বেলতলা বস্তি: ৩০০ ঘর ভস্ম, অঙ্গার খাঁচাবন্দী চার শতাধিক কবুতর ও পাখি

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২২, ১০:২৮ পিএম

রাজধানীর কল্যাণপুরের নতুন বাজার বেলতলা ৯ নম্বর বস্তির সিদ্দিকের দুই তলা যে ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত তার ঠিক পাশেই কয়েকটি ঘরে ছিল সিদ্দিকের ভাই শাহ আলমের কবুতর ও পাখির খামার। গ্রীবার, ওপাল রেসিং, মুন্ডিয়ান, আফসান গ্রিজেল বিউটি, কিং ও দেশি প্রজাতিসহ অন্তত চার শতাধিক কবুতর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ছিল খাঁচায় বন্দী। গত ছয় বছর ধরে বাণিজ্যিক ভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এ খামারটি। 

গত রবিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বস্তিটিতে যখন আগুনের সূত্রপাত হয় তখন এসব কবুতর ও পাখিদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে দ্রুত ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। কিন্তু খাঁচায় বন্দী থাকা কবুতর ও পাখি গুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। কেউ এগিয়ে আসেনি তাদের বাঁচাতে।

বস্তির বাসিন্দারা জানান, আগুনের তাপে কবুতর ও পাখিগুলো ডাকা ডাকি করতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই সব পুড়ে নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

সোমবার ওই ঘরগুলোর সামনে গিয়ে দেখা যায় স্তূপ করা আছে পোড়া খালি খাঁচা গুলো। আশপাশের বাসিন্দারা জানান, পোড়া কবুতর ও পাখিগুলো থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়ানোর কারণে ভোরে সেগুলো খাঁচা থেকে বের করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। 

দুপুরে কবুতরের খামারের মালিক ও নগর বস্তিবাসী উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি মো. শাহ আলমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান, কবুতর গুলির মধ্যে অন্তত ৩০ জোড়া ছিল দামি প্রজাতির। এগুলোর দাম ছিল জোড়া প্রতি ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আগুন লাগার পর দেখভালের দায়িত্বে থাকা তার কর্মচারীরা পালিয়ে গেছে বলে জানান তিনি।              

গত রবিবার রাত পৌনে ৯টায় ৯ নম্বর বস্তিতে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। তাদের ১৪টি ইউনিটের প্রায় আড়াই ঘণ্টায় চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ততক্ষণে বস্তিটির বেশি ভাগ ঘরই পুড়ে ছাই হয় যায়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। বস্তির ঠিক মাঝখানে সিদ্দিকের দুইতলা ঘরের ভাড়াটিয়া খোরশেদের ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পরে আশপাশের ঘরে। গ্যাসের চুলা অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে ধারণা বাসিন্দাদের। ফায়ার সার্ভিস আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেনি। তবে অনেকের দাবি ওই ঘরে ছিল ৩০ থেকে ৪০টি গ্যাসের সিলিন্ডার।

সরেজমিনে দেখা যায়, পোড়া ঘরের ধ্বংসস্তূপের প্রখর রোদের মধ্যে পরিবার নিয়ে বসে আছে ঘরহারা অসহায় মানুষেরা। তাদের অনেকেরই অভিযোগ বস্তিতে যখন আগুন লাগে তখন একদল যুবক মালামাল লুট করেছে। সোমবার দুপুর পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে শুধু আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই পাননি। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছে পাশের বস্তির বাসিন্দারা।    

বস্তির মাদ্রাসা গেট দিয়ে প্রবেশের ১০ টি ঘর পরেই সত্তরোর্ধ্ব আলি আহম্মেদকে পোড়া ঘরের মধ্যে কাপড় টানিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশেই তার ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী লতা বেগম মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। লতা বেগম এ প্রতিবেদককে জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে এই বস্তিতে তাদের বাস। পোড়া ঘরটি তাদের নিজেদের। আলি আহম্মেদ গত ৮ থেকে ৯ বছর অসুস্থ, হাঁটাচলা করতে পারে না। দুই মেয়ে ও এক ছেলে তাদের ছেড়ে চলে গেছে। লতা বেগম মানুষের কাছে চেয়ে-চিন্তে সংসার চালান। ঘর হারিয়ে এবার পথে বসা ছাড়া উপায় নেই তার। 

এর দুই ঘর পরেই পোড়া ঘরের মালামালের পাশে স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে হুইল চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায় পঙ্গু আব্দুল আউয়ালকে। তিনি জানান, জন্ম থেকেই তিনি পঙ্গু। ঘরের পাশেই সেলাই মেশিনের দোকান দিয়ে তার সংসার চলত। আগুনে মেশিনটিও পুড়ে গেছে।    

বস্তির আরেকটি পোড়া ঘরের পাশে বসা থাকা লাকি আক্তার বলেন, ‘আমাদের দুইটা ঘর ছিল। সেখানে থাকা টিভি, ফ্রিজ, ওয়ারড্রপ, শোকেস, আলমারি কিছুই নেই এখন। আমার শাশুড়ির কাপড়ের ব্যবসা রয়েছে। ঘরে অনেক শাড়ি কাপড় ছিল। আমরা জীবন বাঁচাতে তাৎক্ষণিক খালি হাতে ঘর থেকে বের হয়ে গেছি। কিন্তু এরপরই দেখি কিছু যুবক ঘর থেকে সব লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের চিনতে পারি নাই।’

এদিকে আগুনে বস্তির তিন শতাধিক ঘর পোড়ার তথ্য দিয়েছে নগর বস্তিবাসী উন্নয়ন সংস্থার নেতৃবৃন্দ। তারা জানিয়েছে, ওই এলাকায় মোট ১০টি বস্তি রয়েছে। এর মধ্যে আগুনে পোড়া বস্তিটি ৯ নম্বর। সেখানে মোট ৬৫০ টি ঘর ছিল। তার মধ্যে প্রাথমিক ভাবে ৩০০ ঘর পোড়ার তালিকা করা হয়েছে।

বস্তিবাসীর কেউ কেউ মনে করছেন আগুন পরিকল্পিত ভাবে লাগানো হয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন সরকারি এ জায়গাটি খালি করার জন্য চাপ ছিল তাদের উপর। এদেরই একজন এসকানদার আলী মিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৯৮৯ সালে প্রথম এ বস্তিতে আগুন লাগে। সে সময়ও পরিকল্পিত ভাবে আগুন দেওয়া হয়। ওই আগুনে মারা যায় ৯ জন। ওই মামলা দীর্ঘদিন চলে। পরে আসামিরা প্রভাব খাঁটিয়ে মুক্তি পেয়ে যায় বলে শুনেছি। এর পর ২০০৩ সালে একবার বস্তি উচ্ছেদের চেষ্টা হয়। তখন আমরা আদালতের দ্বারস্থ হই। আমাদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ না করতে আদালত নির্দেশ দেয়। এর পর ২০১৬ সালেও একবার উচ্ছেদের চেষ্টা করে। সব সময়ই একটি মহল আমাদের উপর চাপ দিচ্ছে বস্তির জায়গা খালি করার জন্য। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত