টিপু হত্যার শ্যুটার পুলিশের হাতে!

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২২, ০১:৩৫ পিএম

মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। এরা হলো- মাহবুব, সাগর ও পল্ট্রি ফারুক ওরফে পল্ট্রি রিপন। গতকাল শনিবার এই তিনজনের মধ্যে একজনকে সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে এবং অন্য দু’জনকে রাজধানী ঢাকা থেকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। সাতক্ষীরা থেকে আটক করা যুবকই মূলত আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে শ্যুটার (গুলিবর্ষণকারী) হিসেবে অংশ নেয় বলে জানতে পেরেছে তদন্তকারীরা। এ ছাড়া এই হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে থাকা আরও দুই সন্ত্রাসীর নাম-পরিচয় পেয়েছে গোয়েন্দারা, যাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। টিপু হত্যার শ্যুটারকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটন ও নেপথ্য কুশীলবদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা টিপু এবং কলেজছাত্রী প্রীতি হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারা আছে, তাদের খুঁজে বের করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টিপু হত্যাকাণ্ডে সংঘবদ্ধ একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ অংশ নেয়। তারা মূলত ভাড়াটে খুনি। মতিঝিল এলাকার বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠভাজন তারা। এ ছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিকেরও ঘনিষ্ঠ। এরা মূলত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ক্যাডার বাহিনী হিসেবে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে থাকে। এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের ব্যবহার করা হয়। এদের মতো অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী রয়েছে মতিঝিল এলাকায়।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, টিপু হত্যার শ্যুটার যুবক ২০১৬ সালে মতিঝিল এলাকায় যুবলীগ নেতা রিজভী হাসান বাবু ওরফে বোচা বাবু খুনের ঘটনাতেও জড়িত ছিল। বোচা বাবু হত্যা মামলায় ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে এই যুবকের নামও ছিল। বোচা বাবুর বাবা নিহত টিপুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। সম্প্রতি ওই মামলা নিয়ে টিপুর সঙ্গে একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার বিরোধ তৈরি হয়। তিনি ওই মামলা থেকে এক আসামির নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেন। তবে এতে বাদ সাধেন টিপু। বিষয়টি নিয়ে ওই নেতা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিকের সঙ্গে কথা বলেন। পরে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা টিপুকে ফোন করে ওই নেতার সুপারিশ অনুযায়ী নাম বাদ দিতে বলে। তবে কারও কথাই রাখেননি টিপু। উল্টো মামলা চালাতে বোচা বাবুর পরিবারকে সহযোগিতা করেন। আর এসবই টিপুর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।


 
গতকাল তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আধিপত্যের দ্বন্দ্বেই জাহিদুল ইসলাম টিপুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে টিপুর প্রতিপক্ষ হিসেবে ডজনখানেক ব্যক্তিকে সন্দেহভাজনের তালিকায় রেখে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এসব সন্দেহভাজনের মধ্যে কারাবন্দি ঢাকা মহানগর যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার নাম এসেছে। এ ছাড়া ক্রীড়া ভবনের টেন্ডার নিয়ে টিপুর সঙ্গে মতিঝিল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার সোহেলের দ্বন্দ্ব ছিল। তার ক্যাডার রিফাতের নামও সন্দেহভাজনদের তালিকায় রাখা হয়েছে। তাকেও পুলিশ খুঁজছে। শাহজাহানপুর, মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকার পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ ওরফে মানিকের সঙ্গে শাহরিয়ারের সুসম্পর্কের তথ্য পাওয়ায় পুলিশ তাদেরও নজরদারিতে রেখেছে। টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলি যে ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, একই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার স্ত্রী। এটি নিয়েও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য স্থানীয় এক কাউন্সিলরসহ একাধিক সরকারদলীয় নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। কার নির্দেশে,  কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা টিপু ও কলেজছাত্রী  প্রীতি  হত্যাকাণ্ডের তদন্তে  উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন একাধিক ব্যক্তিকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সন্দেহভাজন একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রকৃত অপরাধী রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এতে অধরা আসামিরা নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের শিকার জাহিদুল ইসলাম টিপু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার অনেক প্রতিপক্ষ রয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়াও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তার স্ত্রী একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, সেদিক থেকেও বেশ কয়েকজন প্রতিপক্ষ রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা।’ এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিবির মতিঝিল জোনাল টিমের উপ-কমিশনার (ডিসি) রিফাত রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কনক্লুসিভ কিছু পাইনি। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বলার মতো সময় হলে অবশ্যই জানাব।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাহিদুল ইসলাম টিপু দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলেও এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অনেকের সঙ্গেই বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এজিবি কলোনির ফুটপাতের দোকান দখল, ক্রীড়া পরিষদ ভবনের টেন্ডারবাণিজ্য ও  তার স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলির কাউন্সিলের পদ নিয়ে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার দ্বন্দ্ব অনেক দিন ধরেই চলছিল। প্রায় এক দশক আগে ২০১৩ সালে গুলশানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার এজাহারে টিপুর নাম ছিল। এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারেও ছিলেন তিনি। যদিও পুলিশের চার্জশিটে তার নাম আসেনি। টিপু খুনের তদন্তে এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে বলেও জানান তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ২০১৬ সালে এজিবি কলোনিতে টিপুর ঘনিষ্ঠ বোচা বাবুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই হত্যা মামলায় টিপুর পরামর্শে যাদের আসামি করা হয়েছিল, তারা সবাই জামিনে বাইরে আছে। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে তাদের সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এ ছাড়া এজিবি কলোনির সামনের সড়কে শতাধিক দোকানঘর নিয়ে টিপুর সঙ্গে যাদের দ্বন্দ্ব ছিল, তাদের বিষয়েও খোঁজখবর নিচ্ছে গোয়েন্দারা। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির নামে এসব দোকান বরাদ্দ করা হলেও নিয়ন্ত্রক ছিলেন জাহিদুল ইসলাম টিপু। সেখানে দোকান নিয়ে জাহিদুল একটি রেস্তোরাঁও  করেন। এ ছাড়া  ওই বাজারে জাহিদুলের একটি ওষুধের দোকানও রয়েছে।

মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আবদুল আহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা টিপু ও কলেজছাত্রী প্রীতি হত্যাকাণ্ডে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও কারণ উদ্ঘাটনের জন্য মাঠে একাধিক টিম কাজ করছে। আশা করছি খুব শিগগিরই এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এই মামলার তদন্তভার শাহজাহানপুর থানা পুলিশের কাছেই রয়েছে।

টিপু হত্যায় ‘নাটের গুরুদের’ বের করা হবেস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: জাহিদুল ইসলাম টিপু এবং কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতি হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারা আছে, তাদের খুঁজে বের করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘টিপু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। এর পেছনে কারা, নাটের গুরু কারা, কারা ঘটিয়েছে, সবকিছুই খোলসা করে আপনাদের (সাংবাদিক) মাধ্যমে দেশবাসীকে জানানো হবে।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কিলিং পলিটিক্যাল কি না, সেই বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে চাই না। আশা করি, খুব শিগগির এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারব। যারাই এ ঘটনায় জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

স্বাধীনতা দিবসে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পুলিশ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শনিবার সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে গিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে সাংবাদিকরা তাকে টিপু হত্যা নিয়ে প্রশ্ন করেন।

এর আগে শুক্রবারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছেন তা খুঁজে বের করা হবে। জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে শাহজাহানপুরের আমতলা এলাকায় অস্ত্রধারীর গুলিতে নিহত হন মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও ২৪ বছর বয়সী কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান জামাল প্রীতি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত