ইউক্রেনে রুশ হামলার নিন্দা জানিয়ে সম্প্রতি জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সেই প্রস্তাব সমর্থন করে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ। বাকি দেশগুলো ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। রাশিয়াকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভিন্ন অবস্থানের পেছনে ঐতিহাসিক, ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণ দায়ী। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
জাতিসংঘে ভোটাভুটি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে এই অভিযোগ তুলে ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে হামলা চালান। পুতিনের আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে ২ মার্চ নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক জরুরি অধিবেশনে খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর জন্য রাশিয়ার কড়া সমালোচনার পাশাপাশি অবিলম্বে হামলা বন্ধ করে রুশ সেনাবাহিনীকে দেশে ফেরার দাবি জানানো হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৪১ দেশ প্রস্তাবটিতে সমর্থন জানায়। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় পাঁচটি দেশ বেলারুশ, ইরিত্রিয়া, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া ও রাশিয়া। চীনসহ সাধারণ পরিষদের ৩৫ সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ আফগানিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ ও নেপাল প্রস্তাবে সমর্থন জানায় আর বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ভোট দেওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে। জাতিসংঘে রাশিয়ার পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণ বুঝতে হলে দেশটির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত দেশগুলোর ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক-ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক জানা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে পরাশক্তিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বোঝাও জরুরি।
ভারত
জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সাধারণ উভয় পরিষদেই উত্থাপিত প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল ভারত। এ নিয়ে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমালোচনা হজম করতে হচ্ছে। ইউক্রেনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসনের সরাসরি নিন্দা জানাতে মোদিকে চাপ দিচ্ছে বিভিন্ন মহল। জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি টি এস তিরুমূর্তি সাধারণ পরিষদে বলেন, ‘ভারত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সংলাপে ফেরা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে সব সময় অবস্থান ভারতের।’ ঐতিহাসিকভাবে জাতিসংঘের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুব একটা মসৃণ নয়। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের অবস্থান বহু আগে থেকে হতাশ করে আসছে নয়াদিল্লিকে। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে কাশ্মীর ইস্যু জাতিসংঘে তোলে ভারত। কাশ্মীরে পাকিস্তানের তৎপরতা বিষয়ে ভারতের অভিযোগ সে সময় কানে তোলেনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। বরং ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পাল্টা অভিযোগে গুরুত্ব দেয় নিরাপত্তা পরিষদের দুই সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। জাতিসংঘে দেশ দুটির ওই কর্মকাণ্ডের কারণে এখন পর্যন্ত কাশ্মীরে পাকিস্তান অবস্থান করছে বলে মনে করে ভারত। একইভাবে ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে চীনের অনুপ্রবেশ নিয়েও নয়াদিল্লির পক্ষ নেয়নি জাতিসংঘ। সম্প্রতি ভারতের লাদাখ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভারতীয় ও চীনা সেনাবাহিনী সংঘর্ষে জড়ালে চীনের পক্ষ নেয় জাতিসংঘসহ পশ্চিমা বিশ্ব। সীমান্তে চীনের অনুপ্রবেশে কোনো ধরনের নিন্দা জানায়নি তারা। অন্যদিকে জাতিসংঘে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে বিবেচিত। কাশ্মীরসহ অন্যান্য ইস্যুতে জাতিসংঘে বরাবরই ভারতের পক্ষ নেয় রাশিয়া। একইভাবে ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরি ও ১৯৬৮ সালে চেকস্লোভাকিয়ায় সোভিয়েত বাহিনীর সামরিক অভিযান নিয়ে জাতিসংঘে রাশিয়ার বিপক্ষে যায়নি ভারত। ১৯৭৯ সালে রাশিয়া আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালালে তখনো মস্কোর পক্ষ নেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সে সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভারত বলেছিল, আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী হাফিজুল্লাহ আমিনের নেতৃত্বাধীন সরকারের অনুরোধে রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করে রুশ সেনা। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখল করলে সে সময় নিরপেক্ষ অবস্থান নেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। এ ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও বেশ মজবুত। সেই সোভিয়েত আমল থেকে বিপুল পরিমাণে সামরিক অস্ত্র পেয়ে আসছে ভারত। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০সহ ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখে চলেছে রাশিয়া।
পাকিস্তান
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়ার বিপক্ষে ভোট দেওয়া থেকে পাকিস্তানের বিরত থাকার পেছনে নয়া ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক মেরুকরণ প্রধান ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘ দুই দশক ধরে আফগানিস্তান যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয় পাকিস্তানের। সে সময় রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে ইসলামাবাদের। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন। নতুন এই মার্কিন নেতার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না পাকিস্তানের। বিশেষ করে ২০ বছর পর আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব সেনা প্রত্যাহারের পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে ইসলামাবাদের। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাইডেন। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত তার সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কোনো আলাপ হয়নি। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে মিলে নতুন অক্ষ গড়ার বিষয়ে আগ্রহী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান। নতুন এই অক্ষ ইউরোপ ও এশিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২ মার্চ উত্থাপিত খসড়া প্রস্তাবে ভোট দেওয়া বিরত ছিল বাংলাদেশও। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সারা বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে বাংলাদেশ। আলোচনার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের গুরুত্ব আমরা শুরু থেকে বলে আসছি। জাতিসংঘেও একই কথা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সেখানে আমরা বলেছি, চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘের মহাসচিবের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্কে সম্প্রতি উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বাংলাদেশ পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন সিদ্ধান্ত দুদেশের সম্পর্কে অবনমন ঘটায়। এ ছাড়া ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই যুদ্ধে ভারতকে সামরিকভাবে সহায়তা করে রাশিয়া। বাংলাদেশে রাশিয়ার বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প চলমান। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প তার মধ্যে অন্যতম।
শ্রীলঙ্কা
করোনাভাইরাস মহামারীর প্রকোপ কমে যাওয়া ও লকডাউনের মতো কঠোর স্বাস্থ্যবিধি তুলে দেওয়ায় বিরাজমান অর্থনৈতিক মন্দা এ বছর কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আশা করেছিল শ্রীলঙ্কা। তবে বছরের শুরুতেই রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ সেই আশা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি মুদ্রার ঘাটতি শ্রীলঙ্কার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে সংকটে ফেলেছে। রাশিয়ার আগ্রাসনের জবাবে দেশটির ওপর পশ্চিমারা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়ে যায়। এ অবস্থায় জ্বালানি কিনতে ভারত থেকে নেওয়া শ্রীলঙ্কার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অপর্যাপ্ত বলে মনে করা হচ্ছে। পর্যটন খাতেও বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। ২০১৯ সালে ইস্টার সানডের দিন দেশটির ছয়টি গির্জা ও বিলাসবহুল হোটেল লক্ষ্য করে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও পরের বছর করোনাভাইরাসের আঘাত কলম্বোর পর্যটনশিল্পে ধস নামায়। রাশিয়া থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক পায় শ্রীলঙ্কা। যুদ্ধের কারণে এটি এখন বন্ধ। শ্রীলঙ্কার চায়ের অন্যতম প্রধান ক্রেতা রাশিয়া। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ায় চা রপ্তানি অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন শ্রীলঙ্কার নীতিনির্ধারকরা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট বা সমর্থন দিয়ে দেশটির বিরাগভাজন হতে চায়নি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কা।
নেপাল
দুই শক্তিশালী দেশ চীন ও ভারতের মাঝে চাপে রয়েছে হিমালয়ের ছোট দেশ নেপাল। চীন ও ভারত উভয়ই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়ার বিপক্ষে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়ার বিপক্ষে তোলা প্রস্তাবে নেপালের সমর্থন ভূ-রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কাঠমান্ডুর সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক ২০২০ সালে নাজুক হয়ে পড়ে যখন নতুন মানচিত্র করে ভারত। কাঠমান্ডুর দাবি, ওই মানচিত্রে নেপালের অংশ ভারতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাশিয়ার বিপক্ষে আনা প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেপালের প্রতিনিধি অমৃত রাই জানান, সার্বভৌম কোনো দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক সংহতির বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি বা শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করে তার দেশ। জাতিসংঘে রাশিয়ার বিপক্ষে কেন নেপাল অবস্থান নেয়, তা দেশটির সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে তাকালে বোঝা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান নিয়ে কয়েক মাস ধরে উত্তপ্ত নেপালের রাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির পার্লামেন্টে সম্প্রতি ওই অনুদান অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হলে বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা অনুদানের বিপক্ষে দাঁড়ান। অনুদানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পার্লামেন্টের বাইরেও। রাজধানী শহর কাঠমান্ডুর বিভিন্ন স্থান যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। নেপালের ক্ষমতাসীন জোট সরকারভুক্ত দুটি কমিউনিস্ট পার্টি যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানের বিরোধী। পার্টি দুটির ভাষ্য, অনুদানের চুক্তিতে যেসব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সেসব হিমালয়ের দেশটির সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। এই অনুদান ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ। নেপালের বন্ধুরাষ্ট্র চীনকে বেকায়দায় ফেলতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান গ্রহণ করা হলে মার্কিন সেনাদের নেপালে ঘাঁটি করার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের (এমসিসি) নেপালে দিতে চাওয়া অনুদান সম্পর্কে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের দাবি, নেপালের উন্নয়নের জন্যই শুধু এই অনুদান দেওয়া হচ্ছে। অনুদানের অর্থ নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপন ও সড়কের উন্নতিসাধনে ব্যবহার করা হবে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান নিতে আগ্রহী। বিরোধী পক্ষ বলছে, মার্কিন অনুদান নিলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শিবিরে যোগ দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেপালকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, অনুদানের অর্থ না নিলে নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হবে। মার্কিন সাহায্য গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে অনুদান অনুমোদনের পক্ষে ভোট দেয় নেপাল পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য। চীনের ভাষ্য, নিজের স্বার্থ হাসিল করতে জবরদস্তিমূলক কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জাতিসংঘে উত্থাপিত প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়ে রাশিয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয় নেপাল।
ভুটান, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান
কয়েক বছর ধরে পররাষ্ট্রনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান নিতে দেখা গেছে দেশটিকে। এরই অংশ হিসেবে জাতিসংঘে উত্থাপিত প্রস্তাবে সমর্থন দিয়ে রাশিয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয় ভুটান। ভৌগোলিকভাবে নেপালের মতোই দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি চীন ও ভারতের মধ্যে স্যান্ডউইচ হওয়া ছোট্ট দেশ ভুটানের মূলনীতি, কোনোভাবেই ওই দুই পরাশক্তির চলমান দ্বন্দ্বে পড়া যাবে না। রাশিয়ার আগ্রাসনের সমালোচনা করে দ্য ভুটানিজ পত্রিকার সম্পাদক তেনজিং লামসাং টুইট বার্তায় বলেন, ‘রাশিয়ার নিরাপত্তাহীনতা-সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক যুক্তি মেনে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, অপছন্দ করা বা ঝগড়া-বিবাদ থাকা প্রতিবেশীর বাড়িতে হামলা করা জায়েজ। আপনি যদি শক্তিশালী হন ও নিরাপত্তাহীনতায় (বাস্তব বা কাল্পনিক) ভোগেন, তাহলে আপনি আপনার প্রতিবেশী ছোট দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর চড়াও হতে পারবেন-ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর পেছনে রাশিয়ার যুক্তি এমনই, যা সমর্থনযোগ্য নয়।’
মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা ইয়ামিনের নেতৃত্বাধীন সরকারের মধ্যে বিভিন্ন সময় চীনপ্রীতি দেখা যায়। ইয়ামিনের উত্তরসূরি ইব্রাহিম মোহাম্মেদ সলিহ অবশ্য ক্ষমতায় এসে পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকারে রাখেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে মালদ্বীপ। সলিহ সরকারের নীতির অংশ হিসেবে জাতিসংঘে উত্থাপিত প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়ে চীনের বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয় মালদ্বীপ। মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লা শহিদ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট। গত সপ্তাহে রাজধানী মালে শহরে আঞ্চলিক এক বৈঠকে মালদ্বীপের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারিয়া ডিডি বলেছিলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়ে বড় সংঘাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। এই যুদ্ধ পরিহার করে আঞ্চলিক অংশীদারদের আরও ঘনিষ্ঠ হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। একই সঙ্গে আমাদের সীমান্তের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও দরকার।’
গত বছরের আগস্টে পশ্চিমা মদদপুষ্ট সরকার উৎখাত করে ক্ষমতায় বসার পর এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়নি আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। স্বীকৃতি না পেলেও ২ মার্চ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের জরুরি সভায় উপস্থিত ছিল তালেবান সরকারের প্রতিনিধি। রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে তৈরি করা প্রস্তাবে সেদিন সমর্থন জানায় আফগানিস্তান। তালেবান সরকার ও আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ মনে করছেন, দেশটিতে চলমান ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন। তাই রাশিয়ার আগ্রাসন দ্রুত বন্ধ হওয়া তাদের জন্য জরুরি।
