হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে এক ব্যবসায়ীর মজুদ করা বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল জব্দের পর তা মাঝরাতে তড়িঘড়ি করে যুবলীগ নেতার কাছে নিলামে বিক্রি করা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১১টার দিকে লালমিয়া বাজারের একটি গুদাম থেকে ৪ হাজার ৫৭৩ লিটার সয়াবিন তেল পাচারের সময় জব্দ করা হয়। পরে কালবৈশাখী ঝড়ের মধ্যে রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শফিকুল ইসলাম ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে গুদামের ভেতরেই হাতেগোনা কয়েকজনের উপস্থিতিতে নিলামে ওই তেল বিক্রি করে দেন। উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কবির মিয়া জব্দ করা তেল নিলামে কেনেন গড়ে লিটারপ্রতি ১০৩ টাকায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরদিন সকালে সেই তেল তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন লিটারপ্রতি ১৫৪ টাকায়। মাঝরাতের এ নিলামের সমালোচনা করে এলাকাবাসী বলছে, তড়িঘড়ি না করে সকালে বোতলের গায়ে মুদ্রিত দরে খোলা বাজারে বিক্রি করা হলে সরকারের কোষাগারে প্রায় আড়াই লাখ টাকা বেশি জমা হতো।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলের ব্যবসায়ী কৃপেশ রায় মাস দুয়েক আগে স্থানীয় ব্যবসায়ী সুমন রায়ের মাধ্যমে আজমিরীগঞ্জ লালমিয়া বাজারে একটি গুদাম ঘর ভাড়া নিয়ে সয়াবিন তেল মজুদ করেন। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে ট্রাকে করে ওই তেল হবিগঞ্জ নিয়ে যাওয়ার সময় বিষয়টি এলাকাবাসীর নজরে আসে। একপর্যায়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে খবরটি পৌঁছে। খবর পেয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শফিকুল ইসলাম রাত সাড়ে ১১টায় ঘটনাস্থলে গিয়ে ৪ হাজার ৫৭৩ লিটার তেল জব্দ করেন। এ সময় অবৈধভাবে মজুদ করার অভিযোগে আজমিরীগঞ্জ পৌর এলাকার সমিপুর গ্রামের সনদ কুমার রায়ের ছেলে সুমন রায় (২৯) ও নগর গ্রামের গোপাল বৈদ্যর ছেলে নেপাল বৈদ্যকে (৩২) আটক করে দুজনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
পরে রাত সাড়ে ১২টায় সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম গুদামেই নিলামের আয়োজন করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তখন বাইরে প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছিল। গুদামে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা ছাড়া গুটিকয়েক লোক উপস্থিত ছিলেন। নিলামে ৪ হাজার ৫৭৩ লিটার সয়াবিন তেল ভ্যাটসহ ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ টাকায় কিনে নেন উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কবির মিয়া। সে হিসাবে প্রতি লিটারের মূল্য পড়েছে ১০৩ টাকা।
এদিকে মাঝরাতের এ নিলামকে কেন্দ্র করে এলাকার ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এ প্রসঙ্গে লালমিয়া বাজারের ব্যবসায়ী সুলতান মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিলামের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। বৃহস্পতিবার মাঝরাতে ঝড়ের সময় গুদামের দরজা বন্ধ করে নিলামে প্রতি লিটার ১০৩ টাকায় বিক্রি করা হয়। পরদিন সকালে ওই তেল আমাদের ঠিকই লিটারপ্রতি ১৫৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে লালমিয়া বাজারের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘নিলামের সময় আমাদের ওই গুদামে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। একটি বিশেষ মহলকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই তরিঘড়ি করে নিলাম করা হয়েছে।’
বাজারের শ্রমিক সুজাত মিয়া বলেন, ‘কী কারণে রাতের আঁধারে নিলাম করা হলো তা বুঝতে পারছি না। সকালে নিলাম করা হলে সরকার আরও বেশি রাজস্ব পেত।’
কুতুব মিয়া নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘বোতলের গায়ের রেটে খোলা বাজারে বিক্রি করা হলে সরকার প্রায় আড়াই লাখ টাকা বেশি পেত।’
ক্রেতাদের অভিযোগ, যুবলীগ নেতা কবির নিলামে কেনার পর সয়াবিন তেলের ১ লিটারের বোতল সরিয়ে ফেলেন। সকালে অনেক ক্রেতা ১ লিটার বোতলের সয়াবিন তেল কিনতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে যান। ৫ লিটারের বোতল বিক্রি শেষ হওয়ার পর ১ লিটারের বোতল বিক্রি করবেন বলে ক্রেতাদের জানিয়ে দেন যুবলীগ নেতা কবির।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আজমিরীগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যথাযথ নিয়ম মেনেই নিলামে তেল বিক্রি করা হয়েছে।’
নিলামে ৯ জন অংশ নেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘কবিরকে বোতলের গায়ের মূল্যে তেল বিক্রি করতে বলা হয়েছে। খোলা বাজারে তেল বিক্রির সময় কোনো অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
