জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টার রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলেছে আদালত

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২২, ১০:০৫ পিএম

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, জনপ্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল হত্যা চেষ্টা মামলার প্রধান আসামি ফয়জুল হাসানকে যাবজ্জীবন ও ফয়জুলের বন্ধু সোহাগ মিয়াকে ৪ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সিলেটের সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক নুরুল আমিন বিপ্লব এই রায় প্রদান করেন।

রায়ে ফয়জুল হাসানকে ২০ হাজার টাকা ও সোহাগ মিয়াকে ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডও প্রদান করা হয়েছে। দণ্ডিত দুই আসামিই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

মামলার অপর ৪ আসামিকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। এরা হলেন, ফয়জুলের বাবা মাওলানা আতিকুর রহমান, মা মিনারা বেগম, মামা ফজলুল হক ও ভাই এনামুল হাসান।

আদালতের পিপি মমিনুর রহমান টিটু জানান, চাঞ্চল্যকর এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ গত ১০ মার্চ শেষ হয়। মামলায় মোট ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এরপর ২১ ও ২২ মার্চ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আদালত মামলার প্রধান আসামিকে যাবজ্জীবন ও তার সহযোগীকে ৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

উল্লেখ্য ২০১৮ সালের ৩ মার্চ বিকেলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলা করা হয়। মাদ্রাসাছাত্র ফয়জুল হাসান ছুরি দিয়ে জাফর ইকবালের মাথা ও ঘাড়ে উপর্যুপরি আঘাত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ছাত্র-শিক্ষকেরা হামলাকারী ফয়জুলকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। হামলায় গুরুতর আহত অধ্যাপক জাফর ইকবালকে প্রথমে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

হামলার ঘটনায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন বাদী হয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের জালালাবাদ থানায় মামলা করেন। ২০১৮ সালের ১৬ জুলাই ফয়জুলসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, পুলিশ পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম।  

এদিকে রায় ঘোষণার পর একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, ‘ফয়জুলের ওপর আমার কোনো রাগ নেই। যেহেতু তিনি অপরাধ করেছেন, তাই প্রচলিত আইনে তার সাজা হয়েছে। কিন্তু তার মতো যারা মনে করে- এ রকম করলে জান্নাতে যাবে, তাদের জন্য করুণা হয়’।

তিনি বলেন, ‘যারা এদের এসব কাজে উদ্বুদ্ধ করছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে খুশি হব’।  

আদালতের পর্যবেক্ষণ

অধ্যাপক জাফর ইকবাল হত্যাচেষ্টা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালতে বলেছেন, স্বাধীন মতপ্রকাশ, পরমতসহিষ্ণুতা, গণতন্ত্র ও প্রগতিশীলতা সভ্যতার অগ্রগতির নির্ণায়ক। এগুলোর চর্চা নিশ্চিত করা না গেলে দেশ পেছনের দিকে হাঁটবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান আসামি ফয়জুল সম্পর্কে বিচারক বলেন, আসামি ফয়জুল হাসানের সঙ্গে দেশীয় বা কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়নি। তিনি মুফতি জসিমউদ্দিন রহমানী (হাফিজাল্লাহ) এর বই পড়ে ও বক্তব্য শুনে বিভিন্ন ব্যক্তির প্রতি সংক্ষুব্ধ হন। অধ্যাপক জাফর ইকবাল বিভিন্ন সময়ে ব্লগার ও নাস্তিকদের পক্ষে কথা বলায় বিশেষত শিশুতোষ গ্রন্থ ‘ভূতের বাচ্চা সুলেমান’ লিখে তিনি নবী সুলায়মানকে (আ.) কটূক্তি করেছেন বলে কাল্পনিক অভিযোগ তুলে তাকে নিজ হাতে হত্যার পরিকল্পনা করেন ফয়জুল।

জাফর ইকবালকে ইসলামের শত্রু ও নাস্তিক আখ্যায়িত করে হত্যার চেষ্টা চালান। ইসলাম ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী না বুঝে নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যাকে পুণ্যের কাজ মনে করে আসামি এই বর্বর হামলা চালিয়েছেন। ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটে জিহাদি আর্টিকেল, জিহাদি বই পড়ে এবং বিভিন্ন উগ্রবাদী বক্তারা বক্তব্য শুনে ফয়জুল সন্ত্রাসী কাজে উদ্বুদ্ধ হয়। অপর আসামি সোহাগ মিয়া জঙ্গি কর্মকাণ্ডে ফয়জুলকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন জিহাদি বই, ওডিও ও ভিডিও ক্লিপ সরবরাহ করে দেশের মুক্তমনা লেখকদের হত্যার ব্যাপারে শলাপরামর্শ করতেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক অনলাইনে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড বন্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, কিছু স্বার্থান্বেষী গ্রুপ কৌশলে ভার্চুয়াল জগতে তাদের উগ্রবাদী সন্ত্রাসী মতবাদ ছড়িয়ে, সহজে বেহেশতে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা দেখিয়ে তরুণ প্রাণে সন্ত্রাসবাদের বীজ বপন করছে। সাইবার জগতে এসব উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উৎসাহ প্রদানকারী বিভিন্ন সাইট বা গ্রুপকে চিহ্নিত করে তাদের প্রচারিত তথ্যের প্রবাহ বন্ধ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও জোরালো ও কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করে।

হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিচারক উল্লেখ করেন, ‘হামলার নৃশংসতা এবং বীভৎসতা দ্বারা যেসব লেখক মুক্তবুদ্ধি, প্রগতিশীলতা, বিজ্ঞান এবং সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় কুসংস্কারের বিষয়ে লেখেন বা বক্তব্য রাখেন তাদের মধ্যে ভীতি, শঙ্কা ছড়িয়ে দেওয়াই আসামির মূল উদ্দেশ্য’।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত