কন্যাশিশু অ্যাডভোক্যাসি ফোরামের প্রতিবেদন

‘এক বছরে ধর্ষণের শিকার ১৩১৭ কন্যাশিশু’

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২২, ০৮:৪৯ পিএম

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোক্যাসি ফোরাম জানিয়েছে, গত এক বছরে দেশে ১১৬ কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালে সারাদেশে ১ হাজার ১১৭ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ৭২৩ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় ১৫৫ শিশু। এ ছাড়া ২০০ প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

তারা জানায়, বেশির ভাগ নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে রাস্তায়, নিজের বাসায়, নিকট আত্মীয় ও গৃহকর্তার মাধ্যমে।

শিশু সুরক্ষায় একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠনের সুপারিশসহ কন্যাশিশু নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধের দাবি জানিয়েছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম।

রবিবার  জাতীয় প্রেস ক্লাবে আব্দুস সামাদ হলে ‘কন্যাশিশুর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন’ অনুষ্ঠানে এই তথ্য প্রকাশ করে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোক্যাসি ফোরাম।

যৌন হয়রানি ও নির্যাতন প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে ২০২০ সালে দেশে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৬২৬। এ হিসেবে এক বছরে দেশে কন্যাশিশু ধর্ষণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৪.৪৪ শতাংশ। ২০২১ সালে মোট ১১৬ কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে পাঁচজন বিশেষ শিশুও রয়েছে। ২০২০ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০৪। গত বছরের তুলনায় এ বছর যৌন হয়রানি বৃদ্ধির হার প্রায় ১২ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২১ সালে পর্নোগ্রাফির শিকার হয়েছে ৫২ কন্যাশিশু।

এসিড নিক্ষেপ সম্পর্কে জানানো হয়, ২০২১ সালে দেশে ১০ কন্যাশিশু এসিড আক্রমণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছেন ২০৬ কন্যাশিশু।

বাল্যবিবাহ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বছরে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ২ হাজার ৮৬৮ জন কন্যাশিশু। গড়ে প্রতিটি ইউনিয়নে ২১ কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি।

তারা জানায়, এ সময় ৮৭ কন্যাশিশুকে বাল্যবিবাহ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া এক বছরে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৭ কন্যাশিশু, এর মধ্যে যৌতুক দিতে না পারায় নয় কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে ২৪২ কন্যাশিশু আত্মহত্যা করেছে। প্রেমে প্রতারণার শিকার হয়ে ৬১ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে ৫৬ কন্যাশিশু আত্মহত্যা করেছে।

এ ছাড়া ২০২১ সালে ২৭২ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতিদিন সহস্রাধিক কন্যাশিশু পর্নোগ্রাফি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। এর মধ্যে গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন ভিকটিম সাইবার হয়রানি সম্পর্কিত অভিযোগ কেন্দ্রে মৌখিক ও লিখিতভাবে অভিযোগ দাখিল করে। প্রতিদিন ৩০টি অভিযোগ দাখিল হলে মাসে আনুমানিক ৯০০টি অভিযোগ জমা হয় বলে ধরে নেওয়া যায়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪টি জাতীয়, স্থানীয় ও অনলাইন দৈনিক পত্রিকা থেকে ৬ থেকে ১৯ বছর বয়সের কন্যাশিশুদের প্রতি নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৩টি ক্যাটাগরির আওতায় ৫৬টি সাব-ক্যাটাগরিতে এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোক্যাসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা কন্যাশিশু নির্যাতন বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছি। নির্যাতন বন্ধে সরকারসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ করে তা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে জনসেচতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছি। একইসঙ্গে সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছি।

 ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঞ্চালনায় প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, ব্র্যাকের নবনীতা চৌধুরী, গুডনেইবারস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মঈনুদ্দিন মাইনুল ও এডুকো বাংলাদেশের গোলাম কিবরিয়া প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে ১১টি সুপারিশ করা হয়।

১. শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সব ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।

২. উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নরোধে সর্বস্তরের জন্য ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ নামে একটি আইন জরুরিভিত্তিতে প্রণয়ন করতে হবে।

৩. ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা, মামলা ও ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট সবধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে, ঘটনার শিকার কন্যাশিশু ও নারীর পরিবর্তে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে ও আইনের আওতায় আনতে হবে। নারী ও শিশুকে অপদস্ত না করে অভিযুক্তের কাছে প্রমাণ চাইতে হবে যে, সে অপরাধী না। এ সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের বিধান সংশোধন করতে হবে।

৪. বর্তমান মহামারিতে বেশিরভাগ শিশুই ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভর। তাদের সুরক্ষিত রাখতে ও সুস্থ মানসিক বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় সব ধরনের পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধসহ পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।

৫.কন্যাশিশু নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

৬. শিশু সুরক্ষায় শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠন করতে হবে।

৭. করোনাকালে আর্থিক সংকটের কারণে অভিভাবকরা নাবালক কন্যাদের বিয়ে দিচ্ছে, এর ফলে বাল্যবিবাহ বহুগুণে বেড়ে গেছে। সোশ্যাল সেফটিনেটের বাজেট বৃদ্ধি করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কন্যাশিশু ও তাদের অভিভাবকদের এর আওতায় আনতে হবে।

৮. বাল্যবিবাহ বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে।

৯. নির্যাতন বন্ধে বিদ্যমান আইনসমূহের সঠিক ও কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে।

১০. ক্রমবর্ধমান কন্যাশিশু ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী-পুরুষ, সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, পরিবার সবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

১১. কন্যাশিশু ও নারীর প্রতি সবধরনের সহিংসতারোধে তরুণ-যুবসমাজকে সচেতনকরণ সাপেক্ষে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত করতে হবে, একইসঙ্গে আইন ও বিচারিক কাঠামোর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জেন্ডার সংবেদনশীল করে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত