ধর্ম অবমাননার মামলায় আটক মুন্সীগঞ্জের গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ১৮ বিশিষ্ট নাগরিক। গতকাল বুধবার মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন ওই ১৮ বিশিষ্ট নাগরিক। তারা এ ঘটনাকে জাতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের মুক্তির দাবি জানিয়েছে বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চ, নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পর্ষদসহ বিভিন্ন সংগঠন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন অনেকে।
গত ২২ মার্চ মুন্সীগঞ্জ সদরের পঞ্চসার ইউনিয়নের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হৃদয় মন্ডলকে পুলিশ আটক করে। ওইদিন রাতে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. আসাদ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ এনে হৃদয় চন্দ্র ম-লের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা করেন। পরদিন ২৩ মার্চ পুলিশ ওই শিক্ষককে আদালতে পাঠায়। ওইদিনই আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠায়। গত ৪ এপ্রিল জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ওই শিক্ষকের জামিন আবেদন করা হয়। তবে আদালত জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে ১০ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য করে।
একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্কুল কর্র্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে প্রশাসনের এমন ভূমিকার কারণে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বত্রই। গতকাল নাসির উদ্দীন ইউসুফ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সৈয়দ হাসান ইমাম, অনুপম সেন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, সারোওয়ার আলী, আবেদ খান, সেলিনা হোসেন, লায়লা হাসান, আবদুস সেলিম, মফিদুল হক, শফি আহমেদ, শাহরিয়ার কবীর, মুনতাসীর মামুন, সারা যাকের, শিমূল ইউসুফ ও হারুণ হাবীবের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত করেছে, যা জাতির জন্য বহন করছে অশনিসংকেত। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও সাম্প্রদায়িক পাঠদানই আজকের এ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বলেও মনে করেন তারা। তারা অবিলম্বে হৃদয় মন্ডলের মুক্তির দাবি জানান।
বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি ইমরান সরকার রুমন ও সাধারণ সম্পাদক সুব্রত সরকার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘শুধু বিজ্ঞানের নানা বিষয় খোলামনে পড়ানোর জন্য একজন বিজ্ঞান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা বাংলাদেশের বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ গড়ে তোলার পথে একটি অশনিসংকেত।’
জানা গেছে, গত ২০ মার্চ দশম শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছিলেন শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডল। সে সময় প্রসঙ্গক্রমে ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের উত্তরও দেন তিনি। তখন বাণিজ্য শাখার শিক্ষার্থী জোনায়েদ আল একান্ত সেই আলোচনা মোবাইল ফোনে ধারণ করে। পরদিন শিক্ষার্থীরা ‘আপত্তিজনক কথাবার্তার’ অভিযোগ এনে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করে। প্রধান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে শোকজ করে তিন দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলেন। তবে ২২ মার্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বহিরাগতরা জোটবদ্ধ হয়ে শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আনিসুজ্জামান আনিস, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসিব সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মিনহাজ-উল-ইসলাম। তাদের উপস্থিতিতেই শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে সদর থানা হেফাজতে নিয়ে আসে পুলিশ।
সদর থানার ইন্সপেক্টর তদন্ত মো. রাজিব খান জানান, সে রাতেই (২২ মার্চ) বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. আসাদ বাদী হয়ে হৃদয় চন্দ্র ম-লের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ওই ঘটনার পর বিদ্যালয়ের পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। শ্রেণি ক্লাস চলছে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়টি আদালত দেখবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সহযোগিতা চাইলে আমরা তা করার চেষ্টা করব।
মুন্সীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি শহীদ-ই-হাসান তুহিন বলেন, আমরা যে অডিও ক্লিপ শুনেছি তাতে নির্দিষ্ট ধর্মীয় অবমাননার তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। যে শিক্ষার্থী গোপনে শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে শিক্ষকের আলাপচারিতা রেকর্ড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়েছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কাজেই শিক্ষার্থীকেও আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে রহস্য উদঘাটন করা উচিত।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট অজয় কুমার চক্রবর্তী বলেন, শ্রেণিকক্ষে পরিকল্পিতভাবে কয়েক শিক্ষার্থী তাকে ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করে। হৃদয় মণ্ডল সেসব প্রশ্নের বিজ্ঞানভিত্তিক জবাব দেন। তবে ছাত্ররা তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রেকর্ড করে।
রেকর্ডকারী শিক্ষার্থীও স্বীকার করেছে, তারই এক সহপাঠীর কথায় সে হৃদয় মণ্ডলের কথা রেকর্ড করে। সেটি ছড়িয়ে পড়লে ক্লাসের অন্য সহপাঠীরা তাদের বড়ভাইদের নিয়ে আন্দোলন শুরু করে।
