুতর অপরাধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না, নিশ্চয় শিরক মহাপাপ।’ সুরা লুকমান : ১৩

সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে কঠিন পাপ কী? তিনি বলেন, সবচেয়ে কঠিন পাপ হলো তুমি আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ সহিহ্ মুসলিম : ১৫৯

হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কবিরা গোনাহ হলো আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, মানুষ হত্যা করা, পিতামাতার অবাধ্যতা করা, মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।’ সহিহ্ বোখারি : ৬৪০৫

শিরকের বিপরীত বিষয় তওহিদ। তওহিদ বলতে আল্লাহর একত্ববাদকে বোঝানো হয়। পৃথিবীতে যত নবী ও রাসুল এসেছেন, তারা সবাই তওহিদের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত ছিলেন। পবিত্র কোরআনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তওহিদ, শিরক ও কুফর বিষয়ক আলোচনা। কোরআনে করিমের সুরা ইখলাসে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই।’ তাছাড়া হাদিস শরিফে শিরকের আলোচনা ব্যাপক এবং মুসলিম উম্মাহর আলেমরা তওহিদ-শিরক ও কুফর বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন।

আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কোনো কাজ করে মানুষের প্রশংসার ইচ্ছা করা ‘শিরকে আসগার’ তথা ছোট শিরক। এটি বান্দাকে মুসলিম মিল্লাতের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় না, তবে তার তওহিদের আকিদায় ত্রুটি সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত শিরকে লিপ্ত হওয়ার কারণ হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অতএব, দুর্ভোগ সেসব নামাজির, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা তা লোক দেখানোর জন্য করে।’ সুরা মাউন : ৪-৬

আর যেসব বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখে না, সেসব বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে আশা করা ‘শিরকে আকবার’ তথা বড় শিরক বা প্রকৃত শিরক। এটি বান্দাকে মুসলিম মিল্লাতের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়। এ ধরনের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা না করে মারা যায়, তাহলে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। আর অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ সুরা মায়িদা : ৭২

শিরকের অযৌক্তিকতা ও অসারতা সুস্পষ্ট এবং প্রমাণিত। মহান আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা, তিনি সর্বশক্তিমান ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। তিনি কল্যাণ ও অকল্যাণের কোনো ফয়সালা দিলে তা রোধ করার সাধ্য ও ক্ষমতা কারওর নেই। জগতের সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণাধীন, তার দৃষ্টি ও জ্ঞানের বাইরে কোনো কিছু নেই। উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আল্লাহর পরিবর্তে যাদের মানুষ ডাকে, প্রকৃতপক্ষে তারা কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি রাতকে দিবসে প্রবিষ্ট করেন এবং দিবসকে রাতে প্রবিষ্ট করেন। তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকটি আবর্তন করে এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত। তিনি আল্লাহ; তোমাদের পালনকর্তা, সাম্রাজ্য তারই। তার পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটিরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদের ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শিরক অস্বীকার করবে। বস্তুত আল্লাহর ন্যায় তোমাকে কেউ অবহিত করতে পারবে না।’ সুরা

ফাতির : ১৩-১৪

মুমিন জীবনের কাক্সিক্ষত স্বপ্ন ‘পার্থিব জীবনে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণের মাধ্যমে পরকালে জান্নাত প্রাপ্তি ও আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ।’ কিন্তু শিরক এমন কঠিন পাপ, যা মানুষের পরকাল জীবনের সব সফলতা ও মুক্তির পথ বন্ধ করে দেয়। এ কারণে শিরক ও কুফর সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক থাকা এবং এর থেকে আত্মরক্ষা করা প্রত্যেকের জন্য একান্ত আবশ্যক। হজরত আবু মুসা আশয়ারি (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে মানুষেরা, শিরক থেকে আত্মরক্ষা করো; কারণ শিরক পিপীলিকার পদক্ষেপের চেয়েও সুক্ষ্মতর। তখন এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, তা যদি পিপীলিকার পদক্ষেপের চেয়েও সুক্ষ্মতর হয় তবে কীভাবে তা থেকে আত্মরক্ষা করব? তিনি বলেন, তোমরা বলবে হে আল্লাহ, আমরা জেনেশুনে আপনার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং যা না জানি তা থেকে আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

করছি।’ সুনানে আহমাদ : ১৯৬০৬

শয়তানের প্ররোচনা, ধর্মীয় জ্ঞানের অপ্রতুলতা, তওহিদ সম্পর্কে ভাসা-ভাসা জ্ঞান ও ভ্রান্ত ধারণা, অতি আবেগ, ভক্তি-ভালোবাসা এবং ধর্মীয় বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করে উদ্দেশ্য সাধনে মরিয়া হয়ে ওঠার প্রবণতা সাধারণত মানুষকে শিরক, কুফর ও বিদআতের অন্ধকারে ঠেলে দেয়। শিরক থেকে বাঁচতে হলে ধর্মবিশ্বাসের প্রাথমিক ও মৌলিক বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করা, তওহিদ ও শিরকের সঠিক ব্যাখ্যা ও পার্থক্য জানা, শিরকের ভয়াবহতা ও অশুভ পরিণতির কথা চিন্তা করা, অন্যের প্রতি ভক্তি-ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদনে সতর্ক থাকা এবং উদ্দেশ্য সাধনে অতি মরিয়া হয়ে ওঠার প্রবণতা দূর করা। এভাবে বান্দা যখন একাগ্রচিত্তে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে, তখন আল্লাহ তার বিগত দিনের সব অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। হজরত আবু জার (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বলেছেন যে ব্যক্তি একটি নেকি করবে, তার জন্য দশ গুণ নেকি রয়েছে অথবা তার চেয়ে বেশি। আর যে একটি পাপ করবে, তার বিনিময়ে সে ততটাই পাবে অথবা আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। যে আমার প্রতি এক বিঘত নিকটবর্তী হবে, আমি তার প্রতি এক হাত নিকটবর্তী হব। আর যে আমার প্রতি এক হাত নিকটবর্তী হবে, আমি তার প্রতি দুহাত নিকটবর্তী হব। যে আমার দিকে হেঁটে আসবে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাব। যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক না করে পৃথিবী সমান পাপসহ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, আমি সমপরিমাণ ক্ষমাসহ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব।’ সহিহ্ মুসলিম : ৭০০৯

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত