মামলা থেকে অব্যাহতির শর্তে টিপু হত্যার চুক্তি

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২২, ০৭:০৮ এএম

রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান জামাল প্রীতি হত্যার শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আকাশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার পাঁচ দিন আগে টিপু হত্যার চুক্তি হয় আকাশের সঙ্গে। তবে ‘কাটআউট’ পদ্ধতিতে চুক্তি হওয়ার কারণে এর নেপথ্যে কারা তা অজানা বলে দাবি করেছেন আকাশ।

গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার শাহজাহানপুর এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপুকে হত্যা করা হয়। সে সময় নিহত হন রিকশা আরোহী কলেজছাত্রী প্রীতিও। পরদিন শুক্রবার টিপুর স্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম বাদী হয়ে শাহজাহানপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। সেদিনই রাতে ঢাকা থেকে একটি গাড়িতে করে জয়পুরহাটে যান আকাশ। সেখান থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি ‘ভারতে’ যেতে চেয়েছিলেন। তবে সেদিন যেতে না পেরে তিনি বগুড়ায় চলে আসেন। পরে যে গাড়িতে তিনি জয়পুরহাটে গিয়েছিলেন, সেই গাড়ির লোকজন ঢাকায় আসার পর তাদের নিয়ে বগুড়ায় যায় পুলিশ। পরে বগুড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।

গতকাল রবিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার এসব তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, জাহিদুল মতিঝিল এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। অনেকগুলো বিষয় এ হত্যার পেছনে রয়েছে। তবে পূর্বপরিকল্পিত এই হত্যার ‘মোটিভ’ এখনো জানা যায়নি। এ হত্যাকাণ্ডে আরও অনেকে জড়িত থাকতে পারে। বিশেষ এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীকে খোঁজা হচ্ছে।

৫ দিন আগে খুনের চুক্তি : সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার জানান, জাহিদুল ইসলাম টিপুকে হত্যার ঘটনার পাঁচ দিন আগে হত্যার চুক্তি হয় গ্রেপ্তার মাসুম মোহাম্মদ আকাশের সঙ্গে। কাট আউট পদ্ধতিতে তিনি চুক্তিবদ্ধ হন। আর হত্যার তিন দিন আগে টিপুর নাম পান। হত্যার জন্য মোটরসাইকেল ও গুলি ভরা পিস্তল সরবরাহ করা হয়।

ডিবিপ্রধান বলেন, বুধবার টিপু রেস্টুরেন্ট থেকে বাসার উদ্দেশ্যে বের হলে আকাশ রাস্তা অনুসরণ করে গুলি করার প্রস্তুতি নেন কিন্তু বেশি লোকজন থাকায় ব্যর্থ হন। ঘটনার দিন অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি টিপুর মালিকানাধীন গ্র্যান্ড সুলতান রেস্টুরেন্টে অবস্থান করে আকাশকে আপডেট দিতে থাকেন। এরপর গাড়ির চালককে নিয়ে বাসার দিকে ফেরার পথে শ্যুটার গুলি করে টিপুকে হত্যা করে। এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় তার আরও একজন সহযোগী ছিলেন, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া হত্যাকা-ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও অস্ত্রটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

টিপুকে হত্যাকাণ্ডে কত টাকার চুক্তি হয় জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, কত টাকার বিনিময়ে তা জানা যায়নি। তবে আকাশের এলাকায় বেশ কিছু মামলা রয়েছে, সেই মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য টিপুকে হত্যায় চুক্তিবদ্ধ হন তিনি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আকাশ স্বীকার করেছেন তার নামে ৪-৫টি মামলা আছে। এর মধ্যে একটি মার্ডার মামলাও আছে। এ কারণে তিনি সবসময় পালিয়ে থাকতেন। বাসায় স্ত্রী-কন্যা রয়েছে, স্কুলশিক্ষক বাবা আছেন, কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন না।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে হাফিজ আখতার বলেন, ‘আমাদের তথ্য-উপাত্ত, তদন্তে পাওয়া তথ্য, আগের দিনের সংগ্রহ করা তথ্য সব বলে দেয় আকাশই শ্যুটার ছিলেন টিপু হত্যায়। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন।’

ডিবির কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজধানীর গোড়ান এলাকায় আকাশের ডিশ ব্যবসা আছে। তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জড়িত থাকার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সংবাদ সম্মেলন শেষে ডিবির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আকাশের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার বাইশকানি গ্রামে। তার বাবার নাম মোবারক হোসেন। ঢাকায় পশ্চিম মাদারটেক এলাকার ৬০/১৫ নম্বর বাসায় থাকতেন। আকাশ ঢাকার মোহাম্মদপুর আর্ট কলেজ থেকে গ্রাফিক ডিজাইনে পড়াশোনা শেষ করেন। তিনি গোড়ান এলাকায় স্থানীয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ অন্তত পাঁচটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলায় তিনি কোনো হাজিরা দিতেন না। এত মামলা নিয়ে তিনি হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। এমন হতাশাজনক জীবন ও বিভিন্ন মামলা থেকে অব্যাহতির লোভ দেখিয়েই এ হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করা হয়েছিল তাকে।

যেভাবে ধরা আকাশ : ডিবির কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার পর থেকেই ডিবির মতিঝিল বিভাগের চারটি টিম ভাগ হয়ে তদন্তে নামে। ঘটনাস্থল থেকে তথ্য পেয়ে এই শুটারের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে শনাক্ত করেন। তারপর তাকে ধরার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। সর্বশেষ গতকা বেলা১১টার দিকে বগুড়া সদরের একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।

কর্মকর্তারা জানান, গুলি করার রাত থেকেই তার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। এরপর তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে তার গতিবিধির তথ্য আসতে থাকে ডিবির কাছে। গুলির ঘটনার পর সেখান থেকে পালিয়ে গোড়ানে এক ব্যক্তির কাছে অস্ত্র ও মোটরসাইকেল জমা দেন। তারপর তার দুজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একটি এলিয়েন গাড়িযোগে জয়পুরহাটে চলে যান। সেখান থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে না পেরে বগুড়া চলে যান। তাকে বড়গড়ায় নামিয়ে দিয়ে দুই বন্ধু ঢাকায় ফিরে আসার পর ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হন। তারপর ডিবির টিম তখনই ওই দুজনকে সঙ্গে নিয়ে বগুড়ার সদরের আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারের পর ডিবির কর্মকর্তাদের কাছে আকাশ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, স্যার আমারে কীভাবে ধরলেন! আমাকে তো ধরার কথা নয়। কারণ হিসেবে ডিবির কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, এ শ্যুটার কোনো মোবাইল ফোন কিংবা ইলেকট্রনিকস ডিভাইস ব্যবহার করেননি। যার কারণে তার বদ্ধমূল ধারণা ছিলÑ তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন।

২৩ মার্চের এজিবি কলোনিতে হত্যার চেষ্টা : ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে আকাশ জানিয়েছেন, ২৩ মার্চ রাতে এজিবি কলোনিতে টিপুকে হত্যার জন্য যান। কমলাপুর এলাকার একজনের কাছ থেকে মোটরসাইকেল ও অস্ত্র নিয়ে সেখানে গিয়ে হত্যার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। তবে লোকজন বেশি থাকায় ওই রাতে হত্যা না করে ফিরে যান। মোটরসাইকেল ও অস্ত্র জমা দিয়ে চলে যান। পরদিন আবারও অস্ত্র ও মোটরসাইকেলে চড়ে এজিবি কলোনি থেকে অনুসরণ করতে থাকেন টিপুর গাড়ি। তারপর শাহজাহানপুর আমতলা এলাকায় টিপুর গাড়ি যানজটে পড়লে সেখানে হেঁটে গিয়ে ১২ রাউন্ড গুলি করেন। প্রায় ৮০ থেকে ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে অস্ত্র ও মোটরসাইকেল গোড়ানে আরেক ব্যক্তির কাছে জমা দিয়ে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে জয়পুরহাট সীমান্ত এলাকায় চলে যান।

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারের পর ডিবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আকাশ নিজেই গুলি করার কথা স্বীকার করেছেন। তার কাছে যে পিস্তল ছিল, সেটিতে ছিল ১২ রাউন্ডের ম্যাগাজিন। ডান হাতে অস্ত্র চালিয়ে সব গুলি খরচ করেন। তবে তিনি প্রীতির গায়ে গুলি লাগার কথা জানতেন না।

এদিকে যিনি মোটরসাইকেল চালক ছিলেন তার নাম-পরিচয় সবই জানতে পেরেছে ডিবি। তবে গ্রেপ্তারের স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি।

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের জন্য এজিবি কলোনি, খিলগাঁও, গোড়ান ও শাহজাহানপুরের অন্তত ডজনখানেক ব্যক্তিকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন ডিবির কর্মকর্তারা। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে হত্যার মোটিভ সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। এমনকি এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা ‘নাটের গুরুদের’ শনাক্ত করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত