পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন শুরু করার এক মাস পরে এসেও ইউক্রেনকে পরাস্ত করতে এবং জেলেনস্কি সরকারকে উৎখাত করে দেশটির রাজধানী কিয়েভে একটি রুশপন্থী পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে পারেনি রাশিয়া।
রাশিয়ার পরিকল্পনা ছিল ইউক্রেনের প্রধান শহরগুলোকে একযোগে বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে দখল করে নেওয়ার। রাশিয়ার ধারণা ছিল যে, ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ বিশৃঙ্খল এবং হালকা হবে। এবং কয়েকদিনের মধ্যেই রুশ সেনারা রাজধানী কিয়েভ সহ পুরো দেশ দখল করে নিতে পারবে।
কিন্তু তার পরিবর্তে ইউক্রেনীয় নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবক ও রিজার্ভ বাহিনী মিলে সুশৃঙ্খল এবং তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আর প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সহ ইউক্রেনের জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ের প্রধান নেতাদের হত্যা বা অপহরণ করার প্রচেষ্টাতেও ব্যর্থ হয়েছে রাশিয়া।
অভিযানের প্রথম মাসজুড়ে রাশিয়ান সৈন্যদের মনোবলও সাধারণভাবে কম ছিল এবং রাশিয়ার বিভিন্ন বাহিনী তথা বিমান, স্থল ও নৌ বাহিনীগুলোর মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় খুবই দুর্বল ছিল।
এই ব্যর্থতার ফলস্বরূপ রাশিয়ান বাহিনী উত্তরে কিয়েভ, উত্তর পূর্বে খারকিভ ও সুমির চারপাশে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে মাইকোলাইভ শহরের আশেপাশে মাত্র অল্প কিছু এলাকা দখল করতে পেরেছে।
এর চেয়ে বরং রাশিয়া পূর্বে ডনবাসে এবং দক্ষিণ-পূর্বে মেলিটোপোল ও মারিওপোলের আশেপাশে আরও বেশি সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত বোমাবর্ষণ এবং সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আক্রমণ সত্ত্বেও তারা এখনও মারিওপোল দখল করতে পারেনি।
এই সীমিত অর্জনের বিনিময়ে রাশিয়া বিপুল পরিমাণ যুদ্ধ-সরঞ্জাম হারিয়েছে। রাশিয়া ১৭০০টিরও বেশি যুদ্ধ যান হারিয়েছে; যার মধ্যে ২৭০টিরও বেশি প্রধান যুদ্ধ ট্যাঙ্ক, ১৫টি ফিক্সড-উইং বিমান এবং ৩৫টি হেলিকপ্টার রয়েছে। রুশ সেনাদের হতাহতের সংখ্যা নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন। তবে ন্যাটো কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন বলছে রাশিয়া ৭ থেকে ১৫ হাজার সেনাকে হারিয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ১৫-২৫ হাজার রুশ সেনা বন্দী, আহত বা নিখোঁজ হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩০-৪০ হাজার সৈন্যকে হারিয়েছে রাশিয়া।
রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান যাই হোক না কেন তা এখনো সব পক্ষের কাছেই অজানা। তবে, মার্কিন কর্মকর্তাদের অনুমান, রাশিয়ান সেনাবাহিনী ২৪ ফেব্রুয়ারী ইউক্রেনে আক্রমণের আগের আট মাসে ইউক্রেনের সীমান্তে ১ লাখ ৯০ হাজার সেনার যে শক্তিশালী বাহিনী জড়ো করেছিল রাশিয়া তার ১০ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে।
রাশিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা হল রসদ সরবরাহে ব্যর্থতা। কিয়েভ, খারকিভ, ডনবাস, মারিওপোল এবং মাইকোলাইভ/ক্রিভি রিহ এর চারপাশে যুদ্ধরত রুশ সেনাদলগুলোকে পর্যাপ্ত খাদ্য, জ্বালানি, গোলাবারুদ এবং ওষুধ সরবরাহ করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে রাশিয়া।
ফলস্বরূপ, রাশিয়ান সৈন্যরা পদ্ধতিগতভাবে তাদের যানবাহন এবং সরঞ্জাম ফেলে পালিয়ে গেছে। রুশ সেনাদের ৮০০ টিরও বেশি যুদ্ধযান হয় পরিত্যক্ত হওয়ার পর ধ্বংস করা হয়েছে অথবা ইউক্রেনীয় সেনাদের দখলে চলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যগুলো থেকে জানা যায় যে, মাইকোলাইভের আশেপাশে এবং কিয়েভ ও খারকিভের কাছে উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে তুষারপাতের পর পর্যাপ্ত গরম পোশাকের অভাবে রুশ সেনারা ঠাণ্ডায় জমে গিয়েছিল। এছাড়া সরবরাহ লাইনের ওপর ক্রমাগত ইউক্রেনীয় হামলায় কমপক্ষে ৫৫০টি সরবরাহ ট্রাকও হারিয়েছে রাশিয়ান সেনাবাহিনী।
এই বিপর্যয়ের ফলে, রাজধানী কিয়েভ দখল করে সমগ্র ইউক্রেনকে পরাস্ত করার প্রচেষ্টার বদলে একটি ধারাবাহিক শহুরে অবরোধের কৌশল নিতে বাধ্য হয়েছে রাশিয়া।
যেহেতু রাশিয়ান বাহিনীর লজিস্টিক সিস্টেম এবং সাধারণ যুদ্ধ সক্ষমতা পুরো ইউক্রেনজুড়ে বিজয়ের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে সক্ষম নয়, তাই রাশিয়ান বাহিনী এখন শুধু ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল এবং মারিওপোল শহরের দিকে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করছে।
মূল বন্দর শহর মারিওপোল, সেইসঙ্গে খারকিভ, সুমি এবং চেরনিহিভে কয়েক সপ্তাহের বোমাবর্ষণও ইউক্রেনীয় বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে প্ররোচিত করতে ব্যর্থ হয়েছে রাশিয়া। এবং রাশিয়ান সৈন্যরা শহরগুলোতে ঢোকার চেষ্টা করে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হয়েছে। ফলে এবার রুশ সেনারা মারিওপোলের ওপর বোমাবর্ষণের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং শহরের খাবার ও পানির সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে শহরের বাসিন্দাদের ক্ষুধার্ত ও দূর্বল করার পর বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠিয়ে ধ্বংসাবশেষ দখল করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
মারিওপোল যুদ্ধের প্রথম দিকেই অবরুদ্ধ হয়েছিল। ফলে দীর্ঘ অবরোধ সহ্য করার জন্য শুকনো খাবার, ওষুধ এবং গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারেনি শহরের যোদ্ধারা। সেই হিসাবে শহরটি ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর অসাধারণ সাহসিকতা এবং স্থিতিস্থাপকতারও সাক্ষ্য দেয়। তারা এখনও, এক মাস পরেও, শহরের কেন্দ্রস্থলেই রাশিয়ান বাহিনীকে আটকে রেখেছে।
যাইহোক, রাশিয়া পণ করেছে যে, সর্বশক্তি দিয়ে হলেও আগে মারিওপোল দখল করতে হবে। কারণ এর মাধ্যমেই তারা প্রথম বড় জয় পাবে এবং তারপরে তাদের বাহিনী এবং রসদ অন্যত্র পাঠাতে পারবে। এরপর ডনবাস এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে খারকিভের দিকে যাবে রুশ অভিযান।
১৯৯০-র দশকে গ্রোজনি, চেচনিয়া এবং ২০১০-র দশকের মাঝামাঝি সিরিয়ার হোমস এবং আলেপ্পোতে রাশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণ হয় যে, কোনো শহর দখল করার জন্য ক্রমাগত অবরোধ একটি নৃশংস কিন্তু কার্যকর উপায়। এতে জনগণের মধ্যে স্থায়ী ঘৃণাও সৃষ্টি হয়। আর পুরো জনসংখ্যাকে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত বা হত্যা না করা পর্যন্ত বিজিত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সাফল্য অসম্ভব করে তোলে।
তবুও এই নতুন রুশ কৌশল ইউক্রেনকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সুদৃঢ় রুশ অবস্থানের বিরুদ্ধে বড় পাল্টা আক্রমণ চালানোর জন্য ইউক্রেনীয় বাহিনীর ভারী সজ্জিত এবং সাঁজোয়া বাহিনীর অভাব রয়েছে। ইউক্রেন তার নিজস্ব হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম রাখার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করছে। তবে নিঃসন্দেহে ইউক্রেনেরও কয়েক হাজার সৈন্য নিহত ও আহত হয়েছে। কমপক্ষে ৫০০টি যুদ্ধ যান ধ্বংস হয়েছে। এই ক্ষয়-ক্ষতি এবং ভারী আগ্নেয়াস্ত্র কম থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনীয়দের অবশ্যই দেশের সেসব অঞ্চলেও রাশিয়ার অগ্রবর্তী অবস্থানের উপর চাপ বজায় রাখতে হবে, যেসব অঞ্চলে রুশ সেনারা গতি হারিয়েছে।
যদি তারা রুশ ফ্রন্ট-লাইন ইউনিটগুলোকে বাইপাস করতে পারে এবং অসংখ্য অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইলে সজ্জিত হালকা পদাতিক বাহিনী দিয়ে তাদের সরবরাহ রুটগুলো কেটে ফেলতে পারে, তাহলে তারা হয় সেই ইউনিটগুলোকে তাদের শুরুর অবস্থানের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য করতে পারবে বা রাশিয়াকে মারিওপোল এবং ডনবাসের উপর পূর্ণশক্তি নিয়ে মনোনিবেশ করার চেষ্টা থেকে বিরত রাখতে পারবে। কারণ রাশিয়াকে তখন তার হুমকিতে পড়ে যাওয়া অন্যান্য অবস্থানগুলোকেও শক্তিশালী করার জন্য মনোযোগ দিতে হবে।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ-পশ্চিমে মাইকোলাইভ এবং উত্তর-পশ্চিমে মাকারিভ-এ সফলভাবে স্থানীয় পাল্টা-আক্রমণ ইঙ্গিত দেয় যে ইউক্রেন এখন ঠিক এটাই করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন ফ্রন্টে একসঙ্গে মনোযোগ দিতে বাধ্য করে রুশ সেনাদের দূর্বল করার চেষ্টা করছে ইউক্রেন।
আরও পড়ুন...
