ঠাকুরগাঁওয়ে আরএস খতিয়ানের (সংশোধিত) ভূমি জরিপ ও নকশার কাজে অনিয়ম ও লাখ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে ভূমি নকশার কাজে আসা সার্ভেয়ারা প্রতি শতাংশ জমি হিসাবে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ আদায় করছেন। তবে প্রশাসন বলছে, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সদর উপজেলার জগন্নাথপুর মৌজার বাহাদুরপাড়ার বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, জমির নকশার কাজে দায়িত্বরতরা তার বসভিটার নকশা করতে এসে একটি টোকেন দিয়ে তাকে রাতে তাদের ভাড়া বাসায় দেখা করতে বলেন। শহরের শান্তিনগর এলাকায় শাহিনের বাড়িতে ভাড়া থাকেন জরিপ কাজে আসা বদর আমীন সেলিম মিয়া, দিপু, স্বপনসহ ছয়জন। ৫ শতাংশ জমি জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাতে সেলিম মিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি জানান, তার (আবুল কালাম) জমি খাস খতিয়ানভুক্ত, তাই ১৫ হাজার টাকা দিতে হবে। বাড়িমালিক শাহিনের মধ্যস্থতায় ৭ হাজার টাকায় রফাদফা হয়। পরে দেনা করে সেলিমকে ৭ হাজার টাকা দিই। তবে শাহিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন, কিন্তু কোনো ধরনের ঘুষ লেনদেনে তার সংশ্লিষ্টতা নেই।
শুধু আবুল কালাম আজাদই নন, শান্তিনগরের উৎপল চন্দ্র রায় ও তার বোন, আবদুর রাজ্জাক, সোবাহানসহ জগন্নাথপুর মৌজার অনেক জমিমালিক অভিযোগ করেন, জরিপের কাজে বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। আর এ অভিযোগ মৌজাটিতে জরিপের কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রায় সবকটি গ্রুপের বিরুদ্ধে।
সদর উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০৭-০৮ সালে উপজেলার জগন্নাথপুর মৌজায় পাঁচটি অংশের নকশা জরিপের কাজ শুরু হয়। তিনটি অংশের কাজ শেষ হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। এ বছরের মার্চে ওই মৌজার ২০৪৪টি দাগের ৯৩৭ একর জমি জরিপের কাজ শুরু হয়। সর্দার আমিন, বদর আমিন এবং চেইনম্যানসহ প্রতি গ্রুপে তিনজন করে মোট ২৮টি গ্রুপ এ কাজ সম্পাদনে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে।
নিয়ম অনুযায়ী জমিমালিকের মালিকানার কাগজপত্র ও দখল প্রদর্শন সাপেক্ষে জমি তার নামের রেকর্ড হবে। কিন্তু মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমিও দখলদারদের নামে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, প্রতি শতাংশ জমির জন্য এক হাজার টাকা এবং যেসব জমির মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্রে অসংগতি রয়েছে তার জন্য শতাংশে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হচ্ছে। এজন্য প্রতিটি গ্রুপে রয়েছে একাধিক দালালচক্র। সম্প্রতি ঘুষের টাকা ফেরতের দাবিতে শান্তিনগর এলাকায় জরিপ কর্মকর্তাদের ভাড়াবাসা (শাহিনের বাড়ি) ঘেরাও করে এলাকাবাসী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী বলেন, তার জমি রেকর্ডের জন্য সর্দার আমীন দিপু ও বদর আমীন স্বপন ৩ হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে চাপের মুখে তা ফেরত দিতে বাধ্য হন।
ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে সর্দার আমীন সেলিম, নজরুল ইসলাম, দিপু ও স্বপন বলেন, কাজের বিনিময়ে সন্তুষ্ট হয়ে কেউ খুশি করালে দোষের কিছু নেই। তাদের দাবি, কাগজপত্র দেখে তারা সঠিকভাবেই কাজ করছেন।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ভূমি জরিপে আসা কয়েকজনের বিরুদ্ধে টাকা দাবি করার অভিযোগ শুনেছি, তবে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। জরিপের আগে ওই মৌজায় স্থানীয়দের সতর্ক করে এবং জরিপের কাজে টাকা লেনদেন না করতে মাইকিং করা হয়েছে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহের মো. সামসুজ্জামান বলেন, আরএস খতিয়ানের ভূমি জরিপ ও নকশা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। জরিপ কাজে অর্থ নেওয়ার কোনো অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
