বর্তমানে পুঁজিবাজারে যে লেনদেন হয়, তার ৮০ শতাংশের বেশি হয় ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে। যদিও অন্যান্য দেশের পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকাই বেশি থাকে। কিন্তু নানা কারণে দেশের পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ অনেক কম। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীনির্ভর পুঁজিবাজারে প্রায়ই অস্থিরতা দেখা দেয়। গুজব ও নানা ঘটনা দ্রুত প্রভাব ফেলে বাজারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে নতুন করে বিনিয়োগের অনুরোধ জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। গতকাল বুধবার দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে এমন অনুরোধ জানিয়েছে এসইসি।
বর্তমান কমিশনের আমলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি গত ১০ অক্টোবর সর্বোচ্চ ৭৩৬৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়। সে সময় ডিএসইর গড় লেনদেনও দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এরপর থেকে অস্থিরতা শুরু হলে নিয়মিত দরপতনে পড়ে বাজার। আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে বড় ধরনের পতনের শঙ্কা তৈরি হয়। ভীতি আর গুজবে গত ৭ মার্চ সূচকটি নেমে আসে ৬৪৫৬ পয়েন্টে। পরদিন আরও বড় পতনের সম্ভাবনা তৈরি হলে শেয়ারের দরহ্রাসের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশে নামিয়ে এনে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামাল দেয় এসইসি। কিন্তু লেনদেন নেমে আসে হাজার কোটি টাকার নিচে। পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় পতনের শঙ্কার মধ্যেই লেনদেন হচ্ছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও কমেছে। দৈনিক লেনদেনের মাত্র ১০ শতাংশ হচ্ছে ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের। এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও ব্যক্তিশ্রেণির ডে- ট্রেডারের মতো। ফলে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা রয়েই গেছে। যদিও অনেক ব্যাংক আইনি সীমার মধ্যে বিনিয়োগ সুযোগ থাকলেও তা করছে না। এমনকি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ২০০ কোটি টাকার যে বিশেষ তহবিল গঠন করতে বলা হয়েছে, তা করছে না অনেক ব্যাংক।
পুঁজিবাজারে নতুন করে বিনিয়োগের জন্য গতকাল এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মূখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম স্বাক্ষরিত এই চিঠি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে। পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সহায়তা দিতে ৬১টি ব্যাংককে বিদ্যমান সক্ষমতার মধ্য থেকে বিনিয়োগ করার অনুরোধ জানিয়েছে কমিশন। এসইসি মনে করে, আইনি সীমার মধ্য থেকেই পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
এসইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে, যা বিনিয়োগ সীমার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না। এছাড়া ব্যাংক কোম্পানি আইনে প্রতিটি ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ আছে। এই মূলধনের মধ্যে পরিশোধিত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম, স্ট্যাচুরি রিজার্ভ ও রিটেইন আর্নিংস অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু অনেক ব্যাংক বিনিয়োগ সীমা ও ২০০ কোটির বিশেষ তহবিলের থেকে অনেক কম বিনিয়োগ করেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত ২০০ কোটির বিশেষ তহবিল গঠনই করেনি। এই পরিস্থিতিতে ৩৩ ব্যাংককে বিনিয়োগ সীমা অনুযায়ী ও বিশেষ তহবিল থেকে বিনিয়োগের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এসইসি জানিয়েছে, বিশেষ তহবিল গঠনের নির্দেশনার দুই বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো ২৮টি ব্যাংক তহবিল গঠন করেনি। আর ৩৩টি ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠন করলেও অনেক ব্যাংক ২০০ কোটির চেয়ে কম তহবিল করেছে। এছাড়া অধিকাংশ ব্যাংক বিনিয়োগ সীমার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেনি।
এদিকে বাংলাদেশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ মার্চ পর্যন্ত ৩৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠন করেছে, যার পরিমাণ হচ্ছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, যার মধ্যে আবার ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ গেছে বেক্সিমকো গ্রিন সুকুকে।
যেসব ব্যাংক এখনো বিশেষ তহবিল গঠন করেনি সেগুলো হলো ব্র্যাক, ডাচ-বাংলা, বাংলাদেশ কমার্স, মধুমতি, ন্যাশনাল, পদ্মা, সীমান্ত, বেঙ্গল কমার্শিয়াল, আইসিবি ইসলামিক, স্ট্যান্ডার্ড, ব্যাংক আল-ফালাহ, সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, হাবীব ব্যাংক, এইচএসবিসি, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, উরি, অগ্রণী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বেসিক, রূপালী, সোনালী, বাংলাদেশ কৃষি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।
