হাওর রক্ষায় মেঘনা অববাহিকার সমন্বিত পরিকল্পনা চাই

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২২, ০৯:১০ এএম

ড. মো. খালেকুজ্জামান, যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। এই পরিবেশ বিজ্ঞানী ও গবেষক উপকূলীয় ভূতত্ত্ব, টেকসই উন্নয়ন, পানি সম্পদ এবং জিআইএস বিশেষজ্ঞ। ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃনদী ব্যবস্থাপনা, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে তার অভিনিবেশ এবং প্রস্তাবনা যেমন প্রায়োগিক ও সংবেদনশীল, তেমনি তা  বৈজ্ঞানিকভাবে সিদ্ধ এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো।

পরিবেশ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার নানা বিষয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকা ও জার্নালে তার শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থ তিনটি : উজানে বাঁধ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৬), নদী ও পরিবেশ ভাবনা (ঘোড়াউত্রা প্রকাশন, ২০২০), Water Resources and Environment (Academic Press and Publishers Limited, 2020). হাওরে সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বিতর্ক, হাওরের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষাসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন ড. মো. খালেকুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে সবচেয়ে অনন্য ভৌগোলিক এলাকা হাওর ও সুন্দরবন অঞ্চল। হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে বঙ্গীয় বদ্বীপের সাগরসংগমে অবস্থিত সুন্দরবন যেমন পৃথিবীর বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল, তেমনি বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধ্যে অবস্থিত হাওর বাংলাদেশ তো বটেই পৃথিবীরই এক বিরল জল-প্রকৃতির দৃষ্টান্ত। হাওরের জল-ভূগোলের বৈশিষ্ট্য, জীববৈচিত্র্য এবং বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই।

ড. মো. খালেকুজ্জামান : হাওর অঞ্চল একটি অনন্য সাধারণ ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্টমণ্ডিত প্রতিবেশ, যেখানে বাংলাদেশ তো বটেই পৃথিবীর এক বিরল মিঠা পানির আধার অবস্থিত।  বর্ষাকালে ৭ জেলায় অবস্থিত ২৯৩টি হাওর একটি অখন্ড জলরাশিতে পরিণত হয়ে মিঠাপানির ‘সাগরে’ (হাওরে) পরিণত হয়। তখন এই হাওর বাংলাদেশের ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪০ প্রজাতির মাছের প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। এছাড়াও হাওরে ২০৬ প্রজাতির পাখি, ২০০ প্রজাতির গাছ, ৩৪ প্রজাতির রেপটাইল, ৩১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান মেলে। হাওরের জীববৈচিত্র্যের তুলনা শুধু সুন্দরবনের সঙ্গে করা যাবে। প্রতি বছর ৬০ হাজারের বেশি পরিযায়ী পাখি হাওরে অস্থায়ী আবাস গড়ে তোলে। সুন্দরবনের মতোই টাঙ্গুয়ার হাওর ইউনেস্কোর গুরুত্বপূর্ণ রামসার সাইট আর হাকালুকি হাওরটি এখন রামসার সাইট হিসেবে বিবেচনাধীন। অন্যদিকে, শুকনো মৌসুমে বোরো ধানের চাষ হাওরের মূল কৃষিভিত্তিক কর্মকান্ড হিসেবে গণ্য হয়। বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের ১৬ শতাংশই হাওর অঞ্চল থেকে আসে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার এক বড় অংশীদার হাওর অঞ্চল। তাই হাওর অঞ্চল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, সবজি উৎপাদন, দুগ্ধজাত পণ্য এবং মৎসচাষের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হাওরের ভূমি দেশের ভূ-গর্ভস্থ পানির বড় আধার। হাওরের জলাভূমির মাটি ধরন এবং জলজ উদ্ভিদের প্রাবল্যের কারণে তা বন্যার প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে এবং রাসায়নিক দূষণ শুষে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া ইতিহাসের বিবেচনায় এটাও সুবিদিত যে, হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অবারিত খোলা প্রান্তর মানুষের আত্মিক এবং মননশীল জীবন গঠন ও সংস্কৃতিচর্চায় ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা পালন করে আসছে।

দেশ রূপান্তর : বিশ্লেষকরা বলছেন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নানা অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকা-ের ফলস্বরূপ ইতিমধ্যেই হাওরের জল-প্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে। বিশেষত সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ জেলায় হাওরের ওপর ইটনা থেকে মিঠামইন হয়ে অষ্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের কারণে বর্ষায় পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আপনি কী মনে করেন?

ড. মো. খালেকুজ্জামান : ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণের আগে যথাযথ পরিবেশগত সমীক্ষা চালানো হয়নি। সড়কটি নির্মাণের আগে এক জনসভায় অন্য অনেকের সঙ্গে আমিও ছিলাম এবং স্থানীয় সাংসদের উপস্থিতিতে আমার বক্তব্যে এই সড়ক নির্মাণের বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু তখন হয়তো আমার কথা অনেকেই বুঝতে পারেননি। আসলে মূল বিষয়টি হলো, হাওরের জলপ্রকৃতি বুঝতে না পারা। হাওরের বৈশিষ্ট্য হলো জলের অবাধ প্রবাহ। এই সড়কের কারণে যে হাওরে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হবে সেটা আমার ধারণা ছিল। তাই আমি প্রস্তাব করেছিলাম, সড়ক যদি নির্মাণ করতেই হয় তাহলে যেন ৩০ কিলোমিটার এই সড়কের অন্তত ৩০ ভাগ জায়গা উঁচু সেতু বা উড়াল সড়ক আকারে বানিয়ে পানিপ্রবাহের সুযোগ রাখা হয়। কেননা, পানিপ্রবাহের পাশাপাশি হাওরের জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক চলাচল এবং হাওরের কৃষক, জেলে-মাঝিসহ স্থানীয় জনসাধারণের জন্যও সড়কটি এপার-ওপার করা জরুরি। এ বিষয়ে তখন একটি লিখিত প্রস্তাবও আমি দিয়েছিলাম। এছাড়া এই সড়কের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো হলো, এটি একা দাঁড়িয়ে থাকা এক সড়ক, এই সড়ক ব্যাপক অর্থে কোনো কানেকটিভিটি তৈরি করছে না। এটা তো বাজিতপুর কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গেও সংযুক্ত করছে না। তাই এই সড়ক নির্মাণের আবশ্যকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। 

দেশ রূপান্তর : এখন মন্ত্রিসভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে হাওরে আর এমন সড়ক নির্মাণ না করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা উড়ালসড়ক নির্মাণের। এছাড়া এই সড়কের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে একটি সমীক্ষা চালানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ড. মো. খালেকুজ্জামান : মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। সমীক্ষা চালানো জরুরি। দেরিতে হলেও এই উপলব্ধিকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি। আমি নিয়মিতই হাওরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি এবং সুযোগ পেলেই দেশে যাই। এই সড়কের প্রভাব সম্পর্কে হাওররক্ষা কর্মীরা আমাকে জানিয়েছেন যে, বর্ষাকালে এই সড়কের পূর্বপাশে পানির চাপ বেশি থাকে। পশ্চিম পাশের চেয়ে পূর্ব পাশের পানির উচ্চতাও বেশি থাকে। এ কারণে ঘাগড়াসহ আরও কিছু এলাকায় রাস্তাঘাটে ভাঙনও দেখা দিচ্ছে। এটা স্বাভাবিক। কারণ সড়কের পূর্ব দিকেই সিলেট অঞ্চল থেকে নেমে আসা পানির চাপ বেশি থাকে। একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, সড়কটি নির্মাণের মাত্র দুই বছর হয়েছে। আরও সময় গেলে, বড় বড় বন্যার তোড় দেখা দিলে এই সড়কের পরিবেশগত প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়বে।  

দেশ রূপান্তর : এখন হাওরে আরও উড়ালসড়ক নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে। আরেকদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ দাবি করছেন যে হাওরে প্রাকৃতিক কারণেই সাবমার্জিবল সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব নয়। তাহলে শুকনো মৌসুমে হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা কীরকম হতে পারে? আর বর্ষা এবং শুকনো দুই মৌসুমেই হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে নৌপথে চলাচল উন্নত করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয় না কেন?

ড. মো. খালেকুজ্জামান : আমি স্থলপথে যোগাযোগের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু এখানে দুটো বিষয় আছে। প্রথমত যেমন সড়কই হোক না কেন স্থলপথে সড়ক নির্মাণের আগে অবশ্যই যথাযথ পরিবেশগত সমীক্ষা হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, হাওর যেহেতু প্রাকৃতিকভাবেই বছরের লম্বা সময় ডুবে থাকা এক জলপ্রকৃতি তাই এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা দরকার। সাবমার্জিবল সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সমস্যা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা এই বিষয়ে গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি না কেন? খেয়াল করা দরকার হাওর অঞ্চলে থাকা বিপুল সংখ্যক নদ-নদী-বিল-জলাশয় এখন নাব্য হারাচ্ছে। এই নদ-নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনলে নৌপথেই হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগ যেমন সহজ হবে তেমনি সুলভও হবে। কেননা নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন দুটোতেই খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে নীতিনির্ধারকদের নৌপথের ব্যবহার বাড়ানো এবং এসব বিষয়ে গবেষণার জন্য বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত বলে মনে করি। 

দেশ রূপান্তর : আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, যে সময়টায় পাহাড়ি ঢলে হাওরের বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র ডুবে গেল, বিপুল ধান কাটার আগেই তলিয়ে গেল, সেই একই সময়ে করিমগঞ্জসহ হাওরের বিভিন্ন লোকালয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানির সংকট চলতে দেখা যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, দেশের অন্য অনেক এলাকার মতোই হাওরের আশপাশের অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। একজন জল-ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে এই সংকটকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

ড. মো. খালেকুজ্জামান : এখানে প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে যে হাওর বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল নয়, হাওর মেঘনা অববাহিকার এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এই মেঘনা অববাহিকা ভাটিতে বাংলাদেশ এবং উজানে ভারতজুড়ে বিস্তৃত। মেঘনা অববাহিকার প্রায় ৬০ শতাংশ ভূমি ভারতে আর বাকি ৪০ শতাংশ ভূমি বাংলাদেশে। একইভাবে মেঘনা অববাহিকার নদীগুলোর পানিপ্রবাহেরও ৫৬ শতাংশ ভারতে আর বাকি ৪৪ শতাংশ বাংলাদেশে। তবু বলতে হবে, আমাদের ভাগ্য ভালো যে মেঘনা অববাহিকার উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত। গঙ্গা অববাহিকার (পদ্মা) কিংবা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার (যমুনা) কিন্তু প্রায় ৯০ শতাংশই বাংলাদেশের সীমানার বাইরে ভারতে অবস্থিত। মেঘনা অববাহিকার এই হাওরের বাস্তবতাকে আমাদের জল ও ভূ-বিজ্ঞানের আলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে হবে। কেননা, উজানের বাস্তবতা এবং ভাটির বাস্তবতা দুটোই দুটোকে প্রভাবিত করে। তাই হাওরের সংকট সমাধান এবং যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাও হতে হবে মেঘনা অববাহিকার সামগ্রিক ও বাস্তব সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে।

এজন্য, হাওর রক্ষায় আমাদের ভারতকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। যাতে তারা যত্রতত্র বাঁধ না দেয়, পানি সরিয়ে নিয়ে না যায় কিংবা উজানে যাতে কল-কারখানার রাসায়নিক দূষণ, নদীদূষণ না করে। ২০১৭ সালের বন্যায় আমরা দেখেছি হাওরে মাছের ব্যাপক মড়ক হয়েছিল। সেটা হয়েছিল উজান থেকে ধেয়ে আসা রাসায়নিক বর্জ্যরে কারণে। ফলে এই কাজগুলো আমাদের সমন্বিতভাবে করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ভূ-গর্ভস্থ পানির সংকটের যে কথা সামনে আসছে তার কারণ বোঝা জরুরি। জনসংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে যে বিপুল পানি প্রয়োজন হচ্ছে আমরা কিন্তু সেটা ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস থেকে আর মেটাতে পারছি না। অর্থাৎ, নদ-নদী-পুকুর-জলাধার কমে যাওয়া এবং যতটুকু আছে ততটুকুর পানিতে উচ্চমাত্রার দূষণের কারণে আমরা আরও বেশি করে ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে আনছি। আরেকটা বড় সমস্যা হলো ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল সেচব্যবস্থা দিন দিন বাড়তে থাকা। এসব কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানি রিচার্জ হওয়া বা পুনরায় ভূগর্ভে পানি জমার সময় পাচ্ছে না। এ কারণেই বাংলাদেশের অন্য অনেক এলাকার মতোই হাওরাঞ্চলেও এখন ভূ-গর্ভস্থ পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।          

দেশ রূপান্তর : দুই দশক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ যা ২০১৬ সাল থেকে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর’ নামে পুনর্গঠিত হয়েছে। হাওর মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এখন অধিদপ্তরের ৩৬টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। হাওর মহাপরিকল্পনা তাহলে আমাদের কতটা কাজে লাগছে?

ড. মো. খালেকুজ্জামান : হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের তেমন কোনো ক্ষমতা আছে বলে আমি মনে করি না। যে হাওর মহাপরিকল্পনা হয়েছে সেটা আবার ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ এর সঙ্গেও যুক্ত। হাওর মহাপরিকল্পনায় কিন্তু ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়কের কিংবা এরকম কোনো সড়কের প্রস্তাব ছিল না। তাহলে এটা হলো কীসের ভিত্তিতে? আসলে দেখুন, এখন আমরা পরিকল্পনা ও উন্নয়নের যে মডেল অনুসরণ করছি এটা প্রকল্পভিত্তিক, সামগ্রিক নয়। ফলে এক প্রকল্পের সঙ্গে আরেক প্রকল্পের সমন্বয় নেই। আবার এক প্রকল্পের কারণে আরেক প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : আপনি বলছিলেন, হাওর রক্ষায় মেঘনা অববাহিকা নিয়ে সামগ্রিক এবং একটি সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। উজান এবং ভাটির পরস্পরের প্রতি নির্ভরতার কথাও বলছিলেন। উজানের দূষণ, অতিরিক্ত পানির ঢল আমরা সহজেই বুঝি। কিন্তু ভাটির সংকট কীভাবে উজানের সংকট তৈরি করতে পারে সেটা একটু ব্যাখ্যা করুন।

ড. মো. খালেকুজ্জামান : গুগল ম্যাপসে আমরা রাস্তায় যানজটের লাল-হলুদ-সবুজ রঙ দেখে বুঝি যে, কোথায় কতটুকু জট আছে। তেমনি আমরা বলি ওয়াটার বাজেট। এখন উজান থেকে যে পানি নেমে আসে সেটা নামার জন্য রাস্তা যদি পরিষ্কার না থাকে তাহলে তো উজান প্লাবিত হবে এবং সেই চাপ ভাটিতে ভাঙন ধরাবে। আমাদের দেশের ভেতরের নদ-নদীর নব্য কমে যাওয়া, চ্যানেলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেও দিন দিন বন্যা বাড়ছে। আমি নিজে হাওরে এসব বিষয়ে স্টাডি করেছি। ভৈরবের পুরনো রেলসেতুর কাছে এখন আরও দুটো সেতু হয়েছে। এই তিনটি সেতুর কারণে সেখানে বিপুল পলি জমছে এবং সেখানকার পানি নিষ্কাষণ পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। হাওরের পানি নেমে যেতে বেশি সময় লাগা এবং বন্যা হওয়ার জন্য এমন কারণগুলোও দায়ী।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ড. মো. খালেকুজ্জামান : দেশ রূপান্তর এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত