জট খুলছেনা পল্লবীর মৃত্যু রহস্যের! নেপথ্যে তৃতীয় কোন কারণ?

আপডেট : ২০ মে ২০২২, ০৭:১৮ পিএম

ক্রমশই আরও ঘনীভূত হচ্ছে টলিউড অভিনেত্রী পল্লবী দে-র মৃত্যু-রহস্য। ১৫ মে রবিবার গড়ফার একটি আবাসনের ঘর থেকে পল্লবীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। কিন্তু, পল্লবীর মৃত্যুর পর দাবি-পাল্টা দাবির ঘনঘটায় বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যে চরিত্রগুলির নাম উঠে আসছে, তারা পরস্পরের বহু দিনের পরিচিত। বস্তুত, একটি নয়, দুটি মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। পল্লবীর মৃত্যুর পর সৌমি নামের এক নারীর বাবা দাবি করেন, সাগ্নিকের জন্যই আত্মহত্যা করেছিলেন তার মেয়েও। অতঃপর, তদন্ত কোন পথে?

পল্লবীর মৃত্যুর ঘটনা যখন ঘটে, তখন ঘরের বাইরে ছিলেন বলেই পল্লবীর লিভ-ইন সঙ্গী সাগ্নিক চক্রবর্তী দাবি করেছিলেন। তবে টানা জিজ্ঞাসাবাদ চালানোর পর আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া-সহ একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে সাগ্নিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত তাকে পুলিশ হেফাজতেই রাখার নির্দেশ দিয়েছে আলিপুর আদালত।

পল্লবীর মৃত্যু-রহস্য নিয়ে তদন্তের শুরু থেকেই কয়েকটি নাম বার বার উঠে এসেছে পুলিশের কাছে। তবে কৌতূহলের বিষয়, মৃত্যু-রহস্যে নাম জড়ানো প্রতিটি চরিত্রই একে অপরকে চিনতেন।

অনেকে আবার একে অপরকে চিনতেন ছোটবেলা থেকেই। যোগসূত্র বাসস্থান। এদের প্রত্যেকেরই বাড়ি সাঁতরাগাছি বা এর সংলগ্ন এলাকায়।

পল্লবীর মৃত্যু-রহস্য মূল যে চরিত্রগুলোকে ঘিরে ঘনীভূত হয়েছে, তারা হলেন- লিভ-ইন সঙ্গী তথা মূল অভিযুক্ত সাগ্নিক, ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় (যাকে পল্লবীর বাবার অভিযোগপত্রে ঐন্দ্রিলা সরকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে), সুকন্যা এবং পল্লবী নিজে। এ ছাড়াও পল্লবী এবং সাগ্নিকের পরিবারের সদস্যরাও একে অপরকে চিনতেন।

ঐন্দ্রিলা সেই নারী যার সঙ্গে সাগ্নিক ‘গোপনে’ সম্পর্ক রাখতেন বলেই বারবার অভিযোগ করেছে পল্লবীর পরিবার। মেয়ের মৃত্যুর জন্য সাগ্নিকের পাশাপাশি ঐন্দ্রিলাকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন তারা। যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঐন্দ্রিলা।

ঐন্দ্রিলা এবং পল্লবী ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চিনতেন। ছিলেন ভাল বন্ধুও। ঐন্দ্রিলা ছেলেবেলা থেকে চিনতেন সাগ্নিককেও।

অভিযোগ, পল্লবী-সাগ্নিকের বাড়িতে একাধিক বার গিয়েছিলেন ঐন্দ্রিলা। রাতেও থেকেছেন। পল্লবী থাকাকালীন ঘরে এলেও পল্লবী ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সাগ্নিকের সঙ্গে ঘরে ঢুকে ঐন্দ্রিলা ছিটকিনি আটকাতেন বলে দাবি করেছেন পল্লবীর পরিচারিকা সেলিমা সর্দার।

ঐন্দ্রিলার দিকে বারবার আঙুল ওঠায়, কী বলছেন তিনি? অভিযুক্তের পাল্টা প্রশ্ন, ‘কেবল একটা রাত পল্লবী আর সাগ্নিকের বাড়িতে ছিলাম বলে আজ আমার বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ উঠবে? তা-ও একা নয়, অনেকে মিলে ছিলাম’।

ঐন্দ্রিলা আরও জানান, পল্লবীর সঙ্গে এক পাড়ায় বড় হয়েছেন। তাদের এক সঙ্গে বড় হতে দেখেছেন পল্লবীর বাবা-মা।

ঐন্দ্রিলার কথায়, ‘পল্লবীর সঙ্গে সে রকম যোগাযোগই ছিল না। মাঝে মধ্যে হয়তো ফোন বা মেসেজে খবরাখবর নিতাম। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে কে কী করছি, তা জানতে চাইনি’।

ঐন্দ্রিলার এ-ও দাবি, টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তা একেবারে মিথ্যা। পল্লবীর ছোটবেলার বান্ধবী ঐন্দ্রিলা দাবি করেন, তাদের এমন সম্পর্ক ছিল না যে, কেউ কারও সম্পত্তির হিসাব রাখবেন।

পল্লবীর মাধ্যমেই সাগ্নিকের সঙ্গে ঐন্দ্রিলার আলাপ-পরিচয়। কিন্তু সেটা নেহাতই বান্ধবীর ‘বয়ফ্রেন্ড’ বলে। এর বাইরে তাদের মেলামেশা ছিল না বলেও দাবি করেন ঐন্দ্রিলা।

এই রহস্যে নাম জড়ানো অন্য এক চরিত্র সুকন্যা। সুকন্যা, সাগ্নিকের ‘স্ত্রী’। সুকন্যার সঙ্গে সাগ্নিকের বিয়ে হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেই বিয়ে ভেঙে যায় বলে তার দাবি।

সাগ্নিকের ‘স্ত্রী’ সুকন্যাও জানিয়েছেন, পল্লবী আদতে তারই বন্ধু ছিলেন। এমনকি, সাগ্নিকের সঙ্গে যখন তার বিয়ে ঠিক হয়, তখন রেজিস্ট্রি বিয়েতে সাক্ষী হওয়ার কথা ছিল পল্লবীরই। বিয়ের নোটিশে তার নামও ছিল। তার দাবি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিয়ে হয়নি পল্লবীর জন্যই।

সুকন্যার দাবি, ‘বন্ধু’র হবু স্বামীর সঙ্গে জেনেবুঝেই সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন অভিনেত্রী পল্লবী দে।

অভিনেত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিতর্কে প্রকাশ্যে মুখ খুলে সুকন্যার দাবি, ‘পল্লবী ভাল মেয়ে ছিল না। আর সাগ্নিক কাউকে মেরে ফেলতে পারে না’।

যে ঐন্দ্রিলার নামে সাগ্নিকের সম্পর্কের অভিযোগ করেছেন পল্লবীর বাবা-মা, সেই ঐন্দ্রিলাকেও ১০-১২ বছর ধরে চিনতেন বলেও দাবি করেছেন সুকন্যা। তারা দীর্ঘ দিন পরস্পরের পরিচিত বলেও জানান তিনি।

সুকন্যা আরও দাবি করেন, সাগ্নিকের সঙ্গে তার বিয়ের কথা জানার পরও পল্লবী সাগ্নিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেন। সুকন্যার কথায়, ‘আমার অনুপস্থিতিতে ওরা মেলামেশা করত। আমি সেটা বুঝতে পারি’। বাধ্য হয়েই ‘ত্রিকোণ সম্পর্ক’ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন বলে দাবি সুকন্যার।

পল্লবীদের পরিবার কোনও দিনই অর্থনৈতিক ভাবে খুব একটা সচ্ছল ছিল না বলেও দাবি করেন সুকন্যা। তাই সাগ্নিকের আর্থিক সচ্ছলতার জন্যই তার সঙ্গে পল্লবী সম্পর্কে জড়িয়েছিল বলেও দাবি সুকন্যার।

সুকন্যার দাবি, ২০১৩ সাল থেকে সাগ্নিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। ২০২০ সাল থেকে আর কোনও যোগাযোগ রাখেননি সাগ্নিক। পল্লবীর পাশাপাশি যে সাগ্নিকও তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তা মেনে নিতে পারেননি সুকন্যা।

তবে গত কয়েক দিন ধরে যেভাবে পল্লবীর মৃত্যুর জন্য সাগ্নিককে দায়ী করা হচ্ছে, তা-ও মানতে পারেননি সুকন্যা।

পল্লবী মৃত্যু-রহস্যে আরও একটি নাম জড়িয়েছে। কিন্তু তিনি প্রায় আট বছর আগে মারা গিয়েছেন। কারণ সেই আত্মহত্যা। তিনি সৌমি মণ্ডল। সাগ্নিকের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণেই আট বছর আগে সৌমি নামে একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রী আত্মঘাতী হয়েছিলেন বলে অভিযোগ সৌমির পরিবারের।

হাওড়ার জগাছার বাসিন্দা ছিলেন সৌমি। পল্লবীর মৃত্যুর পর নতুন করে সামনে এসেছে সৌমির মৃত্যুর ঘটনা।

সৌমির বাবা অজয় মণ্ডলের বক্তব্য, ২০১৪ সালের ১৮ মার্চ তার মেয়ে সৌমির ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয় ঘর থেকে। সেই সময় বাড়িতে কেউ ছিলেন না। অজয়ের দাবি, সৌমির সঙ্গে সাগ্নিকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

সৌমি এবং সাগ্নিক দুজনেই হাওড়ার জগাছার কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এর পর তারা ভর্তি হন ফোর্ট উইলিয়াম কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে। একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ‘আত্মহত্যা’ করেন সৌমি। সেই সময় দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তেন সাগ্নিক।

সৌমির বাবা অজয়ের অভিযোগ, সাগ্নিকই তার মেয়ের মৃত্যুর জন্য একশো শতাংশ দায়ী। তিনি বলেন, ‘সাগ্নিকের সঙ্গে সৌমির প্রেম-ভালবাসা ছিল। আমাদের বাড়িতে ওর যাওয়া-আসা ছিল। আমি বারণ করতাম। কারণ সাগ্নিকের চরিত্র ভাল নয়। ও আমার মেয়ের সঙ্গে রাস্তাঘাটে দুর্ব্যবহার করত। পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল’।

সাগ্নিক অন্য ছেলেকে দিয়ে সৌমিকে বিরক্ত করাতো বলেও অজয়ের অভিযোগ। এরপর সাগ্নিক সম্পর্ক থেকে সরে গিয়ে অন্য একটি ছেলের সঙ্গে মেয়েকে জড়িয়ে দিয়েছিল এবং সেই টানাপড়েনেই সৌমির মৃত্যু হয় বলেও তিনি দাবি করেন।

পল্লবীর মৃত্যু নিয়ে জল এখনও গড়াচ্ছে। তবে জীবন্ত চরিত্র ছাড়াও এই মৃত্যু-রহস্যে জড়িয়ে আছে দুটি এমন চরিত্র, যাদের প্রাণ নেই। একটি ফ্ল্যাট এবং একটি গাড়ি। এই ফ্ল্যাট এবং গাড়ি কার, তা নিয়েও ঝগড়া চলছে পল্লবী এবং সাগ্নিকের পরিবারের মধ্যে।

পল্লবীর পরিবারের দাবি, মেয়ের কাছে থেকেই টাকা নিয়ে এই ফ্ল্যাট কেনেন সাগ্নিক। অন্যদিকে, সাগ্নিকের মায়ের দাবি, ৪৩ লাখ টাকা নগদ এবং বাকি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়ে এই ফ্ল্যাট কেনে তাদের পরিবারই।

গাড়ি নিয়েও আলাদা আলাদা মত দুই পরিবারের। সাগ্নিকের মা বলেন, ৯ লাখ টাকা দিয়ে তিনি এই অডি গাড়ি ছেলেকে কিনে দিয়েছিলেন। সেই গাড়ি এখন পল্লবীর পরিবার ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, পল্লবীর পরিবার জানিয়েছেন, ২২ লাখ টাকা দিয়ে সাগ্নিককে এই গাড়ি কিনে দিয়েছিলেন পল্লবীই।

এরই মধ্যে ঐন্দ্রিলার দাবি, দুই মাস আগে শহরের এক পার্টিতে সাগ্নিক নাকি তাকে যৌন হেনস্থার চেষ্টা করেছিলেন।

ঐন্দ্রিলা বলেছেন, ‘ওই ঘটনার পরে আমি থানায় অভিযোগ জানাব বলেও ঠিক করেছিলাম। কিন্তু পল্লবী এসে কান্নাকাটি করে। থানা-পুলিশ করলে ওর সম্মানহানি হবে বলে জানায়’। পল্লবীর কথা ভেবেই তিনি থানায় অভিযোগ করেননি বলে দাবি ঐন্দ্রিলার।

যদিও ঐন্দ্রিলা প্রথম বার দাবি করেছিলেন, পল্লবীর গড়ফার ফ্ল্যাটে একবার মাত্র গিয়েছিলেন। অথচ ওই ফ্ল্যাটে যে পরিচারিকা কাজ করতেন, তিনি দাবি করেছেন, ঐন্দ্রিলা মাঝে মাঝেই ওই ফ্ল্যাটে আসতেন।

এর পাল্টা জবাবে ঐন্দ্রিলা দাবি করেন, তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই পল্লবীর ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ঐন্দ্রিলার দাবি, পল্লবীর ভাইকে ঐন্দ্রিলা ফোন করেছিলেন মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।

পল্লবীর মৃত্যু নিয়ে জলঘোলা হলেও ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী জানা গেছে, আত্মহত্যাই করেছেন পল্লবী।

তবে আত্মহত্যার পেছনের আসল কারণ কী? প্ররোচনা, সম্পর্কের টানাপড়েন, না কি অন্য কিছু? এখনও খুঁজছে পুলিশ।

প্রসঙ্গত, পল্লবীর ফ্ল্যাট থেকে হুঁকো-সহ কিছু নেশার সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। পল্লবীর মৃত্যু নিয়ে আনন্দবাজার অনলাইনের কাছে প্রথমবার মুখ খোলেন তার বান্ধবী সঙ্ঘশ্রী। তিনি লিখেছিলেন, ‘সম্পত্তি, প্রেম, সম্পর্ক কোনটাই এর কারণ বলে মনে হয় না। আমি পল্লবীর বন্ধু হিসেবে এই কথাগুলো না লিখে পারলাম না। ওর চলে যাওয়ার তৃতীয় কোনও কারণ নিশ্চয় আছে। সেটাই পল্লবীর মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত সব রহস্যের জবাব দেবে’।

সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত