সুদহার পুনর্বিবেচনার দাবি জানাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ১১:৪২ পিএম

আমানত ও ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (এনবিএফআই) বড় ধরনের হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন থেকে সরে এসে সুদহার কিছুটা বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরকে অনুরোধ জানাবেন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) নেতারা। আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই অনুরোধ জানাবেন তারা। বিকেল সাড়ে ৪টায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।

গত ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক সার্কুলারের মাধ্যমে জানানো হয়, এনবিএফআইগুলো ঋণের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ এবং আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ দিতে পারবে। এই সিদ্ধান্ত আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। ব্যাংক ও এনবিএফআইর ঋণের সুদহার প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তা ছাড়া ওই নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার আগে এনবিএফআইগুলো যেসব আমানত সংগ্রহ করেছে, সেই সব আমানতের সুদহার বর্তমান মেয়াদ পূর্তির পর নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে বলেও সার্কুলারে উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ১ এপ্রিল ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ আর আমানতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদহার বেঁধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদহার বেঁধে না দেওয়ায় অনেক এনবিএফআই ১৮-২০ শতাংশে ঋণ বিতরণ করে আসছিল। ফলে ব্যাংক ও এনবিএফআইর সুদহারের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা দেয়।

ওই নির্দেশনা দেওয়ার পর থেকেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই সিদ্ধান্ত এ খাতের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিল। খাত সংশ্লিষ্টরা বলে আসছিলেন, লিজিং কোম্পানিগুলো ৭ শতাংশ সুদে আমানত পাবে না। তা ছাড়া ১১ শতাংশ সুদে ঋণ দিলে প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল খরচ উঠবে না। এই পরিস্থিতিতে ঋণ ও আমানতের বেঁধে দেওয়া সুদ বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে জানান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা। এ বিষয়ে লিখিত একটি প্রস্তাবনাও গভর্নরের কাছে পেশ করে বিএলএফসিএ। তবে এখনো ওই প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো সাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেয়নি বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।

জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আমানতের অর্ধেকের বেশি আসে বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত দিতে না পারায় আস্থাহীনতার কারণে সাধারণ আমানতকারীদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও টাকা রাখতে চাইছে না। যে কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানত না বেড়ে উল্টো কমে যাচ্ছে।

বিএলএফসিএ চেয়ারম্যান ও আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে আমানতের সুদহার ৮ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ১৩ শতাংশের মধ্যে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেটি মেনেও নিয়েছিলাম। সম্প্রতি সুদহার বেঁধে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সার্কুলার জারি করেছে, এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আগে কোনো আলোচনা করা হয়নি, করলে ভালো হতো। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। ফলে অনেক ব্যাংকই ৭ শতাংশ সুদে আমানত নিচ্ছে। এ অবস্থায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও যদি আমানতের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ সুদ দেয়, তাহলে গ্রাহক আকৃষ্ট করতে পারবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তুলনামূলক ছোট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আমানত সংগ্রহ করাটা কঠিন হয়ে উঠবে। অন্যদিকে ঋণের সুদহারও ১১ শতাংশের মধ্যে রাখা কঠিন হবে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য। তা ছাড়া এনবিএফআইগুলো দীর্ঘমেয়াদে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ করে থাকে। সে ক্ষেত্রে সুদ কিছুটা বেশি রাখতে হয়। ব্যাংকের মতো সুদের বাইরে বিভিন্ন খাত থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের সুযোগ কম। সব মিলিয়েই আমানতের ক্ষেত্রে সাড়ে ৮ শতাংশ ও ঋণের ক্ষেত্রে সাড়ে ১২ শতাংশ সুদহার নির্ধারণের জন্য আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’ এ ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে এই সুদহার সমন্বয় করার জন্য প্রস্তাব করা হবে বলে জানান তিনি।

দেশে বর্তমানে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে লিজ ও ঋণ অর্থায়ন সুবিধা দিচ্ছে। এনবিএফআইগুলোর তহবিলের প্রধান উৎসই আমানত। এই সুদহার না বাড়ালে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। তা ছাড়া কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের ঘটনায় এ খাতের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা কমে আসতে শুরু করে। এর মধ্যে অনেক ব্যাংক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা আমানত তুলে নিতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো যাতে আমানত প্রত্যাহার না করে, সে বিষয়েও বিএলএফসিএর পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়।

 ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে দেশের ব্যাংকগুলোতে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে থেকেই ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত করে আনে। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই নির্দেশনার বাইরে থাকলেও আস্থাহীনতার কারণে এ খাতে আমানত কমতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প তারল্য সুবিধারও দাবি করে আসছিলেন বিএলএফসিএ নেতারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত