মার্কিন অনুদান নিয়ে নেপালের দ্বিধাবিভক্তি

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২২, ১০:৪৬ পিএম

অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ কোটি ডলারের অনুদান নিয়ে সম্প্রতি উত্তাল হয়ে ওঠে নেপালের রাজনীতি। চলে বিক্ষোভ-সমাবেশ। দেশের উন্নয়নে এই অনুদান ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে এক পক্ষ। আর বিরোধী পক্ষের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান

নেপাল সরকারকে বিভিন্ন খাতে সহায়তার লক্ষ্যে ৫০ কোটি ডলার অনুদান দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন এই অনুদান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তর্ক-বিতর্ক চলছে নেপালে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির পার্লামেন্টে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওই অনুদান অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হলে বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা অনুদানের বিপক্ষে স্লোগান দেন। অনুদানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পার্লামেন্টের বাইরেও। রাজধানী শহর কাঠমান্ডুর বিভিন্ন স্থান যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে হাজারো বিক্ষোভকারীর দফায় দফায় সংঘর্ষ বাধে। নেপালের ক্ষমতাসীন জোট সরকারভুক্ত দুটি কমিউনিস্ট পার্টি শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের ভাষ্য, অনুদানের চুক্তিতে যেসব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সেসব হিমালয়ের দেশটির সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ঘিরে ওয়াশিংটনের কৌশলের অংশ এই অনুদান। নেপালের বন্ধুরাষ্ট্র চীনকে বেকায়দায় ফেলতে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান গ্রহণ করা হলে মার্কিন সেনাদের নেপালে ঘাঁটি করার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের (এমসিসি) নেপালে দিতে চাওয়া অনুদান সম্পর্কে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের দাবি, নেপালের উন্নয়নের জন্যই কেবল এই অনুদান দেওয়া হচ্ছে। অনুদানের অর্থ নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপন ও সড়কের উন্নতিতে ব্যবহার করা হবে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান নিতে আগ্রহী। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরাজমান মতানৈক্য ও জনগণের বিক্ষোভের কারণে পার্লামেন্টে অনুদান অনুমোদন-সংক্রান্ত ভোটাভুটি স্থগিত রাখেন নেপালের আইনপ্রণেতারা। পরে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে মার্কিন সাহায্য গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে অনুদান অনুমোদনের পক্ষে ভোট দেন নেপাল পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য।

বিক্ষোভে উত্তাল

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, অনুদান নিয়ে ভুল তথ্য ছড়িয়ে নেপালিদের বিভ্রান্ত করছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, বাইরের দেশের হস্তক্ষেপের কারণে নেপালের পার্লামেন্টে অনুদানের অনুমোদন দেওয়া না হলে তা ওয়াশিংটনের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হবে। পাশাপাশি তা নেপালের জনগণেরও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে পার্লামেন্টে অনুদান-সংক্রান্ত চুক্তি অনুমোদন দিতে নেপাল সরকারকে অনুরোধ করে যুক্তরাষ্ট্র। নয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও নেপালের মধ্যকার সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হবে বলে হালকা হুমকিও দেওয়া হয় ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চান না নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। অনুদানের পক্ষে তার অবস্থান স্পষ্ট। তবে এ নিয়ে দেশে প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় তাকে। ক্ষমতাসীন জোটের কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী সেন্টার), কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালসহ (ইউনিফায়েড সোশ্যালিস্ট) আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানের ঘোরবিরোধী। ফেব্রুয়ারিতে এই দলগুলোর কর্মী-সমর্থকরা রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু করলে তাদের ওপর মারমুখী হয়ে ওঠে পুলিশ। বিক্ষোভে অংশ নেয় সাধারণ জনগণও। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়, ব্যবহার করা হয় জলকামান, চলে ব্যাপক লাঠিপেটা। কাঠমান্ডুতে পার্লামেন্ট ভবনের কাছে প্রায় তিন হাজার বিক্ষোভকারীকে সরানো হয়, আটক করা হয় বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান না নিতে হরতালেরও ডাক দেন তারা।

এমসিসি

২০০৪ সালে মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন (এমসিসি) নামে স্বাধীন দ্বিপক্ষীয় বিদেশি সাহায্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস। নিম্ন আয়ের দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যে কাজ করে এই দাতা সংস্থা। দেওয়া হয় বড় অঙ্কের অনুদান। কোন কোন নিম্ন ও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এমসিসির সহায়তা পাবে, তা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সেন্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত না হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ২০১৯ সালের এক হিসাব বলছে, প্রতিষ্ঠার পর ২৯টি দেশকে ১৩ বিলিয়ন ডলার অনুদান দেয় এমসিসি বোর্ড। এমসিসির অনুদান পেতে ইচ্ছুক নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে ২০টির মধ্যে কমপক্ষে ১০টি মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি থেকে শুরু করে শিশু স্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, রাজনৈতিক অধিকার চর্চার অঙ্গীকার এসব মানদণ্ডের মধ্যে রয়েছে। কৃষি ও সেচ, শিক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, ভূমি অধিকার, পানি সরবরাহ, পরিবহনসহ কয়েকটি খাতে সাধারণত এমসিসি অনুদান দিয়ে থাকে।

চুক্তি সই

দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল প্রথম দেশ যে এমসিসি নির্ধারিত ২০টি মানদণ্ডের মধ্যে ১৬টি পূরণে সক্ষম হয়। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটনে নেপালের ন্যাশনাল ন্যাচারাল রিসোর্সেস অ্যান্ড ফিসকেল কমিশনের যুগ্ম সচিব বৈকুণ্ঠ আরিয়াল ও এমসিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জোনাথন ন্যাশ নেপালের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জ্ঞানেন্দ্র বাহাদুর কারকি ও যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন সালিভেনের উপস্থিতিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে নেপাল সরকারকে ৫০ কোটি ডলার অনুদান দিতে রাজি হয় এমসিসি। ইতিহাসে এই প্রথম এত বড় অঙ্কের বৈদেশিক সাহায্য পায় নেপাল। চুক্তি অনুযায়ী, অনুদানের অর্থ লাপসিফেদি-গালছি-দামাউলি-সুনাওয়াল পাওয়ার করিডরে ৪০০ কিলোভোল্টের বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপন করার কাজে ব্যয় করা হবে। এ ছাড়া নেপালের সঙ্গে ভারতের বিদ্যুৎ সংযোগেও এমসিসির অনুদানের অর্থ ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি নেপালের পূর্ব-পশ্চিম মহাসড়কে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজে এমসিসির সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় আরও ১৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে।

পক্ষ-বিপক্ষ

বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল নেপালের অর্থনীতি। দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ আরও সহজলভ্য করা ও সরবরাহ খরচ কমানোর মধ্য দিয়ে অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল করা ও দারিদ্র্য কমানোর লক্ষ্যে নেপাল সরকারকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। তবে এই অনুদান নিয়ে চার বছর ধরে বিভক্ত নেপালের জনগণ। পার্লামেন্টের অনুমোদন আদায় করতে পারলে এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা এমসিসির প্রথম অনুদান। সম্প্রতি এমসিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফাতেমা সুমার ও তার সহকর্মী জোনাথন ব্রুকস চার দিনের সফরে কাঠমা-ু যান। তাদের সফরের উদ্দেশ্য ছিল, নেপালের সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষের রাজনীতিকদের সঙ্গে এমসিসির অনুদান নিয়ে আলোচনা করা। দ্রুত যেন নেপালের পার্লামেন্টে অনুদানের অনুমোদন দেওয়া হয়, তা নিয়ে আলোচনায় চাপ দেন ফাতেমা ও জোনাথন। এই দুই মার্কিনি এমন সময় নেপাল সফর করেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান স্বার্থ রক্ষা করবে কী করবে না, তা নিয়ে নেপালের বিভক্ত জনমত কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য নিয়ে পক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, এটি নেপালের উন্নয়নে বড় ধরনের সহযোগিতা করবে। আর বিপক্ষের যুক্তি, অনুদানের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করবে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের বৈশ্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন কৌশল বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ নেপাল। যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থার অনুদান নেপালের পার্লামেন্টের অনুমোদন পেলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে দুই ক্ষমতাধর প্রতিপক্ষ শক্তির উন্নয়নকাজ একই সঙ্গে চলবে। নেপালের জনগণের একটি অংশ মনে করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এমসিসির অনুদান চলমান সব সমস্যার সমাধান করবে। মূলত নেপালের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও নীতি উপদেষ্টারা এমনটি মনে করেন। তবে তারা বড় পরিসরে এমসিসির অনুদানের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক দেখছেন না বলে মনে করে বিরোধী পক্ষ। এই পক্ষ মনে করে, অসম সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি বৈষম্য বৃদ্ধিতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে এমসিসির অনুদানের মতো বড় অঙ্কের অনুদান। নেপালের সাত দশক দীর্ঘ বিদেশি সাহায্যনির্ভর উন্নয়ন বৈষম্য কমাতে তো পারেইনি বরং বৈষম্য যে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, এই দিকটি দেখেও দেখেন না অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা। শুধু তা-ই নয়, বিদেশি সাহায্যে দুর্নীতির সুযোগ থাকে বেশি। জনগণের অত্যন্ত ছোট একটি অংশ এর মাধ্যমে উপকৃত হয় কিন্তু বড় অংশের অর্থনৈতিক দুর্দশার লাঘব হয় না।

এ ছাড়া অনুদান সম্পর্কে অনেক সমালোচক মনে করছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও পরিকল্পনার অংশ, চুক্তিতে নেপালের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা নেপালকে চীন ও ভারতের মধ্যে বাফার জোন হিসেবে দেখত। এ কারণে নেপালের রাজা প্রয়াত পৃথ্বী নারায়ণ শাহ একবার দেশটিকে ‘দুটি পাথরের (ভারত ও চীন) মাঝে এক মিষ্টি আলু’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নেপালিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চিন্তা বা আবেগ থাকা অস্বাভাবিক নয়। দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির আশঙ্কা দেখলে তাদের বিচলিত হওয়া যৌক্তিক। যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানকে বিপজ্জনক মনে করার পাশাপাশি বিদেশি সাহায্যনির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভাব্য ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকটি তাই তারা দেখতে চাইছেন না।

সমালোচনার মুখে নেপালের অর্থমন্ত্রী জনার্দন শর্মা গত বছরের সেপ্টেম্বরে এমসিসির কাছে ১৭টি প্রশ্ন সংবলিত চিঠি পাঠান। নেপালের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে কি না, এমসিসি নেপালের আইন ও সংবিধান মেনে চলবে কি না, নেপালের সার্বভৌমত্বকে অবমূল্যায়ন করা হবে কি না, অনুদান যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ কি না, এই অনুদান অন্য দেশের সঙ্গে নেপালের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে কি না এসব প্রশ্ন ওই চিঠিতে ছিল। এ ছাড়া নেপালকে সহায়তার পেছনে এমসিসির স্বার্থ বা গোপন কোনো উদ্দেশ্য নেই এমন নিশ্চয়তাও চিঠিতে চাওয়া হয়। এমসিসিকে করা নেপাল সরকারের প্রশ্ন যথেষ্ট সরাসরি ও জোরালো হলেও সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা সুমারের জবাব ছিল অনেক বেশি কূটনৈতিক। এমসিসির অনুদান ঘিরে নেপালে বড় আকারে আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দাতা সংস্থাটির কাছে নেপাল সরকার কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করলেও তাদের পরোক্ষ জবাব হতাশ করে অনেক নেপালিকে।

এমসিসির অনুদান নিয়ে বিতর্ক মূলত সমসাময়িক বিশ্বে নেপালের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থান ঘিরে আবর্তিত হয় বেশি। বিদেশি সাহায্য ও উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতিও চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অনুদানের পেছনে কোনো স্বার্থ নেই এমনটা ভাবা বিবেচনাপ্রসূত হবে না বলে মনে করছেন বিপক্ষের বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, নেপালকে ওয়াশিংটনের অনুদান দিতে রাজি হওয়া অবশ্যই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান বিরোধ বা প্রতিযোগিতার অংশ। ‘সাহায্য করতেই আমরা এসেছি, অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই’ দাতা সংস্থাগুলোর এমন বক্তব্যে এখন কারও তেমন একটা আস্থা নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দাতাদের কর্মকাণ্ডের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নেপালের জনগণ। দেশটির বিদেশি সাহায্যের ইতিহাস বলে, কেবল গুটিকতক মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে অনুদান। অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, নেপালে ৫০ কোটি ডলারের অনুদান প্রকৃত অর্থে কাদের লাভবান করবে, সেদিকে এমসিসির নজর দেওয়া উচিত। বিশেষ করে প্রস্তাবিত অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ কি আসলেই দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখবে কি না, তা নিয়ে সংস্থাটির ভাবা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে নেপালিদের সন্দেহের আরেক কারণ হলো, উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফল মঙ্গল বয়ে আনেনি। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার এমসিসিকে দেশটির ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলের অংশ বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক গড়ে তুললে তা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা নেপালিদের একটি অংশের।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানের পক্ষের অংশের বক্তব্য, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পকে ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখা জরুরি নয়। নেপালের এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নয়ন দরকার। দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা শক্তিশালী করা হলে অদূর ভবিষ্যতে তা বাহ্যিক প্রভাব কমাতে সহযোগিতা করবে। কোনো দেশ দিনের পর দিন দরিদ্র থাকতে পারে না। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের অংশ নেপাল হয়ে থাকলে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন না অনুদানের পক্ষের বিশেষজ্ঞরা। কারণ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও এরই মধ্যে চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন কৌশল বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে স্বাক্ষর করেছে নেপাল। চীনের আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের অংশ হতে বাধা কোথায় এই প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কে বৈচিত্র্য আনতে ও নিজের স্বার্থে নেপালের চুক্তিবদ্ধ হতে সমস্যা দেখছেন না তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত