পাবনা সদরের হিমায়েতপুর ইউনিয়নের পদ্মাপাড়ের গ্রাম চরভবানীপুর। একসময়ের দুর্গম গ্রামটিতে হয়েছে পাকা সড়ক, পৌঁছেছে বিদ্যুৎও। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বালুময় চরগুলো এক ফসলি থেকে হয়েছে দ্বিফসলি, কেউ ফলাচ্ছেন তিন ফসলও। উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে গেছে কৃষিনির্ভর গ্রামটির আর্থসামাজিক অবস্থাও। তবে সম্ভাবনার সে গল্পে হঠাৎই বাদ সেধেছে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প।
এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য শতাধিক কৃষকের জমি জোর করে দখলের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সহযোগিতায় ভুয়া কাগজ তৈরি করে এরই মধ্যে শত একরের বেশি কৃষিজমি দখলে নিয়েছে একটি চক্র। এমনকি সরকারি রাস্তা ও খাসজমির কাঁটাতার ঘিরে ঝোলানো হয়েছে সাইনবোর্ড। কৃষিজমিতে কিছু করতে হলে প্রশাসনের অনুমতি নেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাও মানেনি প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠানটি।
চরভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ২০১৭ সালে ভবানীপুর মৌজায় স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে ৭২ একর জমি কেনে ডায়নামিক সান এনার্জি নামে একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে না পারায় পরবর্তীকালে সেই জমি হস্তান্তর করে বাংলাদেশের প্যারামাউন্ট গ্রুপের কাছে। এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনায় প্যারামাউন্ট হোল্ডিংসের নামে জমি কিনতে শুরু করেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
অভিযোগ উঠেছে, প্যারামাউন্ট গ্রুপের জন্য জমির ব্যবস্থা করতে পাবনা সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন, হিমায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মালিথা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল বারী বাকীর সহায়তায় ফসলি জমি অকৃষি দেখিয়ে জোর করে দখলে নিতে শুরু করে একটি চক্র। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জাল দলিল তৈরি করে এরই মধ্যে শতাধিক কৃষকের জমি বিক্রি করেছে ভুয়া মালিকরা। এমনকি সরকারি রাস্তা ও খাসজমিও কাঁটাতারে ঘিরে ঝোলানো হয়েছে প্যারামাউন্ট হোল্ডিংসের সাইনবোর্ড।
এমন পরিস্থিতিতে উপার্জনের একমাত্র সম্বল হারানোর শঙ্কায় দিশেহারা চরভবানীপুর গ্রামের চাষিরা। গ্রামটির পল্লী চিকিৎসক মোশারফ বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্যারামাউন্ট হোল্ডিংসের ঘিরে নেওয়া জমির মধ্যে আমার ১১ বিঘা কৃষিজমি জোর করে নেওয়া হয়েছে। এসব সম্পত্তি আমার বাবা ও আমার নামে রেকর্ড করা। অথচ তারা আমার ফসলের জমিতে খুঁটি পুঁতে কাঁটাতারে ঘিরেছে। আমাদের জমিতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
গ্রামটির কৃষক আরমান আলী বলেন, ‘ভবানীপুর মৌজায় আমাদের তিন ভাইয়ের প্রায় পাঁচ বিঘা জমি রয়েছে। সেখানে আমরা কলা, ইরি ধান ও মসুর আবাদ করে খাই। হঠাৎ করেই কোম্পানির লোকেরা এসে বলে আমার জমি তারা আমার চাচাতো ভাই মকসেদ ব্যাপারীর কাছ থেকে কিনছে। জোর করেই তারা জমিগুলো কাঁটাতারে ঘিরে নিয়েছে। অথচ মকসেদ ব্যাপারী ২৮ বছর আগে মারা গেছে। তার মৃত্যু সনদ দেখানোর পরও তারা আমার জমি ছাড়েনি।’
একই গ্রামের আরেক কৃষক মো. আসলাম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মালিথা ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল বারী বাকীর মাস্তান বাহিনী আমাদের জমি জোর করে দখল করেছে। আমরা জমি বিক্রি করব না জানালে তারা বলেছে, তারা যে দাম দেবে সে দামেই জমি বিক্রি করতে হবে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আমাদের জমি জোর করেই তারা নিয়ে নেবে। আমরা নিরক্ষর মানুষ, কৃষিকাজ ছাড়া আমাদের কোনো কাজ জানা নেই। এ জমি চলে গেলে আমরা কী করে খাব?’ কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
দখলবাজদের প্রতাপের মুখে নিরুপায় হয়ে জমি দখল রোধে প্রতিকার কামনা করে পাবনার জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভবানীপুর গ্রামের কৃষকরা। আর খোঁজ নিয়ে ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কৃষকদের করা অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্যারামাউন্ট গ্রুপের জমি কেনা নিয়ে এলাকায় অস্থিরতার খবর পেয়ে আমি সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। আমি জানতাম না কৃষিজমিতে তারা সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। কৃষকদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। স্থানীয় চাষিরা তাদের জমি ছাড়তে চান না। জমি কেনা নিয়ে বড় ধরনের ঘাপলাও হয়েছে। আমার মনে হয় প্যারামাউন্ট কর্র্তৃপক্ষকেও স্থানীয় কোনো চক্র বিভ্রান্ত করেছে। আমি আশা করব তারা কৃষিজমি নষ্ট না করে চরের পতিত জমিতে তাদের প্ল্যান্ট স্থাপন করবেন।’
এ জনপ্রতিনিধি আরও বলেন, ‘জমি বিক্রি নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ সমাধানের জন্য আমরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে একটি কমিটি করে দিয়েছি। তারা ব্যর্থ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কৃষিজমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্যারামাউন্ট গ্রুপের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার (আইনি পরামর্শক) অ্যাডভোকেট হরিপদ দেব বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করতে চরভবানীপুরে ৩০০ একর জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে প্যারামাউন্ট গ্রুপের। এর মধ্যে ৭২ একর জমি ডায়নামিক সান কোম্পানি আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। আমরা আরও ৭১ একর জমি কিনেছি। আইনগত প্রক্রিয়া মেনেই জমি কেনা হয়েছে। কাউকে জোর করে জমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ সত্য নয়। আর এগুলো কৃষিজমিও নয়, দাম বাড়ানোর জন্য স্থানীয় কৃষকরা সেখানে ফসল বুনেছে।’
শিল্প স্থাপনে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জমি কেনার পর প্রকল্প স্থাপনের অনুমোদন পেলে জেলা প্রশাসনকে জানানো হবে।’
কৃষকের জমি দখলে সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাবনা সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, ‘এলাকার উন্নয়ন ও স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থানের স্বার্থে প্যারামাউন্ট গ্রুপকে জমি কিনতে আমরা সহযোগিতা করেছিলাম। এখানে কাউকে জোর-জবরদস্তি করা হয়নি। তিন বছর ধরে যারা স্বেচ্ছায় জমি বিক্রি করেছে তাদের জমিই নেওয়া হয়েছে। জমি রেজিস্ট্রিতেও অনিয়ম হয়নি। এরপরও সংসদ সদস্য যেহেতু কমিটি করে দিয়েছেন, আমরা বিষয়টি দেখব।’
এ প্রসঙ্গে পাবনার জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষিজমিতে কোনো কিছু করতে হলে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। প্যারামাউন্ট গ্রুপ জমি কেনার বিষয়ে প্রশাসনকে অবহিত করেনি। এ ব্যাপারে সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার ভূমিকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। অনিয়ম হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
