দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সারা দেশেই মানুষের নাভিশ্বাস। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিম্ন আয়ের এক কোটি পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যপণ্য দেওয়া শুরু করেছে সরকার। গতকাল রবিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি শুরু হয়। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্টেশন রোড হক স্টিল মিলস এলাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তবে সরকারের এই উদ্যোগের প্রথম দিনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে রাজধানী ঢাকার প্রায় অর্ধেক ক্রেতাকে। আবার কেউ কেউ ট্রাক থেকে পণ্য কিনেই বিক্রি করেছেন মুদিদোকানে। তদারকিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা টিসিবির কাউকে মাঠে দেখা যায়নি।
তপন কান্তি ঘোষ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আজ (রবিবার) সারা দেশে টিসিবির বিশেষ ব্যবস্থাপনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। রমজান সামনে রেখে দুই দফায় এই পণ্য দেওয়া হবে। তিনি জানান, প্রথম ধাপে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে পাঁচ ধরনের পণ্য বিক্রি করবে টিসিবি। এরপর আগামী ৩ এপ্রিল শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপের বিক্রির কার্যক্রম।
এদিকে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পেতে টিসিবির ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রের সামনে মানুষের দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এসব পণ্য ক্রয় করছে সাধারণ মানুষ। সারিতে পুরুষের তুলনায় নারীদের ভিড় তুলনামূলক বেশি। দাঁড়ানো নিয়ে নারীদের সারিতে ঝামেলা বাধতেও দেখা গেছে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে অনেক নারীকে বসে পড়তেও দেখা গেছে।
গতকাল রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডে জেলখানার মোড়ে বেলা ১১টায় টিসিবির ট্রাক এসে হাজির হয়। সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পেতে ৮ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদেরও সারিতে দাঁড়াতে দেখা গেছে। এ ছাড়া সারিতে এমন নারীরাও দাঁড়িয়েছেন, যারা আগে কখনো দাঁড়াননি। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে বেলা ১টায় পণ্য পান খাজে দেওয়ান লেনের বাসিন্দা আলেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘জীবনে প্রথমবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। এমন পরিস্থিতি আসবে কখনো ভাবিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অবশেষে পণ্য পেয়েছি।’
আলেয়া বেগম পণ্য পেলেও শেষ পর্যন্ত অনেককে পণ্য না পেয়ে ফেরত যেতে হয়েছে। তবে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতাদের অভিযোগ, অনেকেই দুবার পণ্য সংগ্রহ করছেন। তাদের কেউ কেউ আবার পণ্য পেয়ে পাশেই মুদিদোকানে বিক্রি করেছেন। এই প্রতিবেদকের সামনেই জেলখানার মোড়ে মুদিদোকানে টিসিবি থেকে কেনা পণ্য বিক্রি করেন রাবেয়া নামে ওই নারী। তিনি বলেন, ‘টিসিবি থেকে যে পেঁয়াজ দেওয়া হয় তা বেশি দিন ঘরে রাখা যায় না। আমার পেঁয়াজ, ডাল বা চিনির দরকার ছিল না, দরকার ছিল তেল। তাই পেঁয়াজ, ডাল, চিনি বিক্রি করে দিয়েছি।’
এই নারীর দাবি, তেলের সঙ্গে বাকি পণ্যগুলো বাধ্যতামূলক করায় তারা বিপাকে পড়েছেন। যে টাকায় প্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে অন্যগুলো নিতে হয় সেই টাকায় চাল বা অন্য বাজার দরকার হয় তার মতো মানুষের। রাবেয়া বলেন, ‘স্বামী রিকশা চালায়। ঘরে দুটো মেয়ে। কোনো রকম এক রুমের বাসা নিয়ে ভাড়া থাকি। স্বামীর আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। তার মধ্যে বাড়তি জিনিস নিয়ে রেখে দিলে তো লাভ হবে না। বিক্রি করে যা টাকা পেয়েছি তা নিয়ে অন্য সদায় নিয়ে বাসায় যাব।’
পণ্য না পেয়ে ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছিলেন সোয়ারীঘাটের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য পাইনি। অনেকেই এসে দুবার পণ্য নিয়ে যাচ্ছে।’
এ বিষয়ে টিসিবির ডিলার মেসার্স মেহেদী এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার মো. শাওন বলেন, ‘পণ্যের বিপরীতে দুই থেকে তিন গুণ মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। যারা আগে লাইনে আসে আমরা তাদের পণ্য দিই। শেষ পর্যন্ত সবাইকে পণ্য দেওয়া সম্ভব হয় না।’
যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, ‘দেশে কোনো পণ্যের অভাব নেই। প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি মজুদ রয়েছে। টিসিবির পণ্যে দেশের এক কোটি পরিবারের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ উপকৃত হবেন।’ গতকাল রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত টিসিবির পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদার প্রায় ৯০ ভাগ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তবে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম উপায়ে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে টাঙ্গাইলে এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা মানুষের দুঃখ-কষ্টে সব সময় মানুষের পাশে ছিলেন। আমরা আজকে টিসিবির মাধ্যমে দেশের এক কোটি মানুষকে স্বল্পমূল্যে জিনিসপত্র দিচ্ছি। আমাদের এই ধারা অব্যাহত থাকবে। দেশে কোনো হাহাকার হবে না। প্রয়োজনে আরও খাদ্য ও অন্যান্য সাহায্য নিয়ে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব।’
টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পর্যায়ে সুবিধাভোগীদের কার্ড দেওয়া হয়েছে। তবে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার ১২ লাখ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৯০ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। আগের মতোই টিসিবির খোলা ট্রাকের মাধ্যমে তাদের মধ্যে পণ্য বিক্রি করা হবে। করোনাকালীন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে নগদ সহায়তা দিতে যে ডেটাবেইস করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৩০ লাখ পরিবারকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ৫৭ লাখ ১০ হাজার উপকারভোগীর তালিকা করা হয়েছে। পরে এসব পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়। প্রতিটি পরিবার কার্ডের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে একসঙ্গে পাঁচটি পণ্য নিতে পারবে। উপকারভোগী পরিবার ১১০ টাকা দরে ২ লিটার সয়াবিন তেল, ৫৫ টাকা দরে ২ কেজি চিনি ও ৬৫ টাকা দরে ২ কেজি মসুর ডাল পাবে।
গত শনিবার টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আরিফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে জানান, ৮ মার্চ থেকে সংশ্লিষ্ট জেলায় পণ্য পাঠানো হয়েছে এবং ইতিমধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য পৌঁছে গেছে। মানবিক এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসন সম্পৃক্ত থাকবে। যারা সত্যিকার অর্থে এ পণ্য পাওয়ার যোগ্য, তাদেরই কার্ড দেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি জেলায় খাদ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও নির্ধারিত গুদামে টিসিবির পণ্য রাখা হয়েছে।
